৩০ ভাদ্র  ১৪২৬  মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo পুজো ২০১৯ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

বলেছিলেন সত্যজিৎ রায়। পর্দার ‘মগনলাল’-কে নিয়ে এরকম নানা ঘটনার কথা লিখলেন পুত্র সন্দীপ রায়

তখন ছয়ের দশক। আমরা লেক টেম্পল রোডের বাড়িতেই থাকি। বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। রাত প্রায় পৌনে একটা। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। বাবা রিসিভ করলেন। ওপারের কথা কিছু শুনতে পাইনি। তবে এপারে বাবাকে বলতে শুনলাম, “আমি আসছি।” ফোন রেখেই পাঞ্জাবি-টাঞ্জাবি পরে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেলেন। এলেন প্রায় এক-দেড় ঘণ্টা বাদে। মা জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় গিয়েছিলে?” উত্তরে বাবা বললেন, “উৎপলকে পুলিশ ধরেছিল। ছাড়িয়ে আনলাম।”

এ রকম সম্পর্ক ছিল দু’জনের। সে সম্পর্ক যে শুধু পেশাদারি তা কিন্তু নয়, একেবারে ব্যক্তিগত। উৎপলদার নাটক বাবা ভীষণ পছন্দ করতেন। নিয়মিত দেখতে যেতেন। শুধু নাটক কেন? ওঁর পরিচালিত ছবির প্রতিও আকর্ষণ ছিল বাবার। ওঁর করা ‘মেঘ’ ছবিতে রবি ঘোষকে দেখে বাবা ‘অভিযান’-এর জন্য ওঁকে সিলেক্ট করেন। আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল উৎপলদার। কিন্তু তখনও বাবা ওঁকে ছবিতে কাস্ট করেননি। শেষমেশ একদিন ঠিক হল, ‘জন অরণ্য’ ছবিতে ‘বিশুদা’ হবেন উৎপল দত্ত।

সেই শুরু ‘উৎপল’ যাত্রা।

[ আরও পড়ুন: ‘আমি ডায়েরি লিখলে অনেকেই ঝামেলায় পড়ত’, কেন একথা বললেন সলমন? ]

এর পর বাবার আরও তিনটে ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ এবং ‘আগন্তুক’। প্রত্যেকটি ছবির চরিত্র যেন উৎপলদার জন্যই তৈরি। উৎপল দত্তই তিনটে ছবির প্রোটাগনিস্ট। বাবার ফার্স্ট চয়েসও ছিলেন তিনি। চরিত্রগুলোও একে অন্যের থেকে একেবারে ভিন্ন।

সোনার কেল্লা’ ছবিতে জটায়ু ছিল মধ্যমণি। আর ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ ছিল মগনলাল মেঘরাজ। বাবার অত্যন্ত প্রিয় ভিলেন মগনলাল। সেই চরিত্রে উৎপল দত্তের মতো অসাধারণ অভিনেতা! এখন যদি ‘গোলাপী মুক্তোর রহস্য’ কিংবা ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডু’-র মতো ছবি তৈরি হত, মগনলালের চরিত্রে অভিনয় করার একজনকেও পাওয়া যেত না। এ রকম সাংঘাতিক অথচ মজাদার ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় একমাত্র উনিই পারতেন। আর কেউ নয়। ওঁর অভিনয়ের ব্যাপ্তিটা ভীষণ বড় ছিল।

আমার মনে আছে ‘হীরক রাজার দেশে’র সময় বাবা খুব আক্ষেপের সুরে উৎপলদাকে বলেছিলেন, “আমি সব সময় চেয়ে এসেছি যে তুমি আমার ছবিতে নিজে ইম্প্রোভাইজ করো। কিন্তু এ ছবির সংলাপ এমনই যে, সে রকম সুযোগ নেই।”

উৎপলদার স্মরণশক্তি ছিল দারুণ। পাতার পর পাতা মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন। সহ-অভিনেতারা অনেক সময় সমস্যায় পড়ে যেত। আরেকটা ব্যাপার ছিল উৎপলদার, মেকআপ নিয়ে একবার বেরিয়ে গেলে তিনি আর মেকআপ রুমে যেতেন না। এখনকার অভিনেতারা সিন শেষে নিজেদের ভ্যানে উঠে যান। উনি সেটা করতেন না। সারাক্ষণ ইউনিটের সঙ্গে থাকতেন। আর হাতে থাকত বই। এমন বই যার সঙ্গে সিনেমার কোনও সম্পর্ক নেই। শুধু বই পড়তেন, আর শটের আগে সেটা বন্ধ করে সেটে ঢুকতেন। শট হয়ে গেলে আবার বই।

hirak-rajar-deshe

‘আগন্তুক’-এর সময় ওঁর শরীর খুব একটা ভাল ছিল না। কিন্তু ক্যামেরা চললে তা বোঝার কোনও উপায় ছিল না। একেবারে ফিট অ্যান্ড ফাইন। বাবা উৎপলদাকে ডেকে বলেছিলেন, “এই ছবিতে তুমি আমার মুখপাত্র। আমার যা বলার তোমার মুখ দিয়ে বলাচ্ছি।” শুটিং শেষ হয়ে যেতে উৎপলদা বাবার হাত চেপে বলেছিলেন, “আপনি যা চেয়েছিলেন, তা আমি করতে পেরেছি বলে মনে হয় না।” বাবা উলটে বলেন, “তুমি সেটা না দিতে পারলে ছবি শেষ হত না।”

আজ উৎপলদাকে নিয়ে বলতে গিয়ে কত কথাই না মনে পড়ছে। দশাশ্বমেধ ঘাটের মগনলালকে গুলির সিনের শুটিং হয়েছিল ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে। ওই যে দেওয়ালে গুলি লাগে, সেটা আসলে ফাঁপা ছিল। এক্সপ্লোসিভ দেওয়া। নেগেটিভ-পজিটিভ ম্যাচ করতেই বার্স্ট করবে। মনে আছে সেই সিনে একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন উৎপলদা। কিন্তু ভয় এবং অভিনয় দু’টোকে যেন এক করে দিয়েছিলেন। আমরা সবাই চমকে গিয়েছিলাম।

আরেকটা ছবির কথা না বললেই নয়। ‘জন অরণ্য’। বড়বাজারে শুটিং হয়েছিল।  ভিড়-ভাট্টা, হইচই, চেঁচামেচি। একেবারে ঘিঞ্জি জায়গা। শুটিং শেষে ঘরে ফিরছি, আর প্রদীপদা (প্রদীপ মুখোপাধ্যায়) বলছেন, “আর বায়োস্কোপ নয়।”

ও রকম অবস্থায় মাথা ঠান্ডা রেখে অভিনয় করা চাট্টিখানি কথা ছিল না। বাবার জন্য ভিড় হত কম। উৎপলদাকে দেখার জন্য বেশি লোক জমত। কারণ তখন একের পর এক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করছেন উৎপলদা। কিন্তু কোনও দিন ওঁর মধ্যে কোথাও কোনও উচ্ছ্বাস দেখিনি। দেখনদারি দেখিনি। শুধু সাবলীল অভিনয় করে গেলেন সারা জীবন।

আগামিকাল উৎপলদার জন্মদিন। উৎপলদা, এখনও অনেকের অভিনয় দেখি, কিন্তু আর অবাক হই না।

[ আরও পড়ুন: মিডিয়ার উপর কিছুটা ক্ষুব্ধ পরিণীতি, কেন? অকপট অভিনেত্রী ]

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং