২ অগ্রহায়ণ  ১৪২৬  মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমারের মতে, ‘আমরা আসলে ইতিহাস আর পড়ি না। নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে না জানলে, পড়াশোনা না করলে ভাবনার পরিসর তৈরি হবে কী করে? যদি আপনাকে জানতেই হয়, কথা বলতেই হয়, তাহলে দয়া করে আগে পড়ুন।’ ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন আক্ষেপ ঝরে পড়ল রবীশ কুমারের গলায়। শুনলেন বিদিশা চট্টোপাধ্যায়তিতাস রায়বর্মন

– নারী স্বাধীনতার দিকে যতটুকু এগিয়েছিলাম আমরা, একধাক্কায় যেন অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছি। এবং তা যেন সর্বক্ষেত্রেই দেখতে পাচ্ছি।
রবীশ কুমার: অবশ্যই। এর পিছনেও মিডিয়ার হাত রয়েছে। পুরুষতন্ত্রের সমর্থনে যদি মিডিয়া এসে দাঁড়ায়, তাহলে তার ক্ষমতা কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, তা বোধহয় আমাদের ভাবনারও বাইরে। কোনও মহিলা যদি ফাইটার প্লেনের পাইলট হন, তাহলে আমরা তাঁর ছবি নিয়ে উদ্‌যাপন করব বটে, কিন্তু ছেলের বিয়েতে পণ-ও চাইব। মিডিয়ার অ্যাঙ্করদের ভাষাতেও এই পাওয়ার পজিশন লক্ষণীয়। এবং এই কারণেই আমার মনে হয়, নতুন করে মহিলা নেত্রী উঠে আসা মুশকিল। খুব বেশি হলে, এমপি বা সিএম হতে পারেন তাঁরা, কিন্তু রাজনীতির ন্যারেটিভটা বদলাতে পারবেন না। এই বদলটা কিন্তু শুরু হয়েছিল। যে-কারণে মায়াবতী কিংবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেত্রী উঠে এসেছিলেন। কিন্তু আজকের সময়ে সেটা আর সম্ভব নয়।

[ আরও পড়ুন: আমি রেজাল্টের পিছনে দৌড়চ্ছি না: রবীশ কুমার ]

– কেন এমন বলছেন?
রবীশ কুমার: কারণ, যে শিকড় থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা জয়ললিতা উঠে এসেছেন, সেখান থেকে এই মুহূর্তে মহিলা নেত্রীর উঠে আসা মুশকিল। বরং বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার প্রেক্ষিত থেকে নতুন নেত্রী উঠে আসতে পারেন। কারণ রাজনীতি এখন অনেক বেশি অর্গানাইজড। অর্থের নিয়ন্ত্রণ, পরিকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ এখন অনেক বেশি নির্দিষ্ট। আগে এমনটা ছিল না। চার হাজার কোটি টাকা এল। তার ৯০ শতাংশ একটা বিশেষ দল পেয়ে গেল, এমন আগে হয়নি। অন্যরাও ভাগ পেতেন। মিডিয়াও এতটা বিক্রি হয়ে যায়নি। এই সরকারের আমলে অর্থনীতির আগ্রগতি কতটা হয়েছে, সে নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রধানমন্ত্রী নেতা হিসাবে খুবই দক্ষ এবং প্রভাবশালী কিন্তু অর্থশাস্ত্র নিয়ে দূরদর্শিতা কিংবা সাসটেন করার জ‌ন‌্য যে প্রাতিষ্ঠানিক বদল আনা দরকার, সেটা বোধহয় ওঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

– কিন্তু মানুষই তো সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে এই পার্টিকে আবার কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে। সচেতনতা বাড়ছে না কেন? মানুষ কেন তাও ভোট দিচ্ছে?
রবীশ কুমার: কোনও একটা দলকে ভোটে জয়ী করায় সমস্যা নেই। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতাকে ইস্যু করে যদি সেই দলকে জয়ী করা হয়, সমস্যা সেখানে। আমি সবসময় প্রশ্ন করি, কেন গো-রক্ষার নামে মানুষ মারতে হবে? কেনই বা মিডিয়াকে বিক্রি হয়ে যেতে হবে? মিডিয়া তো নিজের কাজ করলেই পারত। আর জনসাধারণের যাঁকে মনে হত, তাঁকেই ভোট দিত। কিন্তু মিডিয়ার শবদেহের উপর দাঁড়িয়ে যখন কোনও নির্বাচন করতে হয়, সেটা কিন্তু খুব ভয়ের। এবার প্রশ্ন হল, জনসাধারণের কাছে তথ্য পৌঁছবে কী করে? হয় মিডিয়া, নয় বিরোধী পক্ষ পৌঁছে দেবে। কিন্তু এক্ষেত্রে দু’জনেরই স্পেস কমে গিয়েছে। মিডিয়া আর সরকারকে প্রশ্ন করে না। বিরোধী পক্ষের প্রশ্ন নিয়ে ডিবেট কম হয়। এই সরকার মানুষকে বিরোধী পক্ষ ছাড়াই বাঁচতে অভ্যস্ত করে দিচ্ছে। সারা বছর যা চলছে, নির্বাচনের আগে সবটা খুব সুচিন্তিতভাবে বদলে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগে আগেই পাকিস্তান প্রসঙ্গ উঠে আসবেই আসবে।

-অর্থনৈতিক সংকটে ভারত। নোটবন্দির পর থেকেই এই পতন শুরু হয়েছে। তাও বলছেন মানুষ বুঝছে না?
রবীশ কুমার: না, বুঝছে না। কারণ, রাজনৈতিক পরিচয়ের যে ভিত, তা শুধু অর্থনৈতিক লাভ-লোকসান দিয়ে তৈরি হয় না। এমনও অনেকে আছে, যদি সে ক্ষতির মুখও দেখে, তবুও সে এই রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে বেরতে পারবে না। আর এই মতাদর্শ গিলিয়ে দেওয়ার যে পদ্ধতি, তা অনেক দিন ধরেই নিয়মিত হয়ে গিয়েছে। একদিনেরও বিরতি নেই। এতকিছুর পরেও কিন্তু আমাদের মধ্যে এই কনশাসনেসটা কাজ করছে না। ক্রমাগত মানুষ মরছে, কাশ্মীরে মানুষ মারা যাচ্ছে, তাও কাশ্মীরের মানুষের প্রতি এরা সহানুভূতিশীল নয়, তার মানে এরা নিজেদের প্রতিও সহানুভূতিশীল নয়। দেশটা বদলে গিয়েছে।

– মোদি সরকারের প্রথম টার্ম ও দ্বিতীয় টার্মের মধ্যে কোনও তফাত দেখতে পাচ্ছেন?
রবীশ কুমার: না। পুরোটাই আসলে একটাই টার্ম। প্রথম থেকেই অর্গানাইজড।

[ আরও পড়ুন: অভিজিৎ ‘অর্ধেক বাঙালি’, আর রবীন্দ্রনাথ?]

-আপনি সবসময়েই এই ইস্যুগুলো নিয়ে সরব? নতুন প্রজন্মকে কী বলতে চান?
রবীশ কুমার: আমি তো এসবই ভাবতে থাকি সারাদিন। প্রতিদিন ২০০০ শব্দ লিখি নিয়মিত। প্রতিদিন নতুন শিক্ষার আলোয় নিজের অন্ধকার দূর করি, প্রতিদিন নতুন তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি। এই কাজটা আপনাদেরও করতে হবে। জানি, ডিপ্রেশন আসবে, মনে হবে কেন করব, করে কী লাভ! কিন্তু এই ছোট ছোট উদ্যোগেই মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে। এই দেশে কত ছাত্রছাত্রী ইতিহাস পড়ে? যতজন ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যাল পড়ে, তার তুলনায় ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কিছুই না। আমরা আসলে ইতিহাস আর পড়ি না। নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে না জানলে, পড়াশোনা না করলে ভাবনার পরিসর তৈরি হবে কী করে? যদি আপনাকে জানতেই হয়, কথা বলতেই হয়, তাহলে দয়া করে আগে পড়ুন। অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেখা হলে প্রশ্ন করি, আচ্ছা বলো তো, এই দেশের সঙ্গে তোমার এত শত্রুতা কীসের? তুমি কখনও ভেবেছিলে যে তোমার দেশটা এইভাবে বদলে যাবে, যেখানে একজন সাংবাদিক মুখ খুললে তাঁর প্রাণের ভয় তৈরি হবে? তাঁর চাকরি চলে যাবে? এটা তুমি ঠিক কবে চেয়েছিলে? কেন চেয়েছিলে? বলতে পারবে? নিজের দেশের থেকে কীসের প্রতিশোধ নিতে চাও তুমি? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকেই দিতে পারে না।

(সমাপ্ত)

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং