১৯ অগ্রহায়ণ  ১৪২৬  শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

সুমিত বিশ্বাস ও সুনীপা চক্রবর্তী: প্রাণের গান, মাটির গান৷ এখন গানহারা প্রাণ, প্রাণহারা গান৷ ব্রাত্যজনের সংগীত ঝুমুরকে অনাথ করে চলে গিয়েছেন ‘সম্রাট’৷ শনিবার ভোররাতে ৬৪ বছরের ঝুমুরশিল্পী বিজয় মাহাতোর প্রয়াণে রুখাসুখা লালমাটিতে লোকসংগীতের একটি ঘরানা হারিয়ে গেল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷

[আরও পড়ুন: রাজা-নন্দিনীর জীবনে আলোকপাত, কৃষ্ণনগরে বন্দিদের অভিনয়ে ‘রক্তকরবী’]

১৯৫৫ সালের নভেম্বরে ঝাড়গ্রামের জামবনিতে জন্ম বিজয় মাহাতোর৷ ছোটনাগপুর মালভূমি এলাকার এই অঞ্চল তখন লোকসংস্কৃতি চর্চার পক্ষে ততটা অনুকূল ছিল না৷ তা সত্ত্বেও বিজয় মাহাতোর বাবা শিবচরণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন লোকগানের চর্চা৷ চরম দারিদ্রের মাঝে ওটাই ছিল তাঁর একমাত্র আশ্রয়, একটুকরো শান্তির জগত৷ বাবার গুনগুনানি তোলপাড় ফেলেছিল ছেলের মনেও৷ ছোট থেকেই ঝুমুর টানত বিজয়কে৷ বাঁশি, মাদলের সুর শুনলে গান না ধরে থাকতে পারতেন না৷ ছোট থেকে নজরুলগীতি গাইতেন৷ অভাব-অনটনের মাঝেও সুর ম্লান হয়নি তাঁর৷ ঝুমুরের ঝাড়গ্রাম ঘরানা নিয়ে কাজ করে গিয়েছেন আজীবন৷ মূলত কণ্ঠশিল্পী বিজয়ের গানে গানে শাল-পিয়ালঘেরা প্রকৃতির সঙ্গে হাত ধরাধরি করেই উঠে এসেছে প্রতিকূলতার বিপরীতে হাঁটা তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ৷

বিজয় মাহাতোর জনপ্রিয়তম গানের রেকর্ডিং ‘শাল মহুলের গান’৷ ঝুমুর কথাশিল্পী ভবতোষ শতপথি এবং সুনীল মাহাতোর লেখা গান প্রান্তিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে তাঁকে নাগরিক বৃত্তের মধ্যে এনে ফেলেছিল৷ ঝুমুর শুনিয়ে মন জয় করেছেন দেশবাসীর৷ আজীবন ঝুমুর গানের ঝাড়গ্রাম ঘরানাকে আগলে রাখতে চেয়েছিলেন বিজয় মাহাতো৷ অন্য কোনও ঘরানার সঙ্গে তাকে মিশতে দেননি কখনও৷ সেই কাজে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হিসেবে মানুষের মুখে মুখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘সম্রাট’৷

এমন বড় মাপের একজন শিল্পীর জীবনে বঞ্চনা ছিল সীমাহীন৷ বাম আমলে ‘ঝাড়খণ্ডি’ তকমা পেতে হয়েছিল৷ তারপর রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর লোকশিল্পীদের আর্থিক সহায়তা করা হলেও, বিজয় মাহাতো ব্রাত্যই ছিলেন৷ অর্থকষ্ট তাঁকে আজীবন যন্ত্রণা দিয়েছে৷ এবছরের ফেব্রুয়ারিতে হৃদরোগে আক্রান্ত হন৷ ভরতি ছিলেন ঝাড়গ্রাম হাসপাতালে৷ শনিবার ভোররাতে ঝুমুর জগৎ থেকে তারাটি খসে পড়ল৷ ঘনিষ্ঠরা বলছে, অর্থাভাবে যথাযথ চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি৷

[আরও পড়ুন: ‘হিংসা ভুলে শান্তি ফেরাতে ভরসা গান’, যোগদিবসে নয়া ভাবনা নীতীনের়]

প্রতিবেশী পুরুলিয়ার ঝুমুরশিল্পী কিরীটী মাহাতো জানাচ্ছেন, ‘ঝাড়গ্রামের ঝুমুর ঘরানা যাতে ছোটনাগপুর এলাকায় প্রসার পায়, তার জন্য ওনাকে কাজ করতে বলেছিলাম৷ তিন দশক ধরে সেই কাজটিই উনি করছিলেন৷ তাই বিজয় মাহাতোর প্রয়াণ অপূরণীয় ক্ষতি৷’ পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতির গবেষক সুভাষ রায় বলছেন, ‘আমি পুরুলিয়ার ঝুমুর উৎস, বিকাশ ও পরিণতি নামে গবেষণার কাজে বিজয় মাহাতোর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম৷ ইদানিং এলাকা অনুযায়ী ঝুমুরের মধ্যে নানা সুর মিশে গিয়েছে৷ কিন্তু বিজয় মাহাতোর কাছেই একমাত্র খাঁটি ঝুমুর শোনা যেত৷ তাঁর প্রয়াণে মূল ধারার অবসান ঘটল৷’ কিরীটী মাহাতো কিংবা সুভাষ রায় ছাড়া ঝুমুর ‘সম্রাট’এর নিঃশব্দে চলে যাওয়া হয়ত বৃহত্তর নাগরিক সমাজে কোনও তরঙ্গ তুলবে না৷ কিন্তু মানভূমের লোকসংস্কৃতি জগৎ ঢেকে গিয়েছে ঘন, নিবিড় শোকছায়ায়৷

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং