সময় নামের ট্রেন স্টেশনের পর স্টেশন পেরিয়ে যায়। যাত্রী বদলায়, নতুন যাত্রী আসে। প্রাচীন যাত্রীর স্মৃতিতে মাকড়সার জালের মতো লেগে থাকে হারানো সময়। নতুন যাত্রীও সেই জালের সন্ধান পায় ক্রমে। সাদা-কালো স্মৃতি হয়ে বাঙালির মনে থেকে গিয়েছে তেমনই এক মিষ্টি ও আত্মপ্রত্যয়ী মুখ। তিনি মিঠু মুখোপাধ্যায় (Mithu Mukherjee)। সোমবারের ব্যস্ত সকাল একটু একটু করে বেলার দিকে গড়াতে না গড়াতেই ভেসে এল তাঁর প্রয়াণ সংবাদ। কিন্তু জাগতিক জীবনের সমাপ্তির বহু আগেই কি অভিনেত্রী মিঠু চলে যাননি কুয়াশার আড়ালে? শেষ ছবি ১৯৯০ সালে। সাড়ে তিন দশক আগের সেই ছবি ‘আশ্রিতা’ সুপারহিট। অথচ এরপরই সরে যাওয়া। সুচিত্রা সেনের মতোই নিজেকে পর্দার আড়ালে সরিয়ে নিয়েছিলেন মিঠুও। অথচ তাঁর ‘স্ক্রিন প্রেজেন্স’ একই রকম ঝকঝকে। সমসাময়িকরা তো বটেই, পরবর্তী প্রজন্মও আজ ইউটিউবে তাঁর অপরূপ ব্যক্তিত্বকে দেখে মুগ্ধ হয়। তিনি আজও ‘স্বয়ংসিদ্ধা’।
১৯৭১ সালে চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ দিয়ে রুপোলি পর্দায় আগমন। তবে মানুষ তাঁকে গ্রহণ করেছিল দীনেন গুপ্তের ‘মর্জিনা আবদুল্লা’ ছবির ‘মর্জিনা’ হিসেবেই। সেটা ১৯৭৩। পরের বছরই ১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘মৌচাক’। এরপর ১৯৭৫ সালে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’। এই তিনটি ছবির সরণি দিয়ে হেঁটেই বাঙালির মনের কোণে পাকাপাকি স্থান করে নিয়েছিলেন মিঠু। পরের বছর বলিউডে (তখন অবশ্য বম্বে) পা রাখা। শত্রুঘ্ন সিনহার বিপরীতে অভিনয়। যে ছবিতে ছিলেন রাজ কাপুরের মতো কিংবদন্তিও! হিন্দি ছবিতে এরপর বেশ কিছু কাজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু মিঠুর আসল জায়গা বাংলা ছবিতেই। বঙ্গতনয়া হিসেবে তাঁর আবেদন আজও তুলনাহীন। একটা স্বভাবসিদ্ধ স্মার্টনেস ছিল মিঠুর মধ্যে। যে স্মার্টনেস সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে। একঢাল চুল, নিটোল মুখের অনির্বচনীয় তিল, টানা টানা চোখের মিঠুর মিষ্টি হাসির ভিতরে সেই স্মার্টনেস মিশে তাঁকে এমন এক সৌন্দর্য দিয়েছিল যার আবেদন অনন্য।

সুচিত্রা সেনের মতোই নিজেকে পর্দার আড়ালে সরিয়ে নিয়েছিলেন মিঠুও। অথচ তাঁর ‘স্ক্রিন প্রেজেন্স’ একই রকম ঝকঝকে। সমসাময়িকরা তো বটেই, পরবর্তী প্রজন্মও আজ ইউটিউবে তাঁর অপরূপ ব্যক্তিত্বকে দেখে মুগ্ধ হয়।
স্রেফ শরীরী সৌন্দর্য নয়, বৌদ্ধিক উপস্থিতি, অভিনয় দক্ষতাকেও এর সঙ্গে যোগ করতে হবে। ভেবে দেখা যেতে পারে ‘মৌচাক’-এর নীপাকে। সে যখন ভ্যাবাচ্যাকা রঞ্জিৎ মল্লিককে বলে, ‘দিনের বেলা জানলা বন্ধ করে বসে থাকলে ঢিল কেন, বড় বড় ইট পড়বে…’ সেই সহজতার কাছে বাঙালি পুরুষের হৃদয় সেই মুহূর্তেই ধরা পড়ে যায়। ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’র মিঠে মৌতাত এযুগের বাঙালি তরুণেরও ‘প্রেমিকা’ করে তোলে মিঠুকে। স্মার্টনেস অপর্ণা সেনের কি কম ছিল? অঞ্জন দত্তর গানে ‘অভিমানে অপর্ণা সেন’-এর আবেদন মাথায় রেখেও বলা যায় মিঠুর স্মার্টনেস তাঁর নিজস্ব। সেখানে তিনি কারও চেয়ে কম ছিল না। যে স্মার্টনেসের প্রেমে না পড়ে উপায় নেই।
একটা স্বভাবসিদ্ধ স্মার্টনেস ছিল মিঠুর মধ্যে। যে স্মার্টনেস সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে। একঢাল চুল, নিটোল মুখের অনির্বচনীয় তিল, টানা টানা চোখের মিঠুর মিষ্টি হাসির ভিতরে সেই স্মার্টনেস মিশে তাঁকে এমন এক সৌন্দর্য দিয়েছিল যার আবেদন অনন্য।
কিন্তু মিঠু কি স্রেফ প্রেমিকা? পর্দায় তিনি ‘স্বয়ংসিদ্ধা’। ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ হয়েও যে অনন্যা, যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মনে রাখতে হবে সেই সময়ে বাংলার রুপোলি আকাশে জ্বলজ্বল করছেন উত্তম-সৌমিত্র। এসে পড়েছেন একঝাঁক নবাগত নায়ক- সমিত ভঞ্জ, সন্তু মুখোপাধ্যায়, রঞ্জিৎ মল্লিকরা। তবু মিঠুকে প্রোটাগনিস্ট হিসেবে ভাবতে পেরেছিলেন পরিচালক সুশীল মুখোপাধ্যায়। ‘অসুস্থ’ স্বামীর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো যে বধূ হয়ে ওঠেন পাপীর বিরুদ্ধে সোচ্চার এক কণ্ঠ। মাথায় রাখতে হবে সুচিত্রা সেনের সরে যেতে (শেষ ছবি ‘প্রণয় পাশা’) তখনও তিন বছর। নায়িকা হিসেবে অপর্ণা সেনও ততদিনে সিনিয়র। আরও অনেকেই ছিলেন। কিন্তু মিঠু অতি অল্প বয়সেই অর্জন করতে পেরেছেন প্রযোজক-পরিচালকদের প্রত্যয়। তাই তাঁকে নায়িকাপ্রধান ছবির মূল চরিত্র হিসেবে চিত্রনাট্য তৈরি করা হয়েছিল। কেরিয়ারের শেষ ছবি ‘আশ্রিতা’-তেও মিঠু ছিলেন স্বমহিমায়। তিনিই ছবির ‘প্রাণভোমরা’। বিপরীতে থাকা নবাগত কানওয়ালজিৎকে কে আর চিনত তখন!
অথচ এরপরই তিনি সরে গেলেন। উইকিপিডিয়ার তথ্যকে সত্যি বলে ধরলে মিঠুর জন্ম ১৯৫৫ সালে। সেই হিসেবে তখন তিনি মাত্র ৩৫। সুচিত্রা যেখানে মধ্য চল্লিশে পৌঁছে তবে অন্তরালে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেখানে মিঠু আরও কম বয়সেই পর্দাকে ‘বিদায়’ জানান। কেন? জানা যায় না। হয়তো পারিবারিক জীবনে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়া। কিংবা অন্য কোনও কারণ। কারণ যাই হোক, মিঠুর আচমকা সরে যাওয়া বাঙালিকে ক্ষুণ্ণ করেছিল।
গত শতকের সাতের দশককে এখন অন্য গ্রহের জীবন বলেও চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। গত পঞ্চাশ বছরে এতদূর চলে এসেছি আমরা। তবু সময়ের গাড়ির গায়ে লেগে থাকা হারানো সময়ের সেই জালের ভিতরে এখনও রয়ে গিয়েছে মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অনন্য ব্যক্তিত্ব। শিল্পীর এখানেই জিত। তাঁর জাগতিক মৃত্যু হয়ে গেলেও হারানো সময়ের বুকে রেখে যাওয়া তাঁর সময়চিহ্ন জ্বলজ্বল করতেই থাকে হিরের টুকরোর মতোই। মিঠুও থেকে যাবেন। সময়ের জাল ছিঁড়ে দামী রত্নখণ্ড হয়ে জ্বলবে তাঁর নক্ষত্রসম তিল!
সর্বশেষ খবর
-
কলকাতা লিগের পর এবার নতুন লক্ষ্য, খেতাব ধরে রাখতে আইএফএ শিল্ডের প্রস্তুতি শুরু মোহনবাগানের
-
‘খাম’ নিয়ে টানাটানি অব্যাহত, প্রতীক হাতে রাখতে হাই কোর্টের মামলা নওশাদদের
-
গলায় ১০০-৫০০ নোটের মালা, তেলেঙ্গানায় গণেশের সাজে খরচ ২ কোটি! চোরের ভয়ে ঘুম ছুটেছে উদ্যোক্তাদের
-
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস! গ্রেপ্তার সৌরভ, ১৪ দিনের জেল হেফাজতে ‘মহাভারত’, ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ অভিনেতা
-
গাঁদা-লিলি-টগর ছেড়ে বাগানে আনুন চোখ ধাঁধানো কালো ফুলের গাছ, রইল ৫ প্রজাতির সন্ধান