দেখতে দেখতে কুড়ি বছর। তসলিমা নাসরিন কলকাতায় ফিরলেন শুক্রবার। দুই দশক তিনি শহরে না থাকলেও এই বাংলায় তিনি অপ্রাসঙ্গিক বা অনালোচিত ছিলেন, এমনটা তাঁর অতি বড় নিন্দুকও বলতে পারবে না। তিনি সাহসের সর্বনাম। তিনি প্রতিবাদের সুচারু কণ্ঠস্বর। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তসলিমা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। তবু অনেকের মতে, সাহিত্যিক তসলিমাকে যেন ছাপিয়ে গিয়েছে অন্য প্রেক্ষিতগুলি। প্রশ্ন ওঠে, প্রতিবাদের তীব্রতা কি শৈল্পিক সৃজনশীলতাকে আড়াল করে দেয়?
আসলে তসলিমার বহু রচনায় তাঁর ব্যক্তিজীবন যেমন উঠে এসেছে, তেমনই সমাজ থেকে ধর্ম, নারী-পুরুষের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মতো বিষয়গুলিও রয়েছে। মিলেমিশে গিয়েছে। ফলে শিল্পের সূক্ষ্মতার বদলে ব্যক্তিগত মতামতের স্পষ্ট উচ্চারণ তাঁর সৃজনের মানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে- এমনও মত অনেকের। তবে এপ্রসঙ্গে বলতে গেলে তসলিমা নাসরিনের জীবনের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। লেখকের ব্যক্তিগত জীবন ঘটনাবহুল হলে তাঁর কলমের কালিতে মিশে যায় সেই সব বর্ণিল অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি।
আরও পড়ুন:

ধরা যাক, সুবোধ ঘোষের কথা। বাস কন্ডাক্টর, কয়লা খনির শ্রমিকের মতো পেশার পাশাপাশি কেরানি- বহুবিধ পেশার অভিজ্ঞতা, নানা মানুষের সংস্পর্শ তাঁর বিবিধ বিচিত্র রচনার উৎস হয়ে থেকেছে। কিংবা সমরেশ বসু। ইছাপুর অর্ডন্যান্স কারখানার ফোরম্যান ছিলেন। মাথায় ঝাঁকা করে ডিমও বিক্রি করেছিলেন। পেশা ও জীবনসংগ্রামের এই বিভিন্নতা তাঁর কলমকে কতটা পুষ্ট করেছে সেকথাও আমাদের জানা।
এরই সমান্তরালে রাখা যাক তসলিমার জীবন। পেশায় চিকিৎসক। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে প্র্যাকটিসও করেছেন। কিন্তু তার অনেক আগে থেকেই লেখালেখিও শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে। ১৯৯২ সালে পেয়ে গিয়েছেন আনন্দ পুরস্কারও। তবে ‘লজ্জা’ ঘিরে যে ঢেউ উঠল তা ছিল প্রবল। বাবরি ধ্বংস-পরবর্তী দাঙ্গার ধাক্কা বাংলাদেশেও পড়েছিল। এই প্রেক্ষাপটেই লেখা সেই উপন্যাস। যা প্রকাশের পর মৌলবাদীরা তাঁর বিরুদ্ধে কেবল ফতোয়া জারি করেই ক্ষান্ত হয়নি। মৃত্যুর হুমকিও দিয়েছিল। সদ্য তিরিশ পেরনো এক যুবতীকে ছাড়তে হল দেশ। আজ তিনি ষাট পেরিয়ে গিয়েছেন। প্রিয় জন্মভূমিতে আর ফেরা হবে না। কলকাতাকে ভালোবেসেছিলেন। সেই শহরও ছাড়তে হয়েছিল বছর কুড়ি আগে। তীব্র বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তসলিমাকে কলকাতায় থাকতে দেয়নি। শুক্রবার যখন ফিরলেন, তাঁর কি মনে পড়ছিল না ২০০৭ সালের সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা? একরাতের মধ্যে রাতারাতি শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে। আরও একবার ঠাঁইনাড়া হওয়া।

এমন এক জীবন যাঁর, তাঁর জীবনচর্চা আর পাঁচজনের মতো হবে না সেটাই স্বাভাবিক। সমসাময়িক বঙ্গীয় লেখক-কবিদের কথা ধরলে মানতেই হবে তসলিমার জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত তাঁদের সকলের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন মাত্রায় বয়ে চলেছে গত কয়েক দশক ধরে। সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স এবং আমেরিকা নানা দেশ ঘুরেছেন। এদেশের দিল্লিতেও থেকেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষা ও বঙ্গভাষীদের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাওয়া… হয়নি। এই নির্বাসন, এই লড়াই তসলিমার লেখক সত্তাকে প্রভাবিত করবে না, তা কি হয়?
পেশায় চিকিৎসক। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে প্র্যাকটিসও করেছেন। কিন্তু তার অনেক আগে থেকেই লেখালেখিও শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে। ১৯৯২ সালে পেয়ে গিয়েছেন আনন্দ পুরস্কারও। তবে ‘লজ্জা’ ঘিরে যে ঢেউ উঠল তা ছিল প্রবল।
তাঁর কবিতায় পাই, ‘আমার জন্য অপেক্ষা করো মধুপুর নেত্রকোনা/ অপেক্ষা করো জয়দেবপুরের চৌরাস্তা/ আমি ফিরব। ফিরব ভিড়ে হট্টগোল, খরায় বন্যায়… শোনো শালবন বিহার, মহাস্থানগড়, সীতাকুণ্ড-পাহাড়- আমি ফিরব।/ যদি মানুষ হয়ে না পারি, পাখি হয়েও ফিরব একদিন।’ এই পঙক্তির মধ্যে যে আকুতি, তার সততা ও নিষ্ঠাকে গ্রহণ করলে বোঝা যায় ফিরে আসার এই প্রতিজ্ঞা স্রেফ সৃজনের অভিপ্রায়ই নয়। তা সত্যের দীপ্যমান প্রতিবিম্বও বটে।
কেবল আশ্রয় নয়, তসলিমার জীবনে পুরুষও স্থায়ী হয়নি। প্রথম জীবনে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বছর চারেকের দাম্পত্য। তারপর বিচ্ছেদ। এরপর নাইমুল ইসলাম খান, মিনার মাহমুদ। সম্পর্কের এই ভাঙনগুলিও তাঁকে উন্মনা করেছে। ‘ভালোবাসা আমি যতটা নিয়েছি লুফে/ তারো চেয়ে পারি গোগ্রাসে নিতে ভালোবাসা হীনতাও।/…অতল নিষেধে ডুবতে ডুবতে ভাসি,/ আমার কে আছে একা আমি ছাড়া আর?’ এই জীবনবীক্ষা, অনুভবই তসলিমা। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘আমি ও আমার গল্প একই।’ তসলিমা এমন উচ্চারণ কোনও লেখায় করেছেন কি না জানা নেই। তবে না বললেও আসলে বিষয়টা সেটাই। একধরনের বিপন্নতা ও বিদ্রোহ তাঁর লেখনীকে চালিত করেছে বরাবর। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তাঁর ‘আ মুভেবল ফিস্ট’ বইয়ে লিখেছিলেন, ”অল ইউ হ্যাভ টু ডু ইজ রাইট ওয়ান ট্রু সেনটেন্স। রাইট দ্য ট্রুয়েস্ট সেনটেন্স দ্যাট ইউ নো।” এই ‘সত্যি’ বাক্যই লিখতে চেয়েছেন তসলিমা। তাঁর পাঠকও সেটাই পড়তে চেয়েছে।
সমসাময়িক বঙ্গীয় লেখক-কবিদের কথা ধরলে মানতেই হবে তসলিমার জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত তাঁদের সকলের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন মাত্রায় বয়ে চলেছে গত কয়েক দশক ধরে। কিন্তু বাংলা ভাষা ও বঙ্গভাষীদের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাওয়া… হয়নি।
প্রতিবাদের অদম্য আকাঙ্ক্ষা ও তসলিমা সমার্থক। শৈল্পিক সৃজনশীলতা নিয়ে সংশয় থাকল কি থাকল না সেটা নিয়ে কখনও হয়তো ভাবিতও হননি তিনি। দৃঢ়তা, সাহিত্য ও প্রতিবাদের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা নির্ভীক উচ্চারণই এত বছর ধরে তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। তাঁর পাঠক-পাঠিকারাও সেটা জানেন। তসলিমাকে তাঁরা ভালোবাসেন এই সত্যের দীপ্তির কারণেই। ভালোবাসবেন আগামিদিনেও।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
ইতিহাস ইস্টবেঙ্গলের, বিশ্বকাপার বোঝাই দলকে আটকে শুরু এসিএল টু’র সফর
-
শেষ হল জাতীয় ব্যাডমিন্টন সাব জুনিয়র টুর্নামেন্ট, বাঙালিহীন ফাইনালে জয়ী কারা?
-
‘আল্লার ঘর’ বিপন্ন, ‘মুসলিম ন্যাটো’ উধাও! ‘চিরশত্রু’ ইহুদিদের সাহায্য চাইতেই সৌদিকে তোপ তসলিমার
-
করম পুজোয় ছুটি ঘোষণা রাজ্যের, কবে বন্ধ থাকবে স্কুল-কলেজ?
-
ফের ‘গোঁড়া’ ভারতবিরোধিতা, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে আচমকা ডিগবাজি, নতুন দাবি পাকিস্তানের