১ ভাদ্র  ১৪২৬  সোমবার ১৯ আগস্ট ২০১৯ 

BREAKING NEWS

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

১ ভাদ্র  ১৪২৬  সোমবার ১৯ আগস্ট ২০১৯ 

BREAKING NEWS

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: জীবনের যে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনাকেই যেন সিনেমার দৃশ্য বলে বর্ণনা করা আমাদের অভ্যাস। কারণ, সিনেমার গল্প বাস্তবধর্মী হবে না, সেটাই যেন দস্তুর। সেই ভাবনার বাইরে গিয়ে ভাবাটাও আমাদের আসে না বললেই চলে। একটা নির্ঝঞ্ঝাট, সমান্তরাল জীবনের বাসনাই থাকে মনে। ছকে বাঁধা জীবনই আমরা প্রত্যাশা করি। যদিও এর বাইরেও মানুষ ভাবে, প্রত্যাশা করে, জীবন কাটাতে চায়। তবে তা শতকরা হিসেবে খুবই কম। সেইসব মানুষরা পৃথিবীতে একটু অন্য ভাবেই বাঁচে, জীবনযাপন করে। আর তাই তাঁদের জীবন সম্পর্কেও অন্যান্যদের প্রচণ্ড কৌতুহল থাকে। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তেমনই একজন ভিন্ন জগতের মানুষ ছিলেন পরিচালক মৃণাল সেন। বছরের শেষলগ্নে এসে পথচলায় ইতি দিলেন ‘অক্লান্ত পদাতিক’।

যে সমস্ত পরিচালকদের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে পরিচিত হয়েছে, মৃণালবাবু তাঁদের একজন। কেবল একজন বললে ভুল বলা হবে, বলা উচিত শীর্ষস্থানীয়। আর তাই সিনেপ্রেমী তরুণ-যুব সহ সব প্রজন্মের তাঁর প্রতি আগ্রহ থাকবেই। একজন অননুকরণীয় চলচ্চিত্রকার। হয়তো সেইসব আগ্রহ বা তাঁর নিজের জীবনের এই আলোর অনালোকিত জীবনের গল্পটা বলার জন্যই লিখেছিলেন তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের আত্মজীবনী ‘তৃতীয় ভুবন’। ছবি পরিচালনার মতোই ঝড়ঝড়ে গদ্য। তাঁর নিজের ভাষায় এমন অনবদ্য লেখনী। সেখানে এক বিষাদের কাহিনি বুকে শূন্যতা এনে দেয়। মৃণাল সেনের প্রয়াণের দিনে সেই গল্পই তুলে ধরছি। ঘটনার দিন ৭ আগস্ট ১৯৪১। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস। ওইদিন তাঁর চোখের সামনের ঘটনা। মৃণাল সেন তখন যুবক। নিমতলা শ্মশানের ঘটনা। লিখেছেন, “গঙ্গার ধারে এই নিমতলা ঘাটটি ক’দিন ধরেই সরকারি নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে, যাতে কবির দেহের সৎকার সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। পুলিশের কর্ডন ঘাটের গেটের সামনে। বাধ্য হয়েই আমি দূরে দাঁড়ালাম। আমার মতো আরও অনেকে উপায় না দেখে দাঁড়িয়ে রইল একটু দূরে। একটু তফাতে। কিন্তু সেই পুলিশ কর্ডনের ভিতর একটি লম্বা সুদর্শন যুবককে দেখে আমি একটু অবাকই হলাম। কতই বা বয়স হবে পঁচিশ-ছাব্বিশ। সাদা একটা ধুতি তাঁর পরনে আর গায়ে একটা কুর্তা। বিধ্বস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কর্ডনের ভিতরে। সেই যুবকের দুটি হাতের উপর সাদা কাপড়ে মোড়া একটি মৃত শিশু, যাকে শ্মশানে দাহ করতে এনেছে যুবকটি। নিশ্চয়ই সেই শিশুটির বাবা। কিন্তু এখানে এসে এই নিষ্ঠুর পারিপার্শ্বিক অবস্থায় সে যুবকটি দ্বিধাগ্রস্ত। ও অন্য কোনও শ্মশানে গেল না কেন! ভাবলাম আমি। যুবকটি একাই এসেছে মনে হল। হয়তো কোনও ব্যাপার আছে যে, এই নিমতলা ঘাটেই তার শিশুটিকে দাহ করতে হবে। হয়তো মনের ভিতর কোনও ইচ্ছে, যুবকটির কোনও বিশেষ অভিমান কাজ করছে। হঠাৎ ভিড়ের ঢেউ। সবদিক দিয়ে। কাতারে কাতার মানুষ শ্মশানঘাট অতিক্রম করতে চলেছে। অসংখ্য মানুষ ছুটে আসছে শ্মশানের দিকে। পুলিশের সবরকম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা ভেঙেচুড়ে চুরমার হয়ে গেল জনতার মিছিলে। চারদিকে বিশৃঙ্খলা। ভিড়ের চাপে মানুষের মৃত্যু। কোনওরকম বড় দুর্ঘটনা ঘটছে! কিন্তু মৃত ওই শিশুটি! শিশুটি হারিয়ে গিয়েছে, ভিড়ের চাপে মৃতশিশুটি পদপিষ্ট হয়েছে! ওই যুবকটি কি একমাত্র সন্তানের পিতা হয়তো, ‘হ্যাঁ’ হয়তো বা ‘না’।” 

[শেষ হল ‘অক্লান্ত পদাতিক’-এর পথচলা, শোকের ছায়া চলচ্চিত্র জগতে]

মৃণাল সেনের বই ‘তৃতীয় ভূবন’-এর বাকি সময়টা সবটাই ছিল তাঁর সিনেমার জগতের কথা। তবে সেই সিনেমার গল্পগুলোও খুব বর্ণনাত্মক হয়ে আসেনি। এসেছে তাঁর সিনেমার ও একইসঙ্গে সিনেমার সঙ্গে তাঁর নিজের বিশ্বযাত্রার কথা। যেখানেও প্রতি পৃষ্ঠায় তাঁর নানা সাফল্যের গল্পই তিনি করেছেন। অথচ এইসব সাফল্যের গল্প পড়তে পড়তে একটা সময় মনে হয়, চলচ্চিত্রকার মৃণালের জীবনে কি কোনও ব্যর্থতা নেই? তবে সেই ব্যর্থতা কোথায়? হয়তো সেই ব্যর্থতার কথা বলতে গিয়েই তিনি লিখেছেন, ‘আই অ্যাম গ্রোয়িং ইন এভরি ফিল্ম। সে কারণেই আমার পুরনো ছবি সম্পর্কে আমি বেশ ক্রিটিকাল। মাঝে মাঝে মনে হয় যদি পুরো ছবিটাই ড্রেস রিহার্সাল মনে করে আবার তুলতে পারতাম।’ ১৯৫৫ সালে মৃণাল সেনের পরিচালিত প্রথম ছবি রাতভোর মুক্তি পায়। এই ছবিটি বেশি সাফল্য পায়নি। তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘নীল আকাশের নিচে’ তাঁকে চলচ্চিত্র জগতে পরিচিতি দেয়। তাঁর তৃতীয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’ থেকে তিনি আর্ন্তজাতিক পরিচিতি পান। ১৯৬৯ সালে তাঁর পরিচালিত ছবি ‘ভুবন সোম’ মুক্তি পায়। এই ছবিতে বিখ্যাত অভিনেতা উৎপল দত্ত অভিনয় করেছিলেন। এই ছবিটি অনেকের মতে মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ ছবি। তাঁর কলকাতা ট্রিলোজি অর্থাৎ ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭১), ‘ক্যালকাটা ৭১’ (১৯৭২) এবং ‘পদাতিক’ (১৯৭৩) ছবি তিনটির মাধ্যমে তিনি তৎকালীন কলকাতার অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরেছিলেন। মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে মৃণাল সেন তুলে ধরেন তাঁর খুবই প্রশংসিত দুটি ছবি ‘একদিন প্রতিদিন’ (১৯৭৯) এবং ‘খারিজ’ (১৯৮২)-এর মাধ্যমে। ‘খারিজ’ ১৯৮৩ সালে কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮০ সালে মুক্তি পায় তাঁর কালজয়ী ছবি ‘আকালের সন্ধানে’। এই ছবিতে দেখানো হয়েছিল একটি ছবি নির্মাতা দল একটি গ্রামে গিয়ে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের উপর একটি ছবি তৈরি করছে। কীভাবে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের কাল্পনিক কাহিনি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সেই গ্রামের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে সেটাই ছিল এই ছবির সারমর্ম। ‘আকালের সন্ধানে’ ১৯৮১ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার হিসাবে রুপোর ভালুক জয় করে।

মৃণাল সেনের পরবর্তীকালের ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৯২) এবং ‘অন্তরীন’ (১৯৯৪)। তাঁর শেষ ছবি ‘আমার ভুবন’ মুক্তি পায় ২০০২ সালে। মৃণাল সেন বাংলা ভাষা ছাড়াও হিন্দি, ওড়িয়া ও তেলুগু ভাষায় ছবি তৈরি করেছেন। ১৯৬৬ সালে ওড়িয়া ভাষায় নির্মাণ করেন ‘মাটির মণীশ’, যা কালিন্দিচরণ পাণিগ্রাহীর গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়। ১৯৬৯-এ বনফুলের কাহিনি অবলম্বনে তাঁর হিন্দি ছবি ‘ভুবন সোম’। ১৯৭৭ সালে মুন্সি প্রেমচাঁদের ‘কাফন’ গল্প অবলম্বনে তেলুগু ভাষায় নির্মাণ করেন ‘ওকা উরি কথা’। ১৯৮৫ সালে তাঁর নির্মিত ছবি জেনেসিস, যা হিন্দি, ফরাসি ও ইংরেজি তিনটি ভাষায় তৈরি হয়। পুরস্কার ও সম্মান মৃণাল সেন পরিচালিত ছবিগুলি প্রায় সবকটি বড় চলচ্চিত্র উৎসব থেকে জয় করেছে। দেশ এবং দেশের বাইরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল ফেডারেশন অফ দ্য ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হন। ২০০৫ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত সংসদের সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেন। ফরাসি সরকার তাঁকে কম্যান্ডার অফ দ্য অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস (Ordre des Arts et des Lettres ) সম্মানে সম্মানিত করে। এই সম্মান ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান। ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁকে অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ সম্মানে ভূষিত করেন।

[ভারতীয় চলচ্চিত্রে যুগাবসান, প্রয়াত পরিচালক মৃণাল সেন]

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং