৩ শ্রাবণ  ১৪২৬  শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯ 

BREAKING NEWS

Menu Logo বিলেতে বিশ্বযুদ্ধ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার
বিলেতে বিশ্বযুদ্ধ

৩ শ্রাবণ  ১৪২৬  শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯ 

BREAKING NEWS

রাজদীপ সরদেশাই: বক্তৃতায় চটকদার বুলি এবং অত্যাশ্চর্য সব আদ্যক্ষর বানিয়ে শ্রোতা টানার ক্ষমতা রয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। এই খ্যাতি যে তাঁর সত্যিই প্রাপ্য, মানতে হবে। যে কারণে তাঁর অর্থনৈতিক কর্মসূচি হালে ‘মোদিনমিক্স’ নামে বেশ ধুয়ো তুলেছে। এখনও পর্যন্ত, ক্ষমতার ছয় বছরে, সপ্তম (এতে একটি অন্তর্বর্তী বাজেটও আছে) অর্থনৈতিক বাজেটের প্রস্তুতির মুখে, প্রশ্ন জাগতে পারে- কী এই ‘মোদিনমিক্স’?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেদিন প্রথম শপথগ্রহণ করলেন, সেদিনের কথা স্মরণ করুন- তাঁর সমর্থকরা কী বলে গলার শিরা ফুলিয়েছিল! কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর এই উত্থানকে তারা তুলনা করেছিল উনিশ শতকের আটের দশকে মার্গারেট থ্যাচার বা রোনাল্ড রেগনের মতো আইকনিক নেত্রী-নেতাদের বৈপ্লবিক উত্থানের সঙ্গে, যখন বেসরকারীকরণ এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতির রমরমা। কিন্তু হায়! কী হল? মোদি ব্র‌্যান্ডের যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মসূচি নেহরুসুলভ সমাজতন্ত্রের চেয়েও পুরনো প্রতিভাত হল, যা একজন দক্ষিণপন্থী অর্থনীতিবিদেরও হয়তো কল্পনাতীত!

ক্ষমতায় এসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিক ঠিক জায়গায় প্রতিশ্রুতির উচিত স্বর তুলেছিলেন বটে, এই যেমন: ‘সরকার নয়, সরকারের কাজই বড় কথা’, বা ধরা যাক ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া’ বা ‘স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া’- মানে, ভারতীয় বাজারে স্বাধীন বাণিজ্যিক উদ্যোগের যা যা উচ্ছ্বাস এতকাল সুপ্ত হয়ে ছিল, সে সমস্ত শক্তিকে জাগিয়ে এবং চাগিয়ে তোলার স্লোগান তিনি ছুড়েছিলেন জনগণকে লক্ষ্য করে। যদিও বাস্তব আর তাঁর সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে রয়ে গিয়েছে যোজন যোজন ব্যবধান। তারপরেও যা বলা দরকার, তাঁর উন্নয়ন-মন্ত্র নির্ভরশীল থেকেছে প্রতিটি রাজ্যের বিনিয়োগের উপর। সেখানে অর্থনীতির প্রধান খাতগুলি জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণে চলে। অথচ, ‘এয়ার ইন্ডিয়া’ কিংবা আরও যা কিছু স্বতন্ত্র সম্পদ আজ ক্ষতিগ্রস্ত, সেসব ক্ষেত্রে মোদি সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যাপারে উদাসীনতা ও বিতৃষ্ণা বিশেষভাবে আজ লক্ষণীয়। রাজ্যস্তরের কর্মসূচিতে বিপুল সংস্কার আনা, কিংবা বিনিয়োগ কমানোর বদলে বিনিয়োগ ঘাটতি আরও বেশি করে পূরণের জন্য স্থানীয় পাবলিক সার্ভিস ইউনিটগুলিকে বিপুলভাবে একত্র করা হয়েছে।

২০১৪-তে বিজেপি সরকার যখন এল, সেই প্রথম মেয়াদে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর একটি সিদ্ধান্তের কারণে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছিলেন বিরোধী পক্ষের থেকে। জমি অধিগ্রহণের যে আইনের প্রস্তাব তিনি রেখেছিলেন, তাতে কর্পোরেট জগতের পক্ষে জমি অধিগ্রহণ করা আরও সুলভ হয়ে ওঠার জবানি ছিল বইকি। সেই কারণে, ‘সুট-বুটের সরকার’– এই বলে তাঁর সরকার এবং বিশেষ করে তাঁকে আক্রমণ করা হয়েছিল। ২০১৫-এর শেষদিক থেকে মোদি সরকার খুব সচেতনভাবে তাদের কর্মসূচি বৃহত্তর জনহিতকর খাতে বইয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগয়, যার উপর-উপর রাখা হল এক দরিদ্র নেতার প্রতিচ্ছবি। ২০১৬-র নভেম্বর মাসে এই পরিকল্পনা পরিণতি পেল ‘নোটবন্দি’ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। গণমাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বার্তা ছিল এমন- নৈতিকতার এক ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ তিনি, দেশের ‘ধন-শেঠ’-দের উচিত শিক্ষা দিয়ে দেশের কলুষ নির্মূল করে ‘পবিত্র’ করে তোলাই তাঁর এই মুহূর্তে একতম কাজ! রাজনীতিগতভাবে এই ‘তুকতাক’ মসৃণরূপে উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে বিজেপির জয় নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক হাসিল কিছু হল কি? বিনিয়োগ এবং ব্যবসায় বৃদ্ধির হার নাটকীয়ভাবে কমল, কৃষিখাতে আয় কমল, ভয়ংকরভাবে বাড়ল বেকারত্ব। এসবের থেকে স্পষ্ট: দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বীজ যেন আরও পরিপাটি করে রোপিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদে ‘বাস্তববাদী রাজনীতি’-র একজন নিখুঁত অভ্যাসী হিসাবে তিনি আন্দাজ করেছিলেন বেঁচে থাকার প্রাথমিক চাহিদাগুলি, যেমন– এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার, শৌচালয়, বাড়িঘর– এই সমস্ত কিছু যদি দেশের আপামর নিম্নবিত্ত জনগণের গার্হস্থ্য মনে অনুপ্রবেশ করিয়ে দেওয়া যায় এবং সেসব সুলভ করার কাজে রাজকোষকে ব্যবহার করা হয়, তবে তাঁর রাজনৈতিক মুনাফা হবে সুনিশ্চিত! তবে, এও তো ঠিক, ভোট টানবে বলেই ‘উজ্জ্বলা’, ‘স্বচ্ছ ভারত’, ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’-র মতো ব্যয়বহুল কর্মসূচি প্রয়োজনীয় সংস্কারের ‘বিকল্প’ কোনওভাবেই হতে পারে না। এমনকী, এও সুনিশ্চিত নয় যে, দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে এই যোজনাগুলি আরও ত্বরান্বিত করবে। সংস্কারের এই অভিঘাত যেমনটা শুরুতে মনে হয়েছিল, তার দীর্ঘ প্রভাব দেখা দিল অন্যভাবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য রান্নার গ্যাসে ছাড়, একইসঙ্গে ‘জিএসটি’-র মাধ্যমে আয়কর সংস্কার- প্রাথমিকভাবে জটিলতা তৈরি হলেও প্রশংসিত; কিন্তু জমি এবং শ্রমের মতো পরিসর যা রাজনৈতিকভাবে তলানিতে এবং যেসব ক্ষেত্রে সংস্কার ছিল আবশ্যক– সেসব দিক অনির্দিষ্ট ভবিতব্যর হাতে মুলতবিই রয়ে গেল।

সেই সংস্কারের সময় আজ দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। প্রথম মেয়াদে, যুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে তবু খানিক পানি পেয়েছেন। ২০১৪ থেকে ২০১৭– কাঁচামালের দামে স্বাভাবিকতা– সরকারকে বৃহৎ অর্থনৈতিক ভারসাম্যে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু ব্যাংকিং পরিষেবার মতো আশঙ্কাজনক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৃদ্ধির ভাবনাচিন্তা অবহেলিতই থেকে গেল। ‘এনপিএ’-র অত্যধিক ভারে জর্জরিত ও দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যাঙ্কগুলিকে স্থিতাবস্থায় ফিরিয়ে তোলার পথ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিলেন না। ‘ব্যালান্স শিট’ সংকটের খানিক মেরামতির উপায় হিসাবে মুনাফা লাভের পথ নিলেন তিনি। হয়তো ওই সময়ে দেখেছিলেন ব্যাঙ্কিং পরিষেবা সংস্কারে তঁার কোনও রাজনৈতিক মুনাফা নেই। তঁার পদক্ষেপে অর্থশূন্যতা থেকে ব্যাঙ্কগুলি বাঁচল বটে, তবে ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্র উজ্জীবিত করে তোলা বা অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও শ্রীবৃদ্ধি দেওয়ার মতো জোরালে তা ছিল না।

প্রথম মেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতির হাওয়া যথেষ্ট পরিমাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুকূলে ছিল। তা সত্ত্বেও, বিমুদ্রাকরণের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি, যা দেশের অর্থনৈতিক ভিত নড়িয়ে দেওয়ার জন্য ছিল যথেষ্ট। এমন জরুরি অবস্থা-সুলভ সংস্কার নিশ্চিত রূপে দরকার ছিল না, কিন্তু করা হল।

‘মোদি ২.০’ পর্বে দেশের ঘরোয়া রাজনৈতিক বাতাস অবশ্য তাঁকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খাচ্ছে, তঁারই অঙ্গুলিহেলনে সেই বাতাস নিয়ন্ত্রিত। ১৯৮৪-তে রাজীব গান্ধীর পর, সন্দেহাতীতভাবে সংসদ ভবনের ভিতরে এবং বাইরে, এমন অনুকূল অবস্থা সম্ভবত আর কারও কপালে জোটেনি। বছর ঘুরতে না ঘুরতে রাজ্যসভাতেও হয়তো অর্থনৈতিক বিল নিয়ে আর প্রশ্ন করার বা বিল স্থগিত রাখার ক্ষমতাও থাকবে না। তবে ‘এক দেশ, এক ভোট’-এর যে ধুয়ো উঠেছে, সেদিকে তৎপর না হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরং উচিত বিনিয়োগের গতি যথেষ্ট রকম অব্যাহত রাখা। কিন্তু এটা সহজ কাজ নয়। বিনিয়োগকারীরা এখনও এই সরকার নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, তার কারণ একটাই– অনিশ্চয়তা। কীসের অনিশ্চয়তা, না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তঁার কর্মসূচিতে অবিচল থাকবেন তো? না কি তঁার ‘ব্র‌্যান্ড’ আরওই জনমোহিনী ও ‘জাতীয়তাবাদী’ আকার নেবে– যেখানে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক দর কষাকষির প্রভাবে সিদ্ধান্ত যাবে বদলে? এমনকী, সমস্যার মূল হিসাবে অন্যান্য কিছু সমাধানহীন প্রশ্নও রয়েছে– যেমন, রিজার্ভ ব্যাঙ্কে কি আদৌ স্বায়ত্তশাসন থাকবে, না কি, সরকারের শর্তাদেশে, অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত হবে এই সংস্থা?

প্রধানমন্ত্রী যে থ্যাচার বা রেগনসুলভ মার্কেট-চৌকস রাজনীতিবিদ নন, তা বুঝতে বাকি নেই। অন্ততপক্ষে তিনি কি নরসিংহ রাওয়ের আদলে একজন অর্থনৈতিক দূরদ্রষ্টাও হতে পারবেন? সংখ্যালঘু সরকারের নেতা হিসাবে নরসিংহ রাও অভূতপূর্ব মোকাবিলা করেছিলেন অর্থনৈতিক সংকটের, তাঁকে বাধ্য হয়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে ঝুঁকতে হয়েছিল, কিন্তু তিনি দমেননি। ভারতের অর্থনীতির মুখোমুখি দঁাড়িয়েছিলেন। দেশের সর্বাধিপতি হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হয়তো তেমন কোনও বাধ্যবাধকতা বোধ করছেন না। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে তাঁর নাম পাকাপাকিভাবে থেকে যাওয়া, এই বুঝি তাঁর একমাত্র অভীপ্সা। তাহলে নব্যভারতের নিশ্চয়ই আর বুঝতে বাকি নেই, ‘মোদি-নমিক্স’ বলতে আসলে কী বোঝায়!

পুনশ্চ বিগত দশকে ভারতীয় রাজনীতিতে কোন নেতার পারদের মতো উল্লম্ফন ঘটেছে, বলতে পারেন? না, নরেন্দ্র মোদি নন, অমিত শাহও নন; তিনি– নির্মলা সীতারমন, দশ বছর আগে বিজেপির মুখপাত্র হিসাবে যোগদান করেছিলেন এবং আজ তিনি অর্থমন্ত্রী। প্রশ্ন হল: দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিও কি শ্রীমতী সীতারমনের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে পাল্লা দেবে? না কি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘নর্থ ব্লক’ যেখানে অর্থমন্ত্রীর ঘর, তা কেবলই সর্বশক্তিমান কার্যালয়ের নিষ্ক্রিয় উপাঙ্গ হয়েই থেকে যাবে? সময়ই বলবে।

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং