সুব্রত পাল: রাজ্যে বিশ্বকর্মা পুজো শেষ হল। বেশ কিছু জায়গায় পুজো সংখ্যায় বাড়লেও বাড়েনি পুরোহিত। এমনই একটি জায়গা চোখে পড়ল। হাওড়া জেলার জগৎবল্লভপুরে বড়গাছিয়া পঞ্চায়েত এলাকা। এখানে ছোট ছোট বাজেটের পুজোয় আড়ম্বর না থাকলেও আন্তরিকতা আছে পুরো মাত্রায়। এলাকায় প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ধাতব পণে্যর ছোট-মাঝারি কারখানা এবং তারই প্রেক্ষিতে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিশ্বকর্মা পুজো। বিগত সরকারের আমলে দেশের মধ্যে বাংলায় ক্ষুদ্রশিল্পের একটা জায়গা ছিল– এটা অস্বীকার করা যাবে না। ওই এলাকায় বেশ কয়েকজন আমার বন্ধুবান্ধব রয়েছে, যারা এই ক্ষুদ্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। শ্রমের মর্যাদায়, কর্মচারী থেকে মালিক, বন্ধুবান্ধব, পরিবার– সকলেই এই বিশ্বকর্মা পুজোকে নিজেদের কারিগরি ও কর্মশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি উৎসব বলে মনে করে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় এলাকায় এতই পুরোহিতের অভাব যে, তা সরস্বতী পুজোকেও হার মানায়! ফলস্বরূপ অযথা বিলম্বিত হয় পুজো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায় অধিকাংশ পুজোতে। আমরা কি এই পুরোহিত সমস্যার সমাধান করতে পারি না?
আরও পড়ুন:
সনাতন ধর্মে প্রাচীনকাল থেকেই বিদুষী নারীদের শাস্ত্রচর্চা ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ রয়েছে। বাংলায় সিআইটি রোড সংলগ্ন টালা-বেলেঘাটা এলাকায় ২০২০ সালে মহিলা পুরোহিতের পৌরোহিত্যে পাভলভ (মানসিক) হাসপাতালে পুজো করার চল শুরু হয়।
এরপর থেকে ক্রমশ দুর্গাপুজো ও সরস্বতী পুজোয় নারীশক্তির নতুন রূপের বার্তা ছড়িয়ে পড়লেও দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে পুরুষতান্ত্রিক চেনা ছক থেকে সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে আসা এখনও যেন বেশ সময়ের অপেক্ষা। পুরুলিয়ায় ‘নিস্তারিণী মহিলা মহাবিদ্যালয়’-এ ২০০৮ সাল থেকে ছাত্রীরা পেশাদার পুরোহিতের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে সরস্বতী পুজো সম্পন্ন করে আসছে। ২০১৯ সাল থেকে শিলিগুড়ির স্কুল ও মালদহের কলেজে সরস্বতী পুজোয় ছাত্রীদের পৌরোহিত্য নজির সৃষ্টি করেছে।
পৌরোহিত্যর মতো পেশা বা সেবায় নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পুজোয় আলপনা, ধুনুচি নাচ, পুজো পরিচালনা– এসবের মধ্যে রয়েছে নারীর সহযোগিতা। তাহলে পুজোয় পৌরোহিত্যে কেন পিছিয়ে?
মনে রাখা দরকার ছোট হলেও ঘরের লক্ষ্মীপুজোর পুজোপাঠ নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে পুরনো পরিস্থিতি কিন্তু ধীরে ধীরে হলেও পাল্টাচ্ছে। কুসংস্কারের কিছু সামাজিক ও মানসিক বাধা দূর করে নারীদের এই পেশায় আরও বেশি বেশি করে আসা উচিত বলে মনে করি। তাহলে সরস্বতী পুজো, বিশ্বকর্মা পুজোর মতো ছোট ছোট বহু পুজো অনুষ্ঠানে পুরোহিত-সমস্যা দূর হবে। পুজোর সময়কে আরও মূল্যবান করে তুলতে সরকারের উচিত নারীদের এই পুরোহিত-বিদ্যা শেখার আনুষ্ঠানিক সুযোগ করে দেওয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিকাঠামো খুবই সীমিত এবং এই পেশায় আসার জন্য পরিবারের দিক থেকেও কোনও উৎসাহ পাওয়া যায় না। তাছাড়া প্রাচীন মানসিকতা ও কুসংস্কারের কারণে অনেক পরিবার বা সমাজ নারীদের এই পৌরোহিত্যর কাজকে এখনও অতি সহজে মেনে নিতে পারে না।
তবে সময় ও দিন বদলেছে। সেই বদলের ছায়া দেখা গিয়েছে কুমোরটুলিতে। দ্রুতবেগে উঠে আসছেন আগামী প্রজন্মের মহিলা মৃৎশিল্পীরা। কুমোরপাড়াতে বদল এসেছে। পুজোয় মহিলা ঢাকিও এসেছেন। এক্ষেত্রে কিছুটা বদলেছে পরিবার এবং সমাজের মানসিকতা। একটা সময় মেয়েদের প্রকাশ্যে ঠাকুর বানানো মেনে নেওয়া হত না। বিগত পঁাচ-সাত বছরে নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নারী পুরোহিত এখন বিয়ে, দুর্গাপুজো এবং অন্যান্য সামাজিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান সফলভাবে পরিচালনা করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় চার দশকে প্রতি বছর মহানগরে দুর্গাপুজোর আগে দিন দশ পুরোহিতদের সংস্কৃতের সাধারণ ব্যাকরণ জ্ঞান ও পুজো পদ্ধতির প্রশিক্ষণ চলে। এই প্রশিক্ষণ শিবিরে মৌলিক শিক্ষার পাশাপাশি পুজোর প্রকরণ এবং দেবীর বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত যাবতীয় নিয়ম হাতে-কলমে শেখানো হয়।
তুলনামূলকভাবে কম হলেও বর্তমানে মহিলারাও পুজো শিখতে আগ্রহী। তাই তাঁরা শিবিরে যোগ দিচ্ছেন। চলতি বছরে আরও বেশি সংখ্যায় নারী যোগদান করুক। ২০২১ সালে কলকাতার ৬৬ পল্লি দুর্গোৎসবে প্রথমবার ৪ জন নারী পুজো করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তারপর থেকেই পরিস্থিতি কিন্তু পাল্টাচ্ছে। নারীদের মন্ত্রপাঠের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র একেবারে নেই তা বলব না। বাস্তবিক রাজ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন রয়েছে, যা নারীদের পুজোপাঠ ও পৌরোহিত্যের শিক্ষা দেয়। কলকাতায় রয়েছে সর্বভারতীয় প্রাচ্য বিদ্যা অ্যাকাডেমি। এখানে দুর্গাপুজো-সহ বিভিন্ন পুজোর আচার-অনুষ্ঠান ও মন্ত্রপাঠের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় (নদিয়া ও বঁাকুড়া) রয়েছে বৈদিক মিশন ও টোল। সেখানে বর্তমানে বিকল্প পেশা বা আত্মিক উন্নতির জন্য নারীদের উপনয়ন ও পৌরোহিত্যর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
মনে পড়ে, ২০২০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’ ছবিতে নারী পুরোহিত চরিত্রে ঋতাভরী চক্রবর্তীকে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে। এই ছবিতে ‘শবরী’ চরিত্রটির মাধ্যমে সমস্ত সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার ভেঙে নারীদের পৌরোহিত্যের অধিকারের কথা তুলে ধরা হয়েছে এবং নারীদের এই পেশায় আসতে দারুণভাবে অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়েছে। নারীদের পুরোহিত সাজাটা যেন ছবিতেই আটকে না থাকে। পুরুষদের সঙ্গে তঁারা এগিয়ে এসে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক এবং মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করুক। ধর্ম বা ঈশ্বর সাধনায় লিঙ্গ নয়, বরং ভক্তি নিষ্ঠা এবং শাস্ত্রীয় জ্ঞানই আসল যোগ্যতা হোক।
সর্বশেষ খবর
-
সুপ্রিম দরবারে অমীমাংসিত তৃণমূলের ‘প্রতীক-যুদ্ধ’, কমিশনকে শিব সেনা মনে করাল আদালত
-
প্রধান নির্বাচক পদে আগরকর আর কতদিন? জানিয়ে দিল বোর্ড, জানানো হল উত্তরসূরি বাছার দিনক্ষণও
-
আবার বিহার! কিশোরীর পথ আটকে যৌন নিগ্রহ, অশালীন আচরণ, বন্ধুকে মার, প্রকাশ্যে ভিডিও
-
নতুন করে পুলিশি পদক্ষেপ নয়, হাই কোর্টের নির্দেশে স্বস্তিতে নন্দীগ্রামের জেলবন্দি কংগ্রেস প্রার্থী
-
একবছরে ২৫০০ কোটির লোকসান শাহরুখের! ‘ধনকুবের’ বাদশার ক্যাশবাক্সে আচমকা টান কেন?