Advertisement
Advertisement
World Cup Football

অ্যান্টেনা-ঝিরঝির-মারাদোনা, ‘সাদাকালো’ যুগের বিশ্বকাপ শেখাত আরও বেঁধে বেঁধে থাকা

১৯৫৪ সালে নতুন যুগে পদার্পণ করে বিশ্বকাপ। কারণ প্রথমবারের মতো 'গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে'র সম্প্রচার হয় টেলিভিশনে। আগে প্রতি মিনিটের খবর জানতে মানুষ কান পেতে রাখত রেডিওতে। এবারে যাকে বলে 'আঁখো দেখা হাল'।

Advertisement
কিশোর ঘোষ
কিশোর ঘোষ

শেষ আপডেট: জুন ২১, ২০২৬, ২১:৫৫

link
কিশোর ঘোষ
কিশোর ঘোষ

শেষ আপডেট: জুন ২১, ২০২৬, ২১:৫৫

options
link
অ্যান্টেনা-ঝিরঝির-মারাদোনা, ‘সাদাকালো’ যুগের বিশ্বকাপ শেখাত আরও বেঁধে বেঁধে থাকা zoom
১৯৫৪ সালে নতুন যুগে পদার্পণ করে বিশ্বকাপ।

সালটা ১৯৯৫। ব্যান্ডের নাম মোহিনের ঘোড়াগুলি। কালজয়ী সেই অ্যালবাম ‘আবার বছর কুড়ি পরে’। বাংলা গানের এই ইতিহাস সবার জানা। কিন্তু তখন কে জানত, এ গানের জোড়া স্রষ্টা (কথা ও সুরের কারিগর) গৌতম চট্টোপাধ্যায় ও পল্লব রায় সঙ্গীত জগতের লোক হলেও তলে তলে তুমুল নসট্রাদামুস! নচেত গত শতাব্দীর শেষ তিন কী চার দশকের শ্রেষ্ঠতম বাংলা গানটি কী করে বলে দেয়—“ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে/ যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে/ ঘুচে গেছে দেশ কাল সীমানার গণ্ডি…।” অথচ মুঠোফোন বলে যে কিছু আসবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ‘হাতের মুঠোতে’, মাইরি কে ভেবেছিল সেই নস্টালজিক নব্বইয়ে!

রেডিও থেকে টিভি, লোডশেডিং প্রজন্ম

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

আমরা তো রেডিও থেকে সবে টিভিতে ট্রান্সফার করা লোডশেডিং প্রজন্ম। ঝুপ করে অন্ধকার গাইবে প্রতিসন্ধে— চাঁদনি রাতে…! স্যাটেলাইট থাকলেও কেবল-পৃথিবী অনেক দূরে। বরং কয়লা-ঘুঁটে-উনুন মার্কা রান্নাঘর। বৃষ্টি-কাদা উঠোনে কেঁচো-কেন্নোর সংসার। নাড়কেল গাছে ঝুলে থাকা কার ছেঁড়া আকাশ… মানে কাটা ঘুড়ি! মাঠে মাঠে বিকেল-ফুটবল আর ছাদে ছাদে অ্য়ান্টেনার জঙ্গল। কিন্তু বিশ্বকাপ দেখতে হবে তো? টিভিতে দেখাবে। খবরের কাগজে লিখেছে। টুর্নামেন্টের সূচি কাগজ কেটে ভাজ করে হাফপ্যান্টের পকেটে নিয়ে ঘুরছি। সমস্যা হল পাড়ায় হাতেগোনা টিভি। অধিকাংশই সাদাকালো, তদুপরি ছোট। প্রশ্ন হল, রঙিন বিশ্বকাপ সাদাকালোয় দেখব কেন! সাদাকালো পৃথিবীকে রঙিন মায়ার প্রলেপ দেওয়াই তো জীবন! অতএব, একমাত্র উপায় প্রতিবেশী সবুদা।

বিকেল খেলা শেষ। সূর্যাস্ত হবহব। মাঠের ধারের জঙ্গলে ঝিঁঝিঁ সবে কোরাসে গান ধরেছে। এ বাড়ি-ও বাড়ি থেকে শঙ্খের পুঁ ভেসে আসছে। আমরাও ঝিঁঝিঁর মতো সমবেত কণ্ঠে সবুদাকে ধরলাম খপ করে— “খেলাটা কিন্তু তোমার বাড়ির বড় কালার টিভিতেই দেখব।” সবুদা জার্সি দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, “হবে না। সন্ধে আর রাতে খেলা। বাবা রেগে দারোগা হয়ে যাবে। হেবি কেলাবে।” আমি চট করে মুখ খুললাম। আগেই রেডি করা ‘গ্যাস’ ঝাড়লাম— “সবুদা, তুমি গুরু ফুটবলপাগল লোক। মধ্যপাড়ার মারাদোনা। বাবাকে একটু ড্রিবল করে ব্যবস্থা করো না… প্লিজ।” আমার কথা শুনে বাকিরা ঢোক গিলল। সবুদা বলল, “ফালতু বার খাই না।” আমি দমে না গিয়ে বললাম, “আরও আছে।” সবুদা বলল, ‘কী?’ খানিক কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, “ভেবে দেখো, সেই ১৯৫৪ সাল থেকে ফুটবল বিশ্বকাপের টিভি সম্প্রচার হচ্ছে। চার দশক ডিঙিয়েও মস্তি করে আমরা খেলাটা দেখতো পাবো না?” আমার একথা শুনে সবুদা ঘুরে বসে বলল, “বলিস কী! অত আগে থেকে মাইরি!” আমি বললাম, “আরও একটা ইন্টারেস্টিং গল্প আছে।” সবুদা প্রবল কৌতূহলে হাঁটু মুড়ে বসে বলল, “বল দিকি।” আমিও মওকা পেয়ে সংক্ষেপে কাহিনি বর্ণনা করলাম।

একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত, পেশাদার ফুটবলের অভিজ্ঞতাহীন পশ্চিম জার্মানি, অন্যদিকে টানা ৩২ ম্যাচ জেতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফাইনালে আসা হাঙ্গেরি। অসম এক লড়াই দেখতেই সুইজারল্যান্ডের বার্নে হাজির হয়েছিলেন ৬৩ হাজার মানুষ।

টিভিতে প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচার  

১৯৫৪ সালে নতুন যুগে পদার্পণ করে বিশ্বকাপ। কারণ প্রথমবারের মতো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’র সম্প্রচার হয় টেলিভিশনে। আগে প্রতি মিনিটের খবর জানতে মানুষ কান পেতে রাখত রেডিওতে। এবারে যাকে বলে ‘আঁখো দেখা হাল’। সেই বিশ্বকাপ আরেক দিক থেকেও গুরত্বপূর্ণ। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা উঠিয়ে নেয় ফিফা। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে বিশ্বকাপে ফেরে পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া। প্রথমবারের মতো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেয় উরুগুয়ে। আর আয়োজক দেশ হিসেবে অংশ নেয় সুইজারল্যান্ড। বাছাইপর্বের ৪২ দল থেকে চূড়ান্ত পর্বে ওঠে ১৪ দল। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ মুখোমুখি হয় তার প্রথম অঘটনের। বাছাইপর্বে বাদ পরে গতবারের সেমিফাইনালিস্ট দুই দল স্পেন ও সুইডেন। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে মুখোমুখি হয় হাঙ্গেরি ও পশ্চিম জার্মানি। যদিও এটুকুও ‘নকল গল্প’, টিভি সম্প্রচার নিয়ে আসল গল্প ফাইনালের।

আসলে সেবার খেলা যাকে বলে জমে গিয়েছিল। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত, পেশাদার ফুটবলের অভিজ্ঞতাহীন পশ্চিম জার্মানি, অন্যদিকে টানা ৩২ ম্যাচ জেতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফাইনালে আসা হাঙ্গেরি। অসম এক লড়াই দেখতেই সুইজারল্যান্ডের বার্নে হাজির হয়েছিলেন ৬৩ হাজার মানুষ। তাদের জন্য গোলের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন কিংবদন্তি পুসকাস। প্রথম ৮ মিনিটেই ২-০ গোলে এগিয়ে যায় হাঙ্গেরি। পরের ১০ মিনিটে তা শোধও করে দেয় জার্মানরা। ২০ মিনিটেই গোললাইন দাঁড়ায় ২-২-এ। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে শিকে ছেঁড়ে পশ্চিম জার্মানির। হেলমুট রানের গোলে এগিয়ে যায় তারা। যদিও ২ মিনিটের মধ্যেই সেই গোল ফেরত দেন পুসকাস। যদিও তা মানতে নারাজ ছিলেন রেফারি। বরং লাইন্সম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে অফসাইড ট্যাগ দিয়ে বাতিল করেন গোল। রেফারি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন টিভি পর্দায় সরাসরি দেখানো হচ্ছে এই ম্যাচ। নিশ্চিত গোলকে অফসাইড বলে বাতিল করায় সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত হাঙ্গেরিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ১৯৫৪-র বিশ্বকাপ জিতে নেয় পশ্চিম জার্মানি। অলক্ষ্যে আজকের ‘ভার’ (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) পদ্ধতির ভ্রুণজন্ম হয়েছিল সেদিনই।  

এই সূত্রেই নয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সাপোর্টারদের বংশবিস্তার। নেপথ্যে একদিকে যদি ফুটবলের ‘অভিশপ্ত’ রাজপুত্র দিয়োগো মারাদোনা হন, তবে অন্যদিকে পেলের ঐতিহ্য বহন করা রোমারিও-বেবেতো-দুঙ্গারা।

পাড়ায় পাড়ায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম সম্প্রচারের এই গল্প শুনেই ম্যাজিক হয়ে গিয়েছিল! বাবাকে কড়া ট্যাকেল করে আমাদের জন্য সন্ধে ও রাতে দোতলার ঘর খুলে দিয়েছিল সবুদা। দু’দিকে চিচিংফাঁক ঢাকনা সরতেই চোখের সামনে স্বপ্নময় সেই বড় কালার টিভি! সূদূর ইতালি (১৯৯০) কিংবা আমেরিকা (১৯৯৪) থেকে ভেসে আসছে শব্দ-দৃশ্য তরঙ্গ। সাগরনীল কাচে প্রথমে ঝিরঝির…। অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মারাদোনা-খুলিট-বাজ্জিও-ভালদোরামা-হিহিগুইতার সঙ্গে দেখা। ‘স্লোমোশান’ শব্দবন্ধের সঙ্গে গভীর আলাপ। খেলার শুরুতে ডিগবাজি ট্রান্জিশনে আসা খেলোয়াড় তালিকায় হতবাক প্রজন্ম আমরা। এবং ‘স্মার্ট’ ইংরেজি কমেন্ট্রি। সবটাই ভীষণ নতুন। কৃশানু-বিকাশ, চিমা-সত্যজিৎ-এর ময়দান থেকে আচমকা মালদিনি-ক্যানিজিয়া-ক্লিন্সম্যানদের পৃথিবীতে এসে পড়ে। চমকে যাওয়া ড্রিবিল-ফ্রিকিক-ট্যাকেল, ডিফেন্স চেরা পাসে মুগ্ধ দু’নয়ন।

বলা বাহুল্য, এই সূত্রেই নয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সাপোর্টারদের বংশবিস্তার। নেপথ্যে একদিকে যদি ফুটবলের ‘অভিশপ্ত’ রাজপুত্র দিয়োগো মারাদোনা হন, তবে অন্যদিকে পেলের ঐতিহ্য বহন করা রোমারিও-বেবেতো-দুঙ্গারা। সমর্থন এতখানি যে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল দুই ভাইয়ের ঝগড়ায় মিনিমাম হপ্তা খানেক কথা বনধ। আর শুনুন—পাড়ার পনেরো আগস্টের টুর্নামেন্টে ঘোষণা—“আর্জেন্টিনা দলের ক্যাপটেন বিল্টু এবং ব্রাজিলের ক্য়াপ্টেন বুবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে, আপনারা নিজের নিজের দল নিয়ে তৈরি থাকুন। ফ্রান্স ভার্সেস ইতালির পরেই কিন্তু আপনাদের ম্যাচ।” তবে কিনা গৌতম চট্টোপাধ্যায় ও পল্লব রায় বোক্সাবাক্স নিয়ে যে ভয় পেয়েছিলেন— “পাশাপাশি বসে একসাথে দেখা/ একসাথে নয় আসলেতে একা…।” এই স্বার্থপরতা নব্বই দশককে ছুঁতে পারেনি।

আমাদের যৌথখামার, বিশ্বকাপের আঠা

একটি পাড়ায় একটি বা দু’টি টিভি থাকায় একসঙ্গে খেলা দেখার, প্রকারন্তরে যৌথজীবনে অভ্যস্ত ছিল সেই সমাজ। মোহনবাগানের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের, ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ঝগড়া হয়েছে যেমন প্রবল, তেমনই প্রতিপক্ষের ভালোবাসাও চেখেছে সময়। আজ যখন এক টিভিতে একশো চ্যানেলের মারামারি, রিমোট নিয়ে দু’জন মানুষের মধ্যেও কাড়াকাড়ি, তখন প্রতিবেশীর টিভিতে হইহই করে রামায়ণ, মহাভারত, শনি-রবির হিন্দি-বাংলা সিনেমা, বিশ্বকাপ ফুটবল ও ক্রিকেট দেখত সাদাকালো যুগের মানুষ! আসলে বিশ্বকাপ দেখা তো ছিল ছুঁতো, অনখ সমুদ্দর জীবন ভাগ করে নেওয়াই ছিল অন্তরের গোপন উদ্দেশ্য। বেঁধে বেঁধে থাকার আশ্চর্য সংস্কৃতিই ম্যাজিক করেছিল। যাতে সাদাকালো টিভিও হয়ে উঠেছিল রঙিন! কালার টিভি পেলে তো কথাই নেই। স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের যুগ যে যৌথখামার, সমবেত আনন্দকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। 

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.