Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৮ আগস্ট ২০২৬
Wealth

দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী, অথচ সম্পদের চূড়ায় টুলু মণ্ডলরা

প্রশ্ন হচ্ছে, পার্থ-সব্যসাচী-টুলুরা কি বৈধভাবে, আইনি পথে এই সম্পত্তি অর্জন করেছেন? একদা দিনমজুর রূপে ক্রাশারে আসা লরিতে পাথর বোঝাই করত টুলু। পরে লরি কিনে পাথরের ব্যবসা শুরু করে।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ৮, ২০২৬, ১৮:০৭

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ৮, ২০২৬, ১৮:০৭

options
link
দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী, অথচ সম্পদের চূড়ায় টুলু মণ্ডলরা zoom
উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী দেশে। ফাইল ছবি
Advertisement

‘ভালো জনে রইলো ভাঙা ঘরে, আর মন্দ যে জন সিংহাসনে চড়ে’। সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশ’-এর গান এখন ঘোর বাস্তব। রাজনীতির আগুনে হাত সেঁকে কেউ কেউ ‘উপার্জন’ করেছে কোটি কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি। যেমন কিনা টুলু মণ্ডল। অথচ, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী! লিখছেন, অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন’ (১৯১৫) আক্ষরিক অর্থেই শিশুসাহিত্য। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাটি মোটেও শুধু শিশুদের জন্য নয়। বরং সমকালীন নানামাত্রিক সামাজিক বার্তাও দেয়। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ‘নির্গুণ’ দুই ব্যক্তি– গুপী ও বাঘা– ‘ভূতের রাজা’-র ‘বর’ পেয়ে হঠাৎই গান-বাজনায় অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠল। ভূতের রাজা বলেছিলেন, ‘হবে হবে হবে হবে/ গান হবে, ঢোল হবে, সুর হবে, তাল হবে, লয় হবে/ লোকে শুনে ভ্যাবাচ্যাকা/ স্থির হয়ে থেমে যাবে থেমে যাবে থেমে যাবে।’

Advertisement

অনুরূপভাবে, রাজনীতিবিদদের ‘বর’ বা আশীর্বাদের বহর দেখে আমরাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাচ্ছি। তাদের প্রসাদে কে যে কখন উঠবে, আর কে নামবে, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। তাদের বরে অযোগ্য, অপদার্থ লোকজনও নেতা-মন্ত্রী-সান্ত্রী হয়ে কোটি কোটি টাকা ঘরের ভিতর, খাটের তলায়, বস্তায় ভরে জমা করছে। যাদের এক সময় দু’বেলা অন্ন জুটত না, তাদের ঘরে সুদৃশ্য দামি আসবাব, গ্যারেজে বিদেশি গাড়ির সারি, বিঘের পর বিঘে জমি। শুধু এ রাজ্যেই নয়, এমন ছবি সারা দেশেই। প্রয়োজন শুধু আনুগত্য। ‘হীরক রাজার দেশে’ (১৯৮০) ছবিতে সত্যজিৎই শুনিয়েছিলেন, ‘দেখো ভালো জনে রইলো ভাঙা ঘরে,/ আর মন্দ যে জন সিংহাসনে চড়ে’। চারপাশে এখন যেন সে-কথারই প্রতিধ্বনি।

একদা দিনমজুর রূপে ক্রাশারে আসা লরিতে পাথর বোঝাই করত টুলু। পরে লরি কিনে পাথরের ব্যবসা শুরু করে। স্থাবর সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে ৭টি বাড়ি, ১টি খামারবাড়ি, ২টি পেট্রল পাম্প, ১টি ইটভাটা, ১টি পার্কিং, ৩টি পাথর খাদান, ২টি ক্রাশার, ৩০০ বিঘা জমি।

রাজ্যেই প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ এক মহিলার ফ্ল্যাট থেকে নগদ প্রায় ৫০ কোটি টাকারও বেশি নগদ অর্থ, সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার হয়েছিল ২০২২ সালে। রাজ্যে পালাবদলের পর প্রাক্তন বিধায়ক ও নেতা সব্যসাচী দত্তর এক পরিচিতার তেহট্টের বাড়ি থেকে প্রায় ৩ কেজি সোনা ও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান মেলে। সেই তালিকায় সাম্প্রতিক সংযোজন: টুলু মণ্ডল। তৃণমূল কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ এই পাথর-ব্যবসায়ীর বাড়ি ও আত্মীয়র বাড়ি থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার নগদ ও সোনা বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। টুলুর যতগুলি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে, তাতে ৯৩ কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। টুলুর ৮৩টি ট্রাক এবং ডাম্পারও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। জানা গিয়েছে, টুলুর ২১টি স্থাবর সম্পত্তি। তালিকায় রয়েছে ৭টি বাড়ি, ১টি খামারবাড়ি, ২টি পেট্রল পাম্প, ১টি ইটভাটা, ১টি পার্কিং, ৩টি পাথর খাদান, ২টি ক্রাশার, ৩০০ বিঘা জমি।

বৈধভাবে ব্যবসা করে কেউ প্রভূত সম্পত্তি করতেই পারেন। আইনে বাধা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পার্থ-সব্যসাচী-টুলুরা কি বৈধভাবে, আইনি পথে এই সম্পত্তি অর্জন করেছেন? একদা দিনমজুর রূপে ক্রাশারে আসা লরিতে পাথর বোঝাই করত টুলু। পরে লরি কিনে পাথরের ব্যবসা শুরু করে। পরে শাসক নেতাদের সক্রিয় মদতে জাল ডিসিআর তৈরি করে কোটি কোটি মুনাফা ঘরে তুলতে থাকে। ভিনরাজ্যেও চিত্রটি আলাদা নয়। ওড়িশার কন্ধমলে বৈকুণ্ঠনাথ বেহরা নামে এক সরকারি ইঞ্জিনিয়ারের বাড়িতে উদ্ধার হয়েছে ২ কোটি টাকা। ফ্ল্যাট, জমি এবং গাড়ি-সহ বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির হদিশ মিলেছে। বিহারের রোহতাসে এক সরকারি ইঞ্জিনিয়ার অরবিন্দ চৌধুরীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে কয়েক কোটি টাকার অস্থাবর ও স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। বলা বাহুল্য পার্থ-টুলু, বৈকুণ্ঠনাথ-অরবিন্দরা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। তাঁদের কথা প্রকাশ্যে এসেছে, সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে। এমন শত শত ‘দুর্নীতিবাজ’ নেতা-ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাঁদের কথা এখনও অজানা।

এর ঠিক বিপরীত দিকে নিদারুণ অনিশ্চয়তার দৃশ্য। ভারতে উচ্চশিক্ষার বিস্তার চার দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে স্নাতক ও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু শিক্ষার এই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। ফলে তৈরি হয়েছে এক নতুন বাস্তবতা–ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরি নেই। বর্তমানে ভারতে প্রতি তিনজন বেকার তরুণের মধ্যে প্রায় দু’জনই স্নাতক ডিগ্রিধারী। উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও বেকার বহু– যারা সৎপথে উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাদের অসহায়তা, হতাশা ও অস্তিত্বের সংকট ক্রমশ বেড়ে চলেছে। কিন্তু সুরাহা নেই। এই সমস্ত শিক্ষিত বেকার, তাদের পরিবার কায়ক্লেশে দিন গুজরান করছে। চারপাশের সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু অসৎ পথে সহজে যেতে চায় না। কিন্তু পরিস্থিতি যদি তাদের বাধ্য করে? এ সমাজ কি দায় এড়াতে পারবে?

ভারতে উচ্চশিক্ষার বিস্তার চার দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে স্নাতক ও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু শিক্ষার এই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান।

দুর্নীতি একটি ব্যাধি। যা নৈতিকতা, আইন, সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে দেয়। দুর্নীতির প্রভাবে সমাজে ন্যায়বিচার লোপ পায়, বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, মানুষের মৌলিক অধিকার বিপন্ন হয়। গরিব আরও গরিব হয়, ধনী আরও ধনী হয়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত হয়। প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। যার বিষময় প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনেই। সংগতিহীন আয়ের উৎস ছাড়াই কিছু মানুষ অকল্পনীয় ধনী হয়ে উঠছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের সামাজিক প্রভাব, ক্ষমতা।

উৎসবে-ব্যসনে তাদের ‘মুক্ত হস্তে দান’ সমাজের কাছে তাদের ‘নায়ক’, কখনও-বা ‘আদর্শ’ করে তুলছে। এখনও হয়তো বহু মানুষ সাদাকে ‘সাদা’, কালোকে ‘কালো’ বলতে অভ্যস্ত। কিন্তু যেভাবে দিন বদলাচ্ছে, নৈতিকতার অধঃপতন ঘটছে, সেখানে এই আদর্শ কতদিন টিকে থাকবে? পেটের দায় বড় দায়। হালের সমাজে দুর্নীতির বিস্তার সর্বত্র–চাকরির ক্ষেত্রে ঘুষ, শিক্ষার ক্ষেত্রে অনৈতিকভাবে সুবিধা পাওয়া, সরকারি প্রকল্পে লুটপাট, বিচারব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার। এ আবহে অনৈকতার চোরাবালিতে পা বাড়ানোর হাতছানি কত দিন মানুষ উপেক্ষা করতে পারবে!

সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের ছবিটি খুব একটি আশাব্যঞ্জক নয়। দীর্ঘ অধ্যবসায়ে একের-পর-এক হার্ডল টপকে পড়াশোনা শেষ করে যদি নিশ্চিত আয়ের পথ না-খোলে, যুবসমাজের মনে হতাশা আসা স্বাভাবিক। অন্যদিকে, যদি চোখের উপর দেখে, তাদেরই পরিচিত-প্রতিবেশী অযোগ্য কেউ শুধুমাত্র রাজনৈতিক আনুকূল্যে প্রচুর ধন-সম্পত্তির মালিক হয়ে যাচ্ছে, তখন দিশা ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। নচিকেতা গেয়েছিলেন, “যখন সময় থমকে দাঁড়ায়, নিরাশার পাখি দু’হাত বাড়ায়… খুঁজে নিয়ে মন নির্জন কোণ, কী আর করে তখন… স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্ন দেখে মন”। আমাদের যুবসমাজ কী আর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, বা বিজ্ঞানী-শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখবে? না কি, টুলু মণ্ডলদের পথ অনুসরণ করবে– সেটাই এখন লাখ নয়, কোটি টাকার প্রশ্ন।

Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.