“ব্যাঙ্কে যেভাবে টাকা রাখেন, সেভাবেই ঈশ্বরকে হৃদয়ে রাখুন।” বলেছিলেন নিম করোলি বাবা। তাঁর জীবনের উপর আধারিত ‘হনুমান অংশ’। ছবিটি ৭ আগস্ট প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। শুরুতে সাড়া না পেলেও ধীরে ধীরে ভাগ্য বদলেছে। দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছে এই সিনেমা। এই ছবিতে অভিনয় করে ভারতীয় সিনেদুনিয়ার ‘সুপারহিরো’ হয়ে উঠেছেন শোবিনও সত্য। যে পাঁচ কারণে অতি অবশ্যই দেখতে হবে এই ছবি।
দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল ও নিখুঁত অভিনয়:
ছবির গল্পে উঠে এসেছে লক্ষ্মণ দাসের জীবন। কীভাবে তাঁর আধ্যাত্মিক সফর পরবর্তীকালে তাঁকে ‘নিম করোলি বাবা’ করে তোলে। সেই কাহিনিই দেখিয়েছেন বিশাল চতুর্দশীর ছবি। যে সিনেমায় অভিনয় করে ভারতীয় সিনেদুনিয়ার ‘সুপারহিরো’ হয়ে উঠেছেন শোবিনও সত্য। নিম করোলি বাবার চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের সুযোগও আসে ম্যাজিকের মতোই। মহারাজ নিম করোলির চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রথমে যে অভিনেতাকে নির্বাচন করা হয়েছিল, তিনি আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেসময়ে ছবির কাজ চলছিল। তাই পরিচালক বিশালের এমন কাউকে প্রয়োজন ছিল যিনি এই চ্যালেঞ্জিং চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে পারবেন। শোবিনওকে অডিশন দেওয়ার কথা বলা হয়। টানা ৫ ঘণ্টা ধরে চলে অডিশন। এরপর বাকিটা ইতিহাস। তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হতেই হয়। তাঁর ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছে মারাঠি বাল্যশিল্পী বিহান শেডগে। বাকি সকলেও অনবদ্য। এই ধরনের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে যে ভিজ্যুয়াল এফেক্ট ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে এক জাদুকরি দুনিয়ায় পৌঁছে যাওয়া যায়।
আরও পড়ুন:
আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা:
‘হনুমান অংশ’ এমন একটা ছবি, যেখানে সত্যের আভাসটুকু পাওয়া যায়। যাতে জোর নেই। অ-জোরও না। যেন বিশ্বজগতে যে সত্যের দৃশ্য-অদৃশ্যের অতীত একটি লীলা চলছে নিরন্তর, তারই অনুভব। হয়তো তা প্রকাশের পরেও একটা ধন্দ থেকে যায়, হল কি তার স্বরূপ! এই উপলব্ধি ছবিটি দেখতে দেখতে করতে পারেন দর্শকরা। ধর্ম নিয়ে আলোচনায় মতের অমিল থাকবেই। তাই অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করে নিজের উপলব্ধির কথা বলা জরুরি। মানুষ ‘হনুমান অংশ’ দেখে ভাবে বিলীন হবে। কাউকে একই ভাবে ঈশ্বরকে দেখতে হবে, কিংবা প্রার্থনার একই পথ অনুসরণ করতে হবে, এমন কোনও দাবি নেই এই ছবিতে।

সাংস্কৃতিক শিক্ষা:
কারও কাছে রাম বা হনুমান ঈশ্বরের প্রতীক। কারও কাছে প্রকৃতি, জল, অন্ন, পাথর কিংবা মানুষের ভিতরের শুভবোধই সেই বৃহত্তর শক্তির প্রকাশ। আবার কেউ ঈশ্বরের অস্তিত্বই মানেন না। এই ভিন্নতাগুলিও পাশাপাশি থাকতে পারে, একে অপরকে অস্বীকার না করেও। ছবিটি বরং প্রশ্ন তুলেছে। প্রার্থনায় আমরা কী চাই? অর্থ, সাফল্য, সুস্থতা কিংবা সমস্যার সমাধান? নাকি এমন এক সম্পর্ক, যেখানে চাওয়ার হিসেবটিই একসময় ফুরিয়ে যায়? সেই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেকের কাছে আলাদা হতে পারে। সেই কারণেই অন্যের বিশ্বাসকে বিচার করার চেয়ে নিজের বিশ্বাস, সংশয় এবং চাওয়াগুলিকে নতুন করে দেখতে শেখায় এই ছবি। এটাই এই ছবি থেকে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে হয়েছে। কেউ ঈশ্বরকে খুঁজবেন। কেউ মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বা মমতাকে। কেউ আবার কোনও ঈশ্বরের প্রয়োজনই অনুভব করবেন না। আধ্যাত্মিকতার পথ একমাত্রিক নয়। বিশ্বাসেরও কোনও একটিমাত্র সংজ্ঞা নেই। এই সাংস্কৃতিক শিক্ষা দিয়েছে ‘হনুমান অংশ’ (Hanuman Ansh)।
ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক:
বজরংবলি বা হনুমানজি হলেন শক্তি, ভক্তি এবং আনুগত্যের চরম প্রতীক। তাঁর জীবনের অনুপ্রেরণায় মনের ভয় দূর হয়। আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ঈশ্বরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক, অর্থাৎ ‘ভক্তি’ কি খুব সাম্প্রতিক কোনও নির্মাণ? ভক্তি ও সুফি আন্দোলনের হাত ধরেই কি তার জন্ম? এমন দাবি করলে ইতিহাসের একটি বড় অংশকে হয়তো অতি সরলীকরণ করা হয়। ভক্তি একটি সুসংগঠিত সামাজিক আন্দোলন হিসাবে বৈদিক যুগের আগে ছিল কি না, সে প্রশ্ন আলাদা। কিন্তু ধ্রুব, প্রহ্লাদ, মার্কণ্ডেয়, হনুমান কিংবা অর্জুনের মতো চরিত্রের কাহিনিতে ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার যে দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, তা নিছক আধুনিক কোনও আবিষ্কার নয়। শিশুর কাছে ঈশ্বরকে ঘিরে সবচেয়ে স্বাভাবিক অনুভূতিই তো হতে পারে ভক্তি। সেই অনুভূতি পরবর্তী জীবনে কীভাবে প্রকাশ পাবে, সেটি অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। ঈশ্বরের কাছে গিয়ে ‘তোমাকেই চাই, আর কিছু নয়’ বলা যত সহজ শোনায়, বাস্তবে সেই অবস্থায় পৌঁছনো ততটাই কঠিন। এমন প্রেম অর্জন কতটা বিরল, তা ভুলে গেলে চলবে না। ঈশ্বরের সঙ্গে এমন এক সম্পর্ক, যেখানে নিজের অস্তিত্ব, অহং, চাওয়া-পাওয়ার সমস্তটুকু বিলীন হয়ে সেই অবস্থায় পৌঁছনো সত্যিকারের মহাত্মার পক্ষেই সম্ভব। নিম করোলি বাবাও তেমন। সেই অবস্থাকে জীবন দিয়ে দেখাতে পারেন তিনি।

অহংকে অতিক্রম করার জীবনপাঠ:
সংকটের সময়ে কীভাবে ধৈর্য ধরে বুদ্ধি ও সাহসের সঙ্গে লড়াই করতে হয়, এই চরিত্র থেকে তা শেখা যায়। কিন্তু সমস্যা এখানেও রয়েছে। ভক্তির নামে আত্মপ্রবঞ্চনার বিপদ। অনেকেই বলেন, “আমার দেবতার ভালোবাসা আর কৃপাই যথেষ্ট।” কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেই সেই একই মানুষকে বলতে শোনা যায়, “আমার দেবতা সত্যি হলে অমুকের হাত ভেঙে দেবেন।” কিংবা “আমার সাধনা সত্যি হলে ওই মানুষটি ধ্বংস হয়ে যাবে।” অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রেমের জায়গায় ফিরে আসে অহং, প্রতিহিংসা ও কামনা। ‘সব চাই না, শুধু ঈশ্বরকে চাই’ বলা আর সত্যিই সেই অবস্থায় বাঁচা, দুই এক নয়। মহাত্মা করোলি বাবা এই জায়গায় ব্যতিক্রম। তাঁকে কোনও এক নাস্তিক একবার অপমান করেছিলেন। কিন্তু সেই অপমানের প্রতিক্রিয়ায় তিনি মোটেই পালটা আক্রমণ করেননি তাঁকে। তাঁর বক্তব্য ছিল, কেউ নিজের মত প্রকাশ করলেই তার সঙ্গে লড়াই করার প্রয়োজন কী? ওই ব্যক্তির সন্দেহেরও হয়তো একটি কারণ আছে। প্রতারণার বহু ঘটনা দেখেই তাঁর এমন ধারণা। ঈশ্বরের প্রতি সত্যিকারের প্রেম থাকলে নিজের অপমানকে দেবতার অপমান বলে ধরে নিয়ে প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলে ওঠার প্রয়োজন থাকে না। কারণ তখন ‘আমি’ আর ‘আমার’ ধীরে ধীরে সরে গিয়ে জায়গা নেয় ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণ। সেখানে ‘ঈশ্বর আমার জন্য কী করবেন’ প্রশ্নটি আর থাকে না। থাকে কেবল ‘আমি কীভাবে তাঁর হয়ে উঠতে পারি’ এই খোঁজ। আর সেই পথ দেখানোর জন্যই প্রয়োজন ঈশ্বর ও গুরুর কৃপা।
বড় সেলেবমুখ নেই এই ছবিতে। প্রচারের জাঁকজমক দূর অস্ত! বাজেটও নামমাত্র। অথচ বক্স অফিসে এমন ঝড় তুলেছে ‘হনুমান অংশ’। সকলের অবশ্যই দেখা উচিত ছবিটি।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
ডোপ কেলেঙ্কারিতে বিদ্ধ ভারত! এশিয়াডের আগেই বাদ তিন কুস্তিগির, কমছে পদকজয়ের আশা
-
দেবীদুর্গার মণ্ডপসজ্জায় এবার বিদেশিনী, বাঙালি শিল্পীর হাত ধরে পুজোয় দেবেন কোন বার্তা?
-
বৃদ্ধের খাবারে ঘুমের ওষুধের কড়া ডোজ, আলমারি ‘সাফ’ করে গায়েব পরিচারিকা!
-
পরিবর্তনের দুর্গোৎসবে শুধু ‘বড়’ নয়, ‘ছোট’দের পুজোর উদ্বোধনেও মুখ্যমন্ত্রী, তৈরি হচ্ছে তালিকা
-
কলকাতায় বিশ্বকাপারদের হ্যাটট্রিক! ব্রাজিল-উরুগুয়ের পর ফের বিদেশি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলবে ভারত