৩০ কার্তিক  ১৪২৬  রবিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৯ 

BREAKING NEWS

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

৩০ কার্তিক  ১৪২৬  রবিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৯ 

BREAKING NEWS

ক্ষিদ্দা তাঁর ছাত্রীকে জীবনের যে মন্ত্র শিখিয়েছেন, চরম অসুস্থতায় নিজে প্রয়োগ করবেন না কখনও হয়? ফাইট সৌমিত্র ফাইট বলতে বলতে আইসিসিইউতে হপ্তাখানেক আগেও শায়িত তিনি আপাতত ফেরত শুটিং ফ্লোরে। অসুস্থতার পর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে গৌতম ভট্টাচার্যকে বললেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ওই ক’দিনের বিবরণ আর তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি।

আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না এত বড় একটা ধকল যে সদ্য কাটিয়ে উঠলেন।
সৌমিত্র: (ম্লান হাসি) একটু বেটার ঠিকই। তবে ভেতরে ভেতরে এখনও দুর্বলতা রয়েছে। পরিপূর্ণ এনার্জি পাইনি। নিউমোনিয়া যে ভেতর থেকে কীরকম দুর্বল করে দিতে পারে ভাবাই যায় না।

বিধিনিষেধ এখন কী কী?
সৌমিত্র: প্রথম বিধিনিষেধ হল যে কিছুতেই ওভারডু করা যাবে না।

সে তো আপনি অনেকদিন ধরেই সতর্ক রয়েছেন।
সৌমিত্র: না, আরও সতর্ক হতে হবে। নইলে একেবারে বসে পড়ব। কাজ করাই বন্ধ হয়ে যাবে। যেমন ডাক্তার বলে দিয়েছেন দূরে কোথাও যাওয়া যাবে না।

শুনলাম ফিল্ম ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া এবার আপনাকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছে। দু’বাংলা মিলিয়ে শেষ অক্টোবরে বিশাল অনুষ্ঠান ঢাকায়। সেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরও আসার কথা।
সৌমিত্র: ফিল্ম ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট আমায় সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছেন বাড়ি এসে। কিন্তু আমি অপারগ। ঢাকা কী, ডাক্তার এখন চন্দননগর অবধি যাওয়া নিষেধ করেছেন। এমন দূরে যেন কোথাও না যাই যেখানে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলে হাতের কাছে নির্ভরযোগ্য হসপিটাল নেই। লং ডিসট্যান্স গাড়িতে জার্নিগুলো এই বয়সে এসে একটু টায়ারিংও হয়ে যায়।

হঠাৎ করে অসুস্থতায় আপনি হাসপাতালে ভরতি হওয়ার পর চারপাশে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। আপনি নিজে কতটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন?
সৌমিত্র: মারাত্মক একটা অস্বাচ্ছন্দ্য তো ছিলই। জীবনে এই প্রথম আইসিসিইউতে কাটালাম। এর আগে আইসিসিইউতে ভরতি হওয়া চরিত্র হিসেবে অভিনয় করেছি। কিন্তু একটা আইসিসিইউয়ের ভেতর ঢুকে এতগুলো দিন কাটাইনি। অভিজ্ঞতাটাই অন্যরকম।

খুব সন্ত্রস্ত করা অভিজ্ঞতা?
সৌমিত্র: সন্ত্রস্ত মানে এই যে চারপাশে এত সব যন্ত্রপাতি। কাছেপিঠে আরও সব পেশেন্ট। তাদের কথাবার্তা। প্রথম দিনটা তো ভাল করে বুঝতেও পারছিলাম না। অদ্ভুত একটা অবস্থা। জ্বর, তীব্র শ্বাসকষ্ট, মাথা কাজ করছে না সব মিলিয়ে অলমোস্ট আউট অফ কন্ট্রোল।

মৃত্যুর কাছাকাছি আমি, এরকম মনে হচ্ছিল?
সৌমিত্র: না, তেমন কিছু নয়। তবে যথেষ্ট বিভ্রমে ছিলাম। কিন্তু আমার যিনি চিকিৎসক সেই ডক্টর সুনীথ বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দ্রুততার সঙ্গে ব্যাপারটা সামলে দিয়েছেন। আমার জন্য সাত-আট জন ডাক্তার নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে দিয়েছিলেন উনি। আইসিসিইউটাও খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল। এটা রুবির নতুন আইসিসিইউ। সেকেন্ড দিন যাওয়ার পর আস্তে আস্তে আমার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরেছে।

[ আরও পড়ুন: পুজোয় একা ঘুরতে চান না? সঙ্গীর সন্ধান দেবে ‘সিঙ্গলদের বিবাহ অভিযান’ ]

কিন্তু আপনি তো এর আগেও বারকয়েক হাসপাতালে কাটিয়ে এসেছেন?
সৌমিত্র: এসেছি। কিন্তু সেগুলো স্পেসিফিক কিছু করাতে। হার্টয়ের অ্যাঞ্জিওগ্রাম করিয়েছি। অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করিয়েছি। সেগুলো আলাদা। এখানে তো ঢোকামাত্র সটান আইসিসিইউ।

হঠাৎ কী করে হল?
সৌমিত্র: আমি তো শুরুতে বুঝতেই পারিনি। ১৩ সেপ্টেম্বর রাত্তির থেকে অসুস্থতা। হঠাৎ দেখি জ্বর এসেছে। আমি অবাক। কারণ গত ক’বছর আমার জ্বর হয়নি। তারপর ভোর থেকে দেখি শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আর কেমন একটা ডিসওরিয়েন্টেড লাগছে। গা-হাত-পা প্রচণ্ড ব্যথা। শরীর নিজের কন্ট্রোলে নেই। সেদিন আমার একটা ইভেন্ট ছিল। আর ১৫ তারিখ নাটক। কোথায় কী। সব ক্যানসেল। সকাল-সকাল ডক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকা হল। উনি দেখেটেখে বললেন, “এখুনি চলুন হাসপাতাল। কোনও রিস্ক নেওয়া যাবে না।”

তখনও বোঝা যায়নি কী হয়েছে?
সৌমিত্র: না। তারপর হাসপাতালে চেস্ট এক্স-রে হল। নানান সব টেস্ট হল। ধরা পড়ল যে লাংসে নিউমোনিক প্যাচ ডেভেলপ করেছে। লাংস নিয়ে আগেও ভুগেছি। কিন্তু এই বয়সে নিউমোনিক প্যাচ মানে বড় দুর্দশা। ডাক্তার সেটাকে খুব ভাল সামলেছেন।

আর এই ক’দিন হাসপাতালে আপনি ভর্তি থাকার সময় সৌমিত্র-অনুরাগীদের ভিড় কী পরিমাণ আছড়ে পড়েছিল খবর পেয়েছেন?
সৌমিত্র: হ্যাঁ, জেনেছি। আমার মেয়ে পরে বলেছে। শয়ে শয়ে মানুষ এসে ভিড় করেছে আমাকে দেখবে বলে। আমাদের টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির লোকেরাও এসেছে।

ক্রাউড সামলানো আর আপনার শান্তি বিঘ্নিত না হতে দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন আপনার মেয়ে পৌলমী। দায়িত্বটা একেবারেই জনপ্রিয় হওয়ার ছিল না যে ভিড়কে যথাসম্ভব আপনার থেকে সরিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু পৌলমী নাকি খুব দক্ষভাবে সামলেছেন।
সৌমিত্র: হ্যাঁ, আমিও তাই শুনেছি। সত্যি কাজটা সহজ ছিল না। এত মানুষ আমাকে দেখতে চাইছিল যাদের অনেকেই ভিআইপি। অথচ আমার দেখা করার অবস্থা নেই। তখন সামলানো সহজ কথা নয়। একজন বিখ্যাত নায়ক যার আবার অন্য পরিচিতিও আছে, সে যেমন প্রায় রোজ নীচে বসে থেকেছে। বলেছে আমি ওপরে যাব না। কিন্তু এই উদ্বেগে সৌমিত্রদাকে ছেড়েও যেতে পারছি না। নীচে থাকব।

soumitra

বাংলার সাধারণ অনুরাগীরাও আপনার অসুস্থতায় গভীর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
সৌমিত্র: আমি কী বলব (ধরা গলা) যারা এসেছিল তাদের শতকরা চল্লিশ কী পঞ্চাশ পার্সেন্টকে আমি চিনিই না। তারা আমায় চেনে কিন্তু আমি চিনি না। এদের ভালবাসায় আমি অভিভূত। প্রতু্যত্তরে কিছুই তো দেওয়ার নেই আমার। এদের কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি। আর মন দিয়ে অভিনয়টা করে যেতে পারি। কী বলব এই ভালবাসাকে? বাড়ি ফিরে এসে যতবার ভাবি তত মনে হয় এটাই ঈশ্বরের দান যে এত অগণিত মানুষ যাদের চিনি না জানি না, তারা নিমেষে আমার ব্যক্তিগত বিপন্নতার শরিক হয়ে পড়ছে।

এবারের ধাক্কা থেকে শিক্ষা?
সৌমিত্র: শিক্ষা এটাই যে আই হ্যাভ টু বি আলট্রা কশাস অ্যান্ড গো ভেরি স্লো। আমায় কাজ করার ব্যাপারে আরও সিলেকটিভ হতে হবে। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে সব ব্যাপারে আরও সচেতন থাকতে হবে। কোয়ালিটি অফ লাইফ নইলে ঝপ করে নেমে যাবে। আমি বুঝেছি এবারের অসুস্থতাটা আমার ফার্স্ট বেল যে সৌমিত্র সময় থাকতে থাকতে সতর্ক হও।

শুটিংয়ের সময় তো অলরেডি কমিয়ে এনেছিলেন।
সৌমিত্র: হ্যাঁ, দিনে চার ঘণ্টা। এই চার ঘণ্টার মধ্যে আমাকে দিয়ে যত পারো করিয়ে নাও। তার বাইরে পারব না। এবার ডাবিংয়ের সময়টাও কমিয়ে ফেলছি। দিনে দেড় ঘণ্টার বেশি ডাবিং করতে পারব না। কারণ শুটিংয়ে যদি বা শটের মাধে ব্রেক পাওয়া যায়, ডাবিংটা খুব কষ্টসাধ্য। একটা বন্ধ ঘরের মধ্যে টানা কনসেনট্রেট করে যেতে হয়। খুব পরিশ্রমসাপেক্ষ।

চার ঘণ্টা দৈনিক শুটিংয়ের জন্য, দেড় ঘণ্টা ডাবিংয়ের এই বেঁধে দেওয়া শিডিউলে যদি কেউ অ্যাডজাস্ট করতে না পারে?
সৌমিত্র: তাহলে আমি সেই ফিল্মে কাজ করতে পারব না। আমার কিছু করার নেই। ডাক্তার আমায় পরিষ্কার বলে দিয়েছে যে মুহূর্তে আনকমফর্টেবল লাগবে, জাস্ট বেরিয়ে আসবেন। নইলে ঝুঁকি হয়ে যেতে পারে। বলছি না আই হ্যাভ টু রিয়েলি গো স্লো নাও।

[ আরও পড়ুন: পুজোয় টলিউডের এই তারকাদের কী প্ল্যান জানেন? ]

তাহলে তো মঞ্চের পারফরম্যান্সও প্রভাবিত হবে? আগের মতো নিয়মিত নাটক করতে পারবেন না?
সৌমিত্র: নাটকের শিডিউলও বদলাচ্ছে। এখন থেকে ছোটখাটো রোল করব। ‘ফেরা’-র একশো রজনী আছে। সেটা করতে হবে ষষ্ঠীর দিন অ্যাকাডেমিতে। কিন্তু তারপর থেকে খুব বেছে বেছে।

পুজোর সময়?
সৌমিত্র: আগে তো পুজোর সময় নাটক থাকত। এ বছর যা ওই ষষ্ঠীতে। তারপর পুজোর দিনগুলো জাস্ট বিশ্রামে কাটাব।

এক্সারসাইজ শুরু করেছেন? যা আপনার এত বছর ধরে দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে?
সৌমিত্র: জাস্ট কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ শুরু করেছি। সেটাও খুব কম করে। ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী। উনি বলেছেন জোর করে কিছু করবেন না।

আপনি তো অনুষ্ঠান-টনুষ্ঠানেও যেতে শুরু করেছেন? যোগেন চৌধুরির আর্ট এগজিবিশনে গিয়েছিলেন।
সৌমিত্র: তার আগে গেছিলাম ক্যালকাটা ক্লাবে বলরাজ সাহনির ওপর একটা বই উদ্বোধনে।

শুভানুধ্যায়ীদের কারও কারও মনে হয়েছে আপনি বড় তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছেন।
সৌমিত্র: ওই দিনটা হয়তো এমনি বেরোতাম না। কিন্তু বলরাজ সাহনির ওপর আমার এমন একটা প্রোফাউন্ড রেসপেক্ট আছে যে না গিয়ে পারিনি। তা ছাড়া ওঁর ছেলে পরীক্ষিৎ সাহনি যেখানে নিজে বইটা লিখেছে।

এবারের অসুস্থতা আপনাকে সব মিলিয়ে কী বোঝাল?
সৌমিত্র: একটা বোঝাল শরীরের ওপর বাড়তি যত্ন নিতেই হবে। আর ওই যে বললাম বাংলার মানুষের আমার প্রতি ভালবাসায় নতুন করে ভিজলাম। বারবার মনে হচ্ছে প্রতিদানে অভিনয়টুকু ছাড়া আর কীই বা দেওয়ার সাধ্য আছে আমার।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং