Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
Rathyatra

‘তিনি আমার নিয়ন্তা’, রথে নিজের অনুভূতির কথা লিখলেন দ্রৌপদী মুর্মু

রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবার সংসদের সেন্ট্রাল হলে ভাষণ দেওয়ার সময় জগন্নাথদেবকে অনুভব করেছিলেন রাষ্ট্রপতি।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ১৬, ২০২৬, ১৪:২৩

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ১৬, ২০২৬, ১৪:২৩

options
link
‘তিনি আমার নিয়ন্তা’, রথে নিজের অনুভূতির কথা লিখলেন দ্রৌপদী মুর্মু zoom
রথের দিন প্রভু জগন্নাথদেবকে নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা লিখলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু

আজ রথযাত্রা। বাইরে লোকারণ্য, মহা ধূমধাম। ভিতর-মনে আমি শান্ত। মহাপ্রভুতে সমাহিত।আজ, ভক্তকবি মুধুসুদন রাওয়ের সেই গানটি গুনগুন করে গাইব দিনভর ‘মহাপ্রভু দিব্য রাত আমার সঙ্গে রয়েছেন।’ জীবনের প্রতিটি সংকটে, প্রতিটি আনন্দঘন মুহূর্তে তাঁকে স্মরণ করে কেটেছে আমার। লিখলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু

আশৈশব শ্রীজগন্নাথদেবের উদ্দেশে রচিত ও গীত অনেক স্তোত্র এবং প্রার্থনা শুনেছি। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের উদ্দেশে যখন ভজন গাইতাম, তখন বড় আনন্দ পেতাম। মহাপ্রভুর খুব কাছে রয়েছি বলে মনে হত। এখন অবশ্য ভজন গাইতে পারি না, কিন্তু তাঁর কথা রোজ মনে পড়ে, ভজনগুলি শুনগুনিয়ে গাই। আমি সবসময় অনুভব করি – মহাপ্রভু আমার পাশেই রয়েছেন। সংকটের সময়কালে তিনি আমার সহায় হন। আজ, ভক্তকবি মুধুসুদন রাওয়ের সেই গানটি গুনগুন করে গাইব দিনভর ‘মহাপ্রভু দিব্য রাত আমার সঙ্গে রয়েছেন। এই কথা যখন মনে পড়ে। আমি তখনই অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। তাঁকে প্রণাম জানাই।’

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

এমন একটি বয়সে এসে পৌঁছেছি, যখন বিশ্ব চরাচর সম্পর্কে অনেক কিছু বুঝতে পারি, মহাপ্রভু জগন্নাথের বিশালত্ব উপলব্ধি করতে পারি। আমাদের বাড়িতে মহাপ্রভু জগন্নাথকে নিয়ে নিয়মিত চর্চা হত। এই আলোচনা আমাদের গ্রামেও হত। গ্রামে যে স্কুলে পড়তাম, সেখানে প্রার্থনার সময় ভক্ত সালবেগের লেখা ‘অহে নীলো শৈলা’ স্তোত্রটি নিয়মিত গাওয়া হত। আমাদের শিক্ষক মহাপ্রভু জগন্নাথ সম্পর্কে অনেক কিছু বলতে – পুরীতে সুবিশাল এক মন্দির রয়েছে, অন্য কোনও মন্দিরের সঙ্গে যার তুলনা করা যায় না। এ মন্দিরে মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথ, তাঁর বোন সুভদ্রা এবং বড়দাদা বলভদ্র একসঙ্গে পূজিত হন। মহাপ্রভু জগন্নাথ কৃষ্ণবর্ণের, তাঁর বর্তুলাকার চোখ। সুভদ্রা হরিদ্রবর্ণা। বলভদ্রের গায়ের রং সাদা, অনেকটা চাঁদের আলো এসে পড়া ফুলের পাগড়ির মতো। যখন এই ত্রিদেবদর্শন করবেন, তারপর থেকে কখনওই তাঁদের ভুলতে পারবেন না।

শৈশব থেকে মহাপ্রভু জগন্নাথ দেবের ভক্ত। সর্বদাই তাঁর আরাধনা করি। তিনি আমার জীবনের উত্থান-পতনের নিয়ন্তা। আমার আনন্দ ও দুঃখের সঙ্গী তিনি। আমার জীবনে অনেক সময়ই আমি নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। মহাপ্রভু সবসময়ই আমাকে সংকট থেকে উদ্ধার করেছেন – কারণ, আমি তো তাঁরই মেয়ে।

আমাদের শিক্ষক প্রায় বলতেন, জগন্নাথদেব হলেন মহাপ্রভু’, তাঁর প্রসাদ ‘মহাপ্রসাদ’। তাঁর মন্দির ‘বড় দেউলো’, তাঁর পথ ‘বড় দাও’ এবং তাঁর সমুদ্র ‘মহোদধী’। ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র’ পুরী – আমার গ্রামের বাড়ি থেকে বহু দূর। আমার গ্রামের বাড়ি ময়ূরভঞ্জ জেলার উপারবেড়ায়। তাহলে আমি কীভাবে পুরী যাব? বড় হওয়ার পর আমি ভুবনেশ্বরে গিয়ে ইউনিট টু গার্লস হাই স্কুলে নাম নথিভুক্ত করেছি। সেখানকার হস্টেলে থাকা শুরু করি। সেই সময় আমি পুরী, ভুবনেশ্বর এবং কোনারক দর্শনের সুযোগ পাই। মহাপ্রভু জগন্নাথের প্রথম দর্শনের কথা এখনও আমার মনের মণিকোঠায় সমুজ্জ্বল। কী বিশাল মন্দির। কত বড় বিগ্রহ। এগুলি কী কখনও ভোলা যায়? কেউ কি মহাপ্রভু জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার কথা ভুলতে পারেন? শ্রীক্ষেত্রে বছরে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ উদযাপিত হয়। কিন্তু রথযাত্রা যেভাবে উদ্যাপিত হয়, তা অভূতপূর্ব। মহাপ্রভুর দর্শন পেতে সাহু বছর ধরে ভক্তরা মন্দিরে ভিড় জমান। কিন্তু বছরে একবার মহাপ্রভু স্বয়ং মন্দির ত্যাগ করেন এবং গুন্ডিচা মন্দিরে যাওয়ার সময় বিশাল পথ ধরে যখন তিনি যান, তখন ভক্তরা তাঁকে দর্শন করেন। তিনটি সুবিশাল রথে চক্ররাজা সুদর্শনকে সঙ্গী করে এই তিন বিগ্রহ গুণ্ডিচা মন্দিরে যান। তাঁরা সেখানে ৭ দিন থাকেন এবং তারপর ফিরে আসেন। মহাপ্রভুর এই সুবিশাল উৎসবের কোনও তুলনা হয় না।

শৈশব থেকে মহাপ্রভু জগন্নাথ দেবের ভক্ত। সর্বদাই তাঁর আরাধনা করি। তিনি আমার জীবনের উত্থান-পতনের নিয়ন্তা। আমার আনন্দ ও দুঃখের সঙ্গী তিনি। আমার জীবনে অনেক সময়ই আমি নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। মহাপ্রভু সবসময়ই আমাকে সংকট থেকে উদ্ধার করেছেন – কারণ, আমি তো তাঁরই মেয়ে।

২০২২ সালের ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি রূপে শপথ নেওয়ার জন্য সংসদের সেন্ট্রাল হলে যখন আমি যাচ্ছিলাম, পুরো রাস্তায় মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের প্রার্থনা করছিলাম। তাঁর আশীর্বাদে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি রূপে আমি যখন প্রথম ভাষণ দিই, সেই সময় আমার মনে হচ্ছিল তিনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যখন আমার নাম ঘোষণা করা হয়, সেই সম্যা আমি মহাপ্রভুকে স্মরণ করেছিলাম। আমি তাঁর প্রার্থনা করে বলেছিলাম-“তুমি আমাকে এই সুউচ্চ স্থানে বসাচ্ছ, তুমি সবসময়ই আমার সঙ্গে থাকবে এবং আমার প্রতিটি পদক্ষেপ কী হবে, সেটি তুমিই নির্ধারণ করবে।” তিনি আমার প্রার্থনা শুনেছেন। তিনি সবসময়ই আমার ডাকে সাড়া দেন। যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে, সেই সময় রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। আমি তখন দিল্লিতে ছিলাম, তাই পুরীতে যাওয়া আমার সম্ভব হয়নি। রথযাত্রার দিন খুব সকালে আমি দিল্লির হজ খাসে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে মহাপ্রভুর দর্শন করি। আমার মন। আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর আশীর্বাদ আমার উপর বর্ষিত হয়। আমি আস্থায় ভরপুর হয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করি। বিপুল উৎসাহের সঙ্গে নির্বাচনে প্রচার চালাই। ২০২২ সালের ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি রূপে শপথ নেওয়ার জন্য সংসদের সেন্ট্রাল হলে যখন আমি যাচ্ছিলাম, পুরো রাস্তায় মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের প্রার্থনা করছিলাম। তাঁর আশীর্বাদে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতি রূপে আমি যখন প্রথম ভাষণ দিই, সেই সময় আমার মনে হচ্ছিল তিনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তবে আমার মন পড়েছিল সুদূর পুরীতে। মহাপ্রভুকে দর্শন করার জন্য ব্যাকুল হয়েছিলাম। দিন চলে যায়, কিন্তু আমি পুরী যেতে পারছিলাম না। তিনি না চাইলে কেউ কি তাঁর দর্শন করতে পারেন। নীরবে তাঁর কাছে প্রার্থনা করতাম, ‘আমি যদি কোনও দোষ করে থাকি, মহাপ্রভু আমায় তুমি ক্ষমা করো। কিন্তু তুমি আমাকে তোমার দর্শনের সুযোগ করে দাও।’

তিনি হলেন ‘ভাব’-এর মহাপ্রভু। কীভাবে যেন তিনি আমার মনের আকৃতি বুঝেছিলেন। খুব শীঘ্রই পুরী যাওয়ার স্থির হয়। দিনটি ছিল ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর। পুরীতে পৌঁছে গাড়ির বহর চলেছে শ্রীমন্দিরে। গাড়ির বছর যখন বড় দাণ্ডে পৌঁছল, আমার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি! বড় দাণ্ড তো শ্রীজগন্নাথ দেবের। সেখানে কি কোনও প্রোটোকলের প্রয়োজন রয়েছে? শ্রীক্ষেত্র পুরী হল সব তীর্থস্থানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। মহাপ্রভু সব দেবতার অধীশ্বর। আমি আর কিছু না-ভেবে আমার গাড়িকে থামতে বললাম। তারপর আমি মন্দিরে প্রবেশ করলাম। যখন আমি। গর্ভগৃহে পৌঁছলাম, চারটি বিগ্রহ দর্শন করলাম, তখন তাঁদের আশীর্বাদধন্য হয়ে আমি আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম।

যখন থেমে গেল, স্বাভাবিকভাবে আমার পিছনে থাকা গাড়িগুলিও থেমে যায়। কেউ কিছু বোঝার আগেই খালি গায়ে বড় দাণ্ডে নেমে এসেছিলাম। শ্রীমন্দির সেখান থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে। মন্দিরের নীল চক্র এবং মন্দির চুড়ার পতিতপবন কাজের দিকে তাকিয়ে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে চললাম। যখন হাঁটছিলাম তখন রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, মহিলা, যুবক-যুবতী এবং বয়স্কদেরকেও শুভেচ্ছা জানিয়েছি। আমার মন জুড়ে তখন মহাপ্রভু। আমি যখন মন্দিরের সিংহদ্বারের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন আর স্থির থাকতে পারলাম না। আমি নিজেকেই ভুলে গেলাম। পবিত্র বড় দাণ্ডেতে দাঁড়িয়ে, ধূলিমাখা চরণে আমি মহাপ্রভুকে প্রণাম দূর করেন। তাই তাঁর ওই গোলাকার চোখের পাতা কখনও পড়ে না। তিনি ধনী-দরিদ্রর ভেদাভেদ করেন না। তাঁর চোখে প্রত্যেকেই সমান। সাম্যই তাঁর মন্ত্র। করুণাসিন্ধু মহাপ্রভুর আশীর্বাদে আমি সমাজের প্রতিটি শ্রেণিকে সেবা করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছি।

মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের দিকে তাকিয়ে আমি করজোড়ে প্রার্থনা করেছিলাম ”হে মহাপ্রভু, আপনার আশীর্বাদধন্য হয়ে আমি যেন সর্বদা জনগণের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করি। হে কৃপানিধি, আমাদের দেশ, সমগ্র বিশ্বকে আপনি রক্ষা করুন।” এই প্রার্থনা করে আমি ভক্তিভাবে বিলীন হয়ে যাই।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.