BREAKING NEWS

১২ আশ্বিন  ১৪২৭  বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ 

Advertisement

সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা, পরিচয়পত্র বা প্রকল্প তৈরি নয়

Published by: Subhamay Mandal |    Posted: August 18, 2020 2:05 pm|    Updated: August 18, 2020 2:05 pm

An Images

ছবি: প্রতীকী

ইদানীং কেন্দ্রের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যা বড় বড় ঘোষণা, সবই বিমাকেন্দ্রিক। স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে মোদি যে স্বাস্থ্য পরিচয়পত্রের ঘোষণা করলেন, তাতেও বিমা কোম্পানির স্বার্থ রয়েছে বলে অভিযোগ। অতিমারীর মধ্যে সরকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর জন্য বড়সড় প্রকল্পের কথা ভাববে বলে যাঁরা ভাবছিলেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে হতাশ। সরকারের দায়িত্ব চিকিৎসা ব্যবস্থা সব নাগরিকের জন্য সুনিশ্চিত করা। পরিচয়পত্র বা প্রকল্প তৈরি নয়। লিখেছেন সুতীর্থ চক্রবর্তী

করোনা অতিমারীর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে স্বাস্থ্য নিয়ে বহু শব্দ খরচ হবে, তা নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। হয়েওছে তাই। তবে প্রত্যাশামতো প্রধানমন্ত্রী দেশের বাজারে করোনা ভ্যাকসিন আসার দিনক্ষণ ঘোষণা করেননি। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) বিশ্বকে চমকে দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে মানবদেহে পরীক্ষার আগেই যেভাবে করোনা ভ্যাকসিনের ঘোষণা করে দিয়েছেন, তাতে মনে হয়েছিল ১৫ আগস্ট লালকেল্লার (Lal Qilla) প্রাকার থেকে মোদিও সেরকম কিছু বলবেন। সেই আশা ভারতবাসীর পূরণ হয়নি। তবে দেশে করোনা ভ্যাকসিনে সবুজসংকেত আসামাত্র, তা যে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে, সেই আশ্বাস মোদির (Narendra Modi) ভাষণে মিলেছে। মোদির মুখ থেকে ভ্যাকসিন নিয়ে সবিস্তার কিছু জানা না গেলেও তিনি লালকেল্লা থেকে দেশবাসীর জন্য স্বাস্থ্য পরিচয়পত্রের যে ঘোষণা করেছেন, তা নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে।

নয়া উদারবাদী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যই হল, সমাজে রাষ্ট্রের ভূমিকা সংকুচিত হবে। আটের দশক থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকারি খরচে দেশে বড় বড় প্রকল্প তৈরির কাজ কমছে। স্বাধীনতার পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার হাত ধরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই কলকারখানা থেকে সব বড় বড় পরিকাঠামো দেশে গড়ে উঠত। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশজুড়ে পরিকাঠামো তৈরির শেষ যজ্ঞ আমরা সম্ভবত অটলবিহারি বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee) সরকারের আমলে দেখেছি। ওই সময় ‘সোনালি চতুর্ভুজ’ নির্মাণ প্রকল্প যখন হচ্ছিল, তখন সত্যিই ভাল লাগত। গোটা দেশে ঝাঁ-চকচকে রাস্তা তৈরির সে কী বিরাট এক উদ্যোগ! বিদেশিরাও দেখে চমকে যেত। পরবর্তী কয়েক বছরে দেশের আর্থিক বিকাশে ওই সড়ক তৈরির প্রকল্পের যে বিরাট অবদান ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত, ‘সোনালি চতুর্ভুজ’ দেশের অর্থনীতিতে এক বড় পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু, তারপর পরিকাঠামোয় সর্বব্যাপী কোনও রাষ্ট্রীয় প্রকল্প আমরা দেখিনি। ইদানীং সরকারি স্তরে যেসব প্রকল্প ঘোষণা হয়, তা মূলত তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর পরিষেবা।

[আরও পড়ুন: বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ৩০০ বছর আগের নীতি নিয়েই মেয়ের উপর করোনা ভ্যাকসিন প্রয়োগ পুতিনের]

অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার চলে যাওয়ার পর মনমোহন সিংয়ের আমলে টানা দশ বছরে সরকারের তরফে আধার কার্ড ছাড়া আমরা সেভাবে কিছুই পাইনি। নরেন্দ্র মোদির ছ’বছরেও গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার নির্মাণের কাজটি ছাড়া আর কিছুই ‘ব্রিক অ্যান্ড মর্টার’ নয়। অর্থাৎ, ইট, বালি, কাঠ, সিমেন্ট দিয়ে সেসব প্রকল্প মাটির উপর তৈরি হচ্ছে না। হয় ‘অ্যাপ’ তৈরির মাধ্যমে কোনও পরিষেবা, নতুবা কোনও পরিচয়পত্র তৈরি, কিংবা ব্যাংকে টাকা চলে যাওয়া ইত্যাদি প্রকল্প। অতিমারীর মধ্যে সরকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর জন্য বড়সড় প্রকল্পের কথা ভাববে বলে যাঁরা ভাবছিলেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে হতাশ। কল্যাণীতে আঞ্চলিক এইমস গড়ার কাজ প্রায় শেষের পথে। গত ন’বছরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্যোগে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো বাড়ানো, কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজ চালু করা, এইরকম আরও কিছু পরিকাঠামো গঠনের কাজ যে হয়েছে, সেকথা ঠিক। কিন্তু দেশজুড়ে চিকিৎসা পরিকাঠামোয় আরও যে বিপুল লগ্নির প্রয়োজন তা কোথায়? আটের দশকের শেষ থেকে আমরা শুধু শহরাঞ্চলে বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠতে দেখছি, যেখানে চিকিৎসার খরচ বিপুল। বাম আমলেই ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের ধারে একটার পর একটা বেসরকারি হাসপাতালের ইমারত তৈরির কাজ শুরু হয়। সেগুলি দেখে একবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু খেদ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, ছোট ছোট জানলাওয়ালা ওই বাড়িগুলোর দিকে তাকালে তাঁর ‘হোটেল’ বলে ভ্রম হয়।

ইদানীং কেন্দ্রের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যা কিছু বড় বড় ঘোষণা, তা সবই বিমাকেন্দ্রিক। স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে মোদি যে স্বাস্থ্য পরিচয়পত্রের ঘোষণা করলেন, তাতেও বিমা কোম্পানির স্বার্থ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী ‘আয়ুষ্মান ভারত’ নামে একটি স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প ঘোষণা করেছেন। সব রাজ্য যদিও ওই প্রকল্প চালু করেনি। এই প্রকল্পে গরিব মানুষের কতটা সুবিধা হচ্ছে, জানা নেই। গ্রামেগঞ্জে যদি হাসপাতালই না থাকে, তাহলে শুধু বিমা দিয়ে কী হবে? অথচ দেখা যাচ্ছে, সরকার স্বাস্থ্যখাতে বাজেটে যে টাকাটা বরাদ্দ করছে, তার সিংহভাগই চলে যাচ্ছে বিমা কোম্পানির পকেটে। লালকেল্লা থেকে মোদি ঘোষণা করেছেন, দেশের সব মানুষের একটি স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র থাকবে এবং আধার কার্ডের মতো একটি নম্বর থাকবে। ওই নম্বরের মধ্যে ব্যক্তির স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য দেওয়া থাকবে। প্রতিবার যখন ওই ব্যক্তি চিকিৎসা করাতে যাবে, তখন নম্বরটি দিয়ে চিকিৎসক রোগী সম্পর্কে সব তথ্য পেয়ে যাবেন। কোনও কিছু পরীক্ষা করাতে হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকে গেলে এবং ওষুধ কিনতে গেলেও নাকি ওই স্বাস্থ্য পরিচয়পত্রে তথ্য সংরক্ষিত হবে। যেখানে গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী দেশের প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ মানুষের চিকিৎসার সুযোগটুকুই নেই, সেখানে এই পরিচয়পত্রের কথা তো একটু অবাস্তবই শোনায়। সরকারি হিসাবেই দেশে স্বাস্থ্য বিমার উপভোক্তা শহরাঞ্চলে ১৮ শতাংশ মানুষ ও গ্রামে ১৪ শতাংশ মানুষ। এর বাইরে হয়তো রয়েছে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে উপকৃতরা। শুধু এদের জন্যই কি তাহলে স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র ও ‘ন্যাশনাল ডিজিটাল হেল্‌থ মিশন’-এর কথা ভাবা হয়েছে? এই ধরনের তথ্য একজায়গায় থাকলে বিমা কোম্পানির সুবিধা। জালিয়াতি করার সুযোগ কমবে। অনেকে বলছে, মানুষের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য একজায়গায় থাকলে ওষুধ কোম্পানিরও সুবিধা। তারা বুঝতে পারবে কোন ওষুধ উৎপাদন জরুরি, কোনটা নয়।

[আরও পড়ুন: বেহাল অর্থনীতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারিকরণই বিকল্প পথ]

এই প্রসঙ্গেই যে মৌলিক প্রশ্নটি উঠে আসে, তা হল, দেশের সরকার কেন মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার বিষয়টি শুধু বিমা করানোর দৃষ্টি বা এইরকম একটি পরিচয়পত্র তৈরির মাধ্যমে দেখবে? সরকারের কাজ বড় বড় হাসপাতাল তৈরি করা। গ্রামেগঞ্জে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ। দেশে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা। চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি কেনা। শিশু ও প্রসূতি মৃত্যুর হার শূন্যে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। মোদ্দা কথা, সরকারের দায়িত্ব চিকিৎসা ব্যবস্থা সব নাগরিকের জন্য সুনিশ্চিত করা। স্বাধীনতার পর থেকে তো সেইদিকেই আমরা হাঁটছিলাম! কিন্তু গত কয়েক দশকে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিটা হচ্ছে, নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা করে দেওয়া হল, এবার যে যেখান থেকে পারো স্বাস্থ্য পরিষেবা কিনে নাও। বিমা করার যুক্তি হিসাবে সরকারের তরফে বলার চেষ্টা হয় আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার খরচ অনেক। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য যেখানে সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকদের অধিকার, সেখানে সরকারকেই তো আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে! আগে তো সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাকেই গোটা দেশে সেরা বিবেচনা করা হত। সেই জায়গা থেকে আমরা সরব নই কেন? হাজার কোটি টাকা দিয়ে পরিচয়পত্র তৈরির চেয়ে আরও বাস্তব পরিকাঠামো নির্মাণটাই সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা কাম্য হওয়া উচিত। লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার কথা শুনতে শুনতে বারবার এই কথাটাই মনে হচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement