‘জন্মলগ্নে’র বন্ধু ভারত, রোনাল্ডোদের রুখে দেওয়া কঙ্গোর বিশ্বকাপ স্বপ্নে কীভাবে জড়িয়ে নেহরু?
দারিদ্রসীমার নিচেই বসবাস করেন কঙ্গোর অন্তত ৬৯ শতাংশ মানুষ।
বিশ্বকাপে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার খেলতে নেমেছে কঙ্গো। প্রথমবার তারা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছিল ১৯৭৪ সালে। তখন অবশ্য দেশটির নাম ছিল জাইরে। পশ্চিম জার্মানিতে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপে অবশ্য মুখ থুবড়ে পড়েছিল দলটি। স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০, যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৯-০ এবং ব্রাজিলের কাছে ৩-০ হেরে বিদায় নেয় তারা। সেই দুঃস্বপ্নের অতীত ভুলে ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মূলপর্বে আবারও জায়গা করে নিয়েছে কঙ্গো।
আরও পড়ুন:
কঙ্গোর ফুটবল নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় মোবুতু সেসে সেকোর নাম। আফ্রিকা মহাদেশের একনায়কদের তালিকায় অন্যতম এই মোবুতু। ১৯৬০ সালের শেষদিক থেকে তাঁর উত্থান। সেনা অফিসার হিসাবে তাঁর জীবন শুরু। ধীরে ধীরে পশ্চিমি দেশগুলির বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠেন। এবং ঘটনাক্রমে কঙ্গোর শাসকের কুর্সিতে বসেন মোবুতু। ১৯৬৫ সালে ক্ষমতা দখল করেন তিনি। কঙ্গোর নাম বদলে জাইরে রাখেন।
মোবুতু যখন ক্ষমতায় এলেন, কঙ্গো তখন গৃহযুদ্ধে টালমাটাল। সেসময় ফুটবলকেই নিজের অন্যতম সেরা অস্ত্র করে তোলেন মোবুতু। দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে ফুটবলে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করেন তিনি। মোবুতুর ইচ্ছা ছিল, ঔপনিবেশিক অতীত ভুলে কঙ্গো এক শক্তিশালী দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করুক। জাতীয় ফুটবল দল যেন বিশ্বকাপ খেলার যোগ্য হয়ে উঠতে পারে, সেটাই ছিল মোবুতুর অন্যতম লক্ষ্য। সেই স্বপ্ন সফল হয় ১৯৭৪ বিশ্বকাপে।
কিন্তু ভারতের সঙ্গে কেন জড়িয়ে কঙ্গোর বিশ্বকাপ ইতিহাস? ১৯৬০ সালে বেলজিয়ামের থেকে স্বাধীনতা পায় কঙ্গো। আফ্রিকান দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন প্যাট্রিস লুমুম্বা। গোটা আফ্রিকার জনপ্রিয় নেতা, ঔপনিবেশিকতার তীব্র বিরোধী লুমুম্বাকে নিয়ে আমেরিকা এবং বেলজিয়াম দুপক্ষই অসন্তুষ্ট। কারণ বিশ্বজুড়ে তখন চলছে ঠাণ্ডা যুদ্ধ। লুমুম্বা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকবেন, আশঙ্কা ছিল আমেরিকার। কঙ্গোর প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে 'কাজে লেগে পড়ে' মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ।
আরও পড়ুন:
স্বাধীনতার কয়েকমাস পরেই লুমুম্বাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে লুমুম্বার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৬০ সালের ১২ ডিসেম্বর লুমুম্বার গ্রেপ্তারির তীব্র বিরোধিতা করেন নেহরু। অবিলম্বে তাঁর মুক্তির দাবিও জানান। গোটা ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলের নিষ্ক্রিয়তাকেও তোপ দেগেছিলেন তিনি। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে কেন রক্ষা করা হচ্ছে না, প্রশ্ন তোলেন নেহরু।
লুমুম্বার জীবন শেষ হয় অত্যন্ত নৃশংসভাবে। ১৯৬১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে হত্যা করা হয়। সেই মৃতদেহ অ্যাসিডে ডুবিয়ে রাখা হয়। অ্যাসিডে গলে যায় কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রীর নশ্বর দেহ। স্রেফ সোনায় বাঁধানো তাঁর একটি দাঁত পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীকালে নানা নথিপত্র মারফত জানা যায়, মৃত্যুর আগে ভয়াবহ নির্যাতন চলেছিল লুমুম্বার উপর। তাঁর মৃত্যু স্রেফ কঙ্গো নয়, গোটা আফ্রিকাকেই বদলে দেয়।
লুমুম্বার মৃত্যুর পর নেহরুর শোকবার্তা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, "লুমুম্বার মৃত্যুতে নবজাগরণের আফ্রিকা আমূল বদলে যাবে। জীবিত লুমুম্বা যতটা ক্ষমতাবান ছিলেন, মৃত লুমুম্বা তার চাইতে অনেক বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠবেন।" নেহরুর এই কথাকেই সত্যি করে ৪ বছর পর কঙ্গোর মসনদে বসেন একনায়ক মোবুতু। তাঁর হাত ধরে একঝটকায় ফুটবলে পরিবর্তন, বিশ্বকাপে পৌঁছে যায় কঙ্গো।