Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২২ জুলাই ২০২৬
Ganges

‘ও গঙ্গা তুমি’

গঙ্গার বুক চিরে ঘোষিত হল মানবমুক্তির আরও এক বার্তা।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০২৪, ১৫:০৬

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০২৪, ১৫:০৬

options
link
‘ও গঙ্গা তুমি’ zoom
Advertisement

গঙ্গার অন্তহীন অবদান যেন এক চিরপ্রবাহ। পরিব‌্যাপ্ত অবক্ষয় এবং বিশ্বজুড়ে মৃত্যুময়তার মধ্যেও গঙ্গার প্রাণপ্রবাহ ক্ষয়হীন, যা প্রভাবিত করেছে টি. এস. এলিয়ট থেকে জঁ রেঁনোয়া সকলকেই। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পঙ্‌ক্তিতে যে গঙ্গা পতিতের উদ্ধার করে, সে কি নিজেই পতিত মানুষের ক্রমাগত দূষণ সৃষ্টির চক্রে? রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। 

গঙ্গা ক্রমে শুকিয়ে যাচ্ছে। তার জলের স্তর নাকি তলায়-তলায় হ্রাস পাচ্ছে ক্রমশ। স্বাভাবিকভাবেই প্রবল জলকষ্ট দেখা দিয়েছে বালি ও বেলুড়ে। জোড়াতালি দিয়ে সমস‌্যার আপাত সুরাহা হলেও বেলুড়ের জগন্নাথ ঘাটের কাছে পলি জমে গঙ্গার অনেকটা জুড়ে যে চড়া পড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। গঙ্গার এই শুকিয়ে যাওয়ার জন‌্য মূলত দায়ী করা হচ্ছে প্রবল গ্রীষ্মকে। কিন্তু প্রকৃতির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে গঙ্গার এই করুণ অবস্থার জন‌্য গঙ্গাতীরে বসবাসকারী মানুষ কি ঝেড়ে ফেলতে পারে এই নদীর প্রতি তার সব দায় ও দায়িত্ব? হিমালয়ের বুকে তার উৎসমুখ থেকে গঙ্গা যে দূষণহীন প্রকাশে ও শরীরে উৎসারিত হচ্ছে, আর সুদীর্ঘ যাত্রাপথের শেষে যে ধ্বস্ত বর্জ‌্যধর্ষিত শরীরে সমুদ্রে আত্মহত‌্যা করছে– সেই গঙ্গাবিপর্যয়ের জন‌্য কি প্রকৃতি দায়ী? না, মানুষ?

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

‘পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গে’ বলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তঁার অবিস্মরণীয় গঙ্গাস্তবে গঙ্গাকে সম্বোধন করেছিলেন। যুগ-যুগান্তর ধরে হিন্দুরা বিশ্বাস করেছে, গঙ্গায় ডুব দিলে নাকি জীবনের সব অন‌্যায়, পাপ, স্খলন ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। একটি ডুবে একই জন্মে হিন্দু পাপ থেকে পুণে‌্য, গ্লানি থেকে গরিমায় উত্তীর্ণ হয়। যুগ-যুগান্তর ধরে গঙ্গার ইতিহাস শুধু এই নদীর অপ্রতিহত অবদান এবং বিস্তীর্ণ বদান‌্যতা ও বিতরণের কাহিনি। গঙ্গা শুধু মানুষকে দিয়েছে। কিন্তু, পেয়েছে কতটুকু? গঙ্গা যদি কথা বলতে পারত, প্রকাশ করতে পারত তার বুকে ধরে রাখা কালব‌্যাপী শোষণের যন্ত্রণা, কলুষের কান্না, মালিন‌্য ও মলের অপমান, মানবসভ‌্যতার সর্ব প্রকার বর্জ‌্য ধারণের অভিশাপ, মানব অত‌্যাচার, উৎপীড়ন, উপেক্ষার অভিমান– তাহলে হয়তো তার কণ্ঠে ফুটে উঠত তার আত্মকথার আর্তি ও ক্রন্দন। সেই সঙ্গে প্রকাশিত হত গঙ্গার অপরিমেয় সহনক্ষমতা! এবং তার অপ্রতিম প্রাণশক্তি!

 

[আরও পড়ুন: কেন উদ্ধবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ? শিব সেনায় ‘অন্তর্ঘাতে’র দুবছর পর কারণ জানালেন শিণ্ডে

মনে পড়ে, ১৯৫১ সালে মনের মতো একটি নদী খুঁজছেন ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক জঁ রেঁনোয়া। মিশরের নিল নদ, প‌্যারিসের সিন নদী, লন্ডনের টেমস, পূর্ব বাংলার পদ্মা, কোনও নদীই মনে ধরল না তঁার। এলেন কলকাতায়। গঙ্গার সঙ্গে দেখা হল। মুগ্ধ হলেন রেঁনোয়া। শুধু যে গঙ্গার রূপ তঁাকে মুগ্ধ করল, তা নয়। গঙ্গার ব‌্যাপ্তি এবং ঐতিহ‌্য? তা-ও নয়। তিনি শুনতে পেলেন মহাকাল পেরিয়ে-আসা গঙ্গার হৃদ্‌স্পন্দন! ঠিক করলেন গঙ্গাবক্ষেই শুটিং হবে রুমার গোডেনের উপন‌্যাস ‘দ‌্য রিভার’ অবলম্বনে তঁার ওই নামে প্রেমের ছবির। যে-ছবির মাঝে এক মার্কিন সৈনিক আর তার তিন কিশোরী প্রেমিকা। গঙ্গাও হয়ে উঠল এই ছবির উথালপাথাল এক চরিত্র। এবং ছবিটি পেল ভেনিসের আন্তর্জাতিক পুরস্কার। কিন্তু গঙ্গা থেকে গেল আড়ালে, উপেক্ষায়, অযত্নে, অপমানে।

তবে রেঁনোয়া এবং গঙ্গাকে নিয়ে এক তির্যকতায় জমজমাট, বেলোয়ারি গপ্প বা ‘সতি‌্য ঘটনা’-ও বাজারে ছাড়লেন বিখ‌্যাত সাহিতি‌্যক ও আড্ডা-শিল্পী কমলকুমার মজুমদার। রেঁনোয়া তঁার স্ত্রীকে নিয়ে উঠেছেন কলকাতার এক তারকাখচিত হোটেলে। ফরাসি সাহেব গঙ্গাবক্ষে বানাতে এসেছেন তঁার প্রেমের ছবি, ‘দ‌্য রিভার’। কমলকুমার এই সুযোগ ছাড়েননি। তিনি রেঁনোয়া দম্পতির সঙ্গে দেখা করলেন নকুড়ের সন্দেশ হাতে। তারপর দু’জনকেই পায়ে হাত দিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করে পায়ের কাছেই কার্পেটে বসলেন! এবং বললেন, ‘গঙ্গার উপর ছবি করছেন, খুব ভাল! কিন্তু হিন্দুদের কিছু ধর্মনীতি মেনে চলবেন। ছবি দেখবেন উতরে যাবে। বিশেষ করে মার্কিন সৈনিকের সঙ্গে তিন কিশোরীর প্রেম যখন আপনার ছবির বিষয়, গঙ্গার আশীর্বাদ আপনার উপরে থাকবেই। তবে কিনা স্ত্রীকে নিয়ে প্রতিদিন প্রভাতে গঙ্গায় গঙ্গাস্তব করতে করতে কয়েকবার ডুব দেবেন। তাতে আপনার আগের জন্মের, এই জন্মের ও পরের জন্মেরও সব পাপ স্খলন হবে। এছাড়া দুপুরবেলা পান্তাভাত খেয়ে গঙ্গাতীরের কোনও বৃক্ষচ্ছায়ায় নিদ্রা যাবেন। গঙ্গাতীরে সেই নিদ্রার গুণ বুঝতে পারবেন অচিরে। এবং সন্ধেবেলায় মদ‌্যপানের আগে গঙ্গাজলে গঙ্গা-আহ্নিক করার কথাও ভুলবেন না।’ এরপর কমলকুমার উবাচ: তঁার নাম শুনলেই নাকি রেঁনোয়া দম্পতির মূর্চ্ছা ও পতন ঘটে। কতক্ষণ তা স্থায়ী হয়, তা অবশ‌্য কমলকুমার বলে যাননি।

জমাটি আড্ডার এই গল্প থেকে চলে আসি বাস্তবে গঙ্গার ম‌্যাজিক-মধুরিমায়। ৫১ বছরের ইতালিয়ান চিত্র পরিচালক রবার্তো রোসেলিনি ভারতে এলেন ১৯৫৭ সালে, জওহরলাল নেহরুর আমন্ত্রণে। এবং বিবাহিত রোসেলিনি প্রেমে পড়লেন গঙ্গাতীরের এক শ‌্যামল গৃহবধূর। এবং তঁাকে নিয়ে পালালেন। পালালেন ইউরোপে, গঙ্গার দেওয়া প্রেমিকার গায়ের রঙে হাবুডুব খেতে স্ত্রীকে ত‌্যাগ করে গঙ্গাতীরের সুধাশ‌্যামলীম গৃহবধূকেই বিয়ে করলেন রোসেলিনি! কোন বউকে ত‌্যাগ করে বিয়ে করলেন বাংলার গৃহবধূকে? তিনি হলিউডের অপরূপা সুপারস্টার ইনগ্রিড বার্গম‌্যান! গঙ্গার এমনই ম‌্যাজিক!

 

[আরও পড়ুন: ‘সিএ হতে হবে না’, ভোটে পরীক্ষা পিছনোর আরজি খারিজ করে আবেদনকারীদের ভর্ৎসনা আদালতের

গঙ্গার আরও এক ম‌্যাজিক, গঙ্গার অন্তহীন অবদান যেন এক চিরপ্রবাহ। পরিব‌্যাপ্ত অবক্ষয় এবং বিশ্বজুড়ে মৃতু‌্যময়তার মধে‌্যও গঙ্গার প্রাণপ্রবাহ ক্ষয়হীন, এমনই প্রত‌্যয়ে উপনীত হলেন আধুনিক কাবে‌্যর পুরোধা, উপনিষদ-দীক্ষিত টি. এস. এলিয়ট। ১৯২২ সালে, অর্থাৎ ১০২ বছর আগে, তঁার মহাকাবে‌্য আবিশ্ব মৃতু‌্যময়তার মধে‌্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সর্বকালের সমস্ত বিশ্বাসের ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দঁাড়িয়ে, কী গভীর প্রত‌্যয়ে ঘোষণা করলেন তঁার মহাকাব‌্য ‘দ‌্য ওয়েস্ট ল‌্যান্ড’-এ: গঙ্গা মরেনি, গঙ্গা মরতে পারে না, গঙ্গার অন্তর্লীন প্রাণপ্রবাহ অব‌্যাহত। তবে এ-কথাও ঠিক, লিখলেন এলিয়ট তঁার কাবে‌্য, ‘গঙ্গা ওয়াজ সাঙ্কেন।’ কমেছিল গঙ্গার জলস্তর। কৃশ আর দুর্বল হয়ে গিয়েছিল গঙ্গা চারধারের দুর্বার মৃতু‌্য, প্রত‌্যয়হীনতা, দিশাহারা ক্ষয়ক্ষতি আর অনিকেত অবস্থার মধে‌্য। যে-অবক্ষয়ের মধে‌্য কোনও কিছুই নয় চিরস্থায়ী।

এমনকী, লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন, ফলিং ডাউন, ফলিং ডাউন! আর এই ভাঙনের মধে‌্য প্রতিটি মানুষ নিজের মধে‌্যই যেন বন্দি হয়ে আছে। বেরনোর পথ নেই। পালানোর উপায় নেই। তারা নিজেকেই নিজেরা তালাবন্দি করেছে। আর সেই বন্দি অবস্থার মধে‌্য প্রতিটি মানুষ ভাবছে তালার চাবিটার কথা। প্রতিটা মানুষ শুনতে পাচ্ছে, চাবিটার একটিবার মাত্র ঘোরার শব্দ। বন্ধ হল তালা। আর কি কখনও খুলবে? এলিয়টের ভাষায় ‘আই হ‌্যাভ হার্ড দ‌্য কি/ টার্ন ইন দ‌্য ডোর ওয়ান্স অ‌্যান্ড টার্ন ওয়ান্স ওনলি/ উই থিঙ্ক অফ দ‌্য কি, ইচ ইন হিজ প্রিজন‌/ ওনলি অ‌্যাট নাইটফল।’ কিন্তু গঙ্গা একমাত্র গঙ্গাই জানে, আমাদের মুক্তির পথ, গঙ্গার কাছেই পাওয়া যাবে একদিন ওই তালার চাবি, আমরা মুক্ত হব বন্দিদশা থেকে। না হলে কেন, এই মৃতু‌্যময় পোড়া জমিতে, যেখানে জল বলে কিছু নেই, যেখানে গঙ্গাও চুপসে গিয়েছে, হঠাৎ এল ঝোড়ো বাতাস, ভেসে এল মেঘ, নামল বৃষ্টি! প্রথমে গঙ্গার তীরেই চমকাল অপ্রত‌্যাশিত, বহু বছরের অচেনা বিদু‌্যৎ! তারপর কোথা থেকে এল হঠাৎ জোলো বাতাস। তারপর মৃত ক‌্যাকটাস ভূমিতে নামল অপরিচয়ের আড়াল থেকে দামাল বৃষ্টি। গঙ্গা নিয়ে এল বৃষ্টি, সম্ভব করল অসম্ভবকে, কোন পরিবেশে? লিখছেন এলিয়ট প্রতীকী ছবির ভাষায়: দেয়ার ইজ দ‌্য এম্পটি চ‌্যাপেল, ওনলি দ‌্য উইন্ড’স হোম। দঁাড়িয়ে আছে শুধু এক শূন‌্য প্রার্থনা গৃহ, যে প্রার্থনা গৃহে শুধু বাতাসের বাসা। কোনও জানালা নেই এই প্রার্থনা গৃহে। শুধু দরজাটা খুলছে, বন্ধ হচ্ছে। শুকনো হাড় কারও ক্ষতি করতে পারে না। এমনই মৃতু‌্যময়, প্রত‌্যয়হীন, প্রার্থনাহীন, ঈশ্বরহীন, পরিসরে চমকে উঠল বিদু‌্যৎ। বয়ে এল জোলো বাতাস। নামল বৃষ্টি। কেন ঘটল এই অবিশ্বাস‌্য ঘটনা? কেননা, গঙ্গা শুকিয়ে গিয়েও মরেনি। যতই না আমরা উপেক্ষা করে থাকি গঙ্গাকে।

যতই না আমরা তাকে বঞ্চিত, শোষিত করে থাকি, করে থাকি কলুষিত ও বর্জ‌্যজর্জর– গঙ্গার প্রাণপ্রবাহের কোনও মৃতু‌্য নেই। কে আমাদের জানাল, ব‌্যাপ্ত মৃতু‌্যর মধে‌্যও গঙ্গার জাগৃতির বার্তা? একটিমাত্র বাক‌্য লিখেছেন এলিয়ট: জানাল এই বার্তা বজ্রের ঘোষণা, ‘দেন স্পোক দ‌্য থান্ডার’। গঙ্গার তীরে, এলিয়টের কাবে‌্য, তিনবার ঘটছে এই বজ্রপাত এই তিন শব্দে: DA DATTA, DA DAYADHVAM, DA DAMYATA– অর্থাৎ গঙ্গার বুক থেকে এল এই বজ্রঘোষিত মুক্তিবার্তা, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে নিয়ে যাবে আলোকে, মৃতু‌্য থেকে অমৃতে!

কী বলছে জাগ্রত গঙ্গা এই অবক্ষয়কীর্ণ, মৃতু‌্যময় মর্তে‌্য মানুষকে? বলছে, অনেক নিয়েছ তোমরা। অনেক দেখেছি তোমাদের লোভ, কাড়াকাড়ি, যুদ্ধ, প্রত‌্যয়হীন যাত্রা, বিশ্বাসহীন বেঁচে থাকা, স্বার্থপর নীচতা আর ক্ষুদ্রতা। এবার বঁাচো, বঁাচার মতো বঁাচা। এবার নিজেকে দান করো। স্বার্থের গণ্ডি অতিক্রম করে মহত্তর উদ্দেশে‌্য বঁাচতে শেখো। পার্থিব ক্ষুদ্রতা থেকে উত্তীর্ণ হও আধ‌্যাত্মিক উদারতায়। নিজের বন্দিদশা থেকে বেরনোর একমাত্র উপায় নিজের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে পরের দুঃখ-কষ্টকে বোঝার চেষ্টা করা। সেই যন্ত্রণা লাঘব করার আদর্শে দীক্ষিত হও। সেই দীক্ষাই মুক্তির চাবি। তবেই জেলখানার তালা খুলবে।

 

[আরও পড়ুন: রাহুলের সভামঞ্চে ‘উজ্জ্বল’ বিজেপি প্রার্থীর ছবি! ভাইরাল হতেই হাসির রোল নেটদুনিয়ায়

গঙ্গার বুক চিরে ঘোষিত হল মানবমুক্তির আরও এক বার্তা। হে মানব, নিজের বাসনা-কামনার মুখে লাগাম দিতে শেখো। নিয়ন্ত্রণে আনো তোমার লোভ। এ জগতের কোনও কিছুই তোমার নয়। সুতরাং ত‌্যাগ করো আগ্রাসন। তবেই তোমার জীবন-নৌকোর পালে লাগবে সহজ মুক্তির বাতাস, তোমার পালতোলা নৌকো ভাসবে সহজ-সরল মধুর আরামে। যখন সমুদ্রে গিয়ে পড়বে, দেখবে এক শান্ত সমুদ্র তোমার অপেক্ষায়। সেই অনন্ত শান্ত পাথারে তিনটি হিরণ্ময় শব্দ শুধু ভাসছে: ‘শান্তি শান্তি শান্তি’। গঙ্গার প্রবাহ ছাড়া সেই অসীম শান্তিতে পৌঁছনোর উপায় নেই মানব, বললেন এলিয়ট।

এলিয়টের কাবে‌্য গঙ্গার কাছে আমাদের যুগ-যুগান্তরের প্রাপ্তির প্রতীকী ইশারাটুকু আছেই আছে। সেই প্রাপ্তি, পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার, প্রাত‌্যহিক লড়াই ও লোভের গণ্ডি পেরিয়ে ভিন্ন মাত্রার। সেই পরম প্রাপ্তি আধ‌্যাত্মিক। সেই প্রাপণই আমাদের প্রসারিত অবক্ষয় ও নষ্ট হয়ে যাওয়ার মধে‌্য রোপণ করতে পারে নব জীবন ও জাগৃতির বীজ। এবং সেই পাওয়া-ই দিতে পারে শান্তি-পারাবারের নির্ভুল দিশা। গঙ্গার উপকূলেই নতজানু সমর্পণ ও দীক্ষায় মানবমুক্তির সুবর্ণ বার্তাটি জানিয়ে গিয়েছেন এলিয়ট তঁার ‘দ‌্য ওয়েস্ট ল‌্যান্ড’ মহাকাবে‌্য।

গঙ্গার জলস্তর কমল কি বাড়ল, এসে যায় না কিছু। এই নদীর অন্তর্লীন জীবন ফুরনোর নয়। প্রবল হিমালয় থেকে অবতীর্ণ হয়ে সুদীর্ঘ যাত্রা শেষে অনন্ত সমুদ্রে গঙ্গার একাকার হয়ে যাওয়া সমস্ত পৃথিবীকে যেন দিয়ে চলেছে এক অন্তহীন যাত্রা ও পরিপূর্ণতার কালজয়ী চিত্রকল্প। এলিয়ট গঙ্গার এই মহাযাত্রার পরিপূর্ণতার শেষে বসালেন ভারতের জীবনবোধের কিছু চূড়ান্ত এবং অনন‌্য শব্দ: datta, dayadhvam, damayata– give, sympathasise, control। হও দাতা, হও সংবেদনশীল, হও নিয়ন্ত্রিত। তবেই নষ্ট ভূমিতে আনতে পারবে বারি, আনতে পারবে উর্বরতা, আনতে পারবে লোভ ও হিংসাহীন জীবন, আনতে পারবে শান্তি। তখন আর সারিবদ্ধ জীবনমৃত মানুষের দিকে তাকিয়ে বলতে হবে না, ‘আই হ‌্যাড নট থট ডেথ হ‌্যাড আনডান সো মেনি!’

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.