৩১ ভাদ্র  ১৪২৬  বুধবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo পুজো ২০১৯ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

সৌম্য মুখোপাধ্যায়: তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসার ধুলোয় মিশে গেল এক নিমেষে। ১৮ বছর ধরে একটু একটু করে সযত্নে মাথা গোঁজার যে ঠাঁই গড়ে তুলেছিলেন মৌমিতা সেনের পরিবার। ইট,কাঠ, পাথরের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে যেন সময়ই লাগল না তার।

[আরও পড়ুন: বিস্ফোরণে ধসে যাওয়া রাস্তা মেরামতি, ডালহৌসিতে নিয়ন্ত্রিত যান চলাচল]

গত কয়েকদিন ধরেই মেট্রো সম্প্রসারণের জেরে ভেঙে পড়েছে বউবাজার এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়ি। সোমবার সকালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গা পিতুরী ও স্যাঁকরা পাড়া লেনের পাঁচটি বাড়ি ভাঙার কথা ছিল। কিন্তু, তার আগে ভেঙে পড়ে স্যাঁকরা পাড়া লেনে এইট-বি নম্বরের বাড়িটি। সেই খবর পেয়েই পাশে আশ্রয় নেওয়া হোটেল থেকে একছুটে স্বামী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বাড়ির সামনে চলে এসেছিলেন মৌমিতা সেন। ভেঙে পড়া বাড়িটির তিনজন অংশীদারের মধ্যে তিনি সব থেকে কমবয়সী অংশীদার। কিন্তু, স্মৃতির মণিকোঠায় আজও অমলিন হয়ে রয়েছে বাড়িটিতে কাটানো মুহূর্তগুলি।

Boubabazar  house

আজ নিজের স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ থেকে একটু দূরে বড় রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছিল সেই সব কথাই। অশ্রুসজল চোখে বারবার তাকাচ্ছিলেন স্যাঁকরা পাড়া লেনের দিকে। গলিতে ঢোকার মুখেই ব্যারিকেড দেওয়া। পাশে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছেন বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী। ফলে মন চাইলেও গলিতে ঢুকে বাড়ির হাল দেখার কোনও উপায় নেই। তাই নিজের বাড়িকে রাস্তার উপর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখলেন দূর থেকেই। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বারবার চোখে জল চলে আসছিল। কিন্তু, তারপরই সামনে বছর মাধ্যমিকে বসতে চলা মেয়ের কথা চিন্তা করে শক্ত হয়ে উঠছিল চোয়াল।

[আরও পড়ুন: পুরসভার অনুমতিতে শুরু বউবাজারের বিপজ্জনক বাড়ি ভাঙার কাজ]

বাড়ি ভেঙে পড়ার বিষয়ে প্রথমে কিছু বলতে চাইছিলেন না। কিন্তু, একটু অনুরোধ করতেই উগরে দিলেন বুকের ভিতরে গুমরে থাকা রাগ। কথা বলতে বলতে বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছিল। তা উপেক্ষা করেই মৌমিতাদেবী বলেন, ‘মানুষ তো একদিনে এত কিছু করতে পারে না। ১৮ বছর ধরে তিল তিল করে তৈরি করা সংসার এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। হোটেলে রাত কাটালেও একমুহূর্ত ভাল লাগছে না। রোজ সকাল হলেই বাড়ির সামনে ছুটে আসছি। হোটেলের ঘরটা যেন মনে হচ্ছে গিলে খেতে আসছে। মেট্রো কর্তৃপক্ষ প্রথমে বলেছিল, মনে করুন দু’দিনের জন্য বাইরে ঘুরতে যাচ্ছেন। আমরা তখন তাদের বারবার বললাম ঘর দেখুন, বাড়ি দেখুন। কোনওরকম অসুবিধা নেই তো। ওরা বলল, কোনও ক্ষতি হবে না। এই কথা বলে আমাদের ২৯ আগস্ট বাড়ি থেকে বের করল।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ৩১ তারিখ ফের আমাদের ডেকে বাড়ি দেখাতে নিয়ে এল মেট্রোর লোকজন। সেদিন সন্ধেবেলা সাতটা থেকে দেখছি বাড়ির এখান ফাটছে, ওখান ফাটছে। আমার উপরের তলা থেকে বড়জা ডেকে বলল, মৌমিতা উপরে এসো। দেখো এখানে কী ভাবে ফাটছে। গিয়ে দেখি দোতলা থেকে তিনতলা ওঠার সিঁড়িতে বিশাল ফাটল ধরেছে। সঙ্গে সঙ্গে মেট্রো কর্তৃপক্ষের তরফে দেওয়া অপূর্ব দাস নামে এক ব্যক্তির নম্বরে ফোন করলাম। সম্ভবত উনি মেট্রো চিফ ইঞ্জিনিয়ার হবেন। তাঁকে বললাম, আমাদের বাড়ির এই অবস্থা, একবার আসুন। তিনি আসছি আসছি বলতে বলতে রাত নটার সময় এলেন। তারপর তাঁকে যখন বাড়ির পরিস্থিতি দেখাচ্ছি। বলছি এই দেখুন এই অবস্থা। তখনও উনি ভরসা দিচ্ছেন। বলছেন, কোনও চিন্তা নেই দিদি। এটা দেওয়ালের চকলা খসছে। তাঁর এই কথা শুনে আমি বললাম, আপনারা কী পেয়েছেন। এটা চোকলা খসছে। দাদা, এত চওড়া হয়ে ফেটে গিয়েছে। চাঁই খুলে বেরিয়ে আসছে। আর আপনি বলছেন চকলা খসছে। আপনারা আমাদের কী পেয়েছেন? এই কথা শুনে ওই ভদ্রলোক বলেন, আপনারা কী চাইছেন? আপনারা ইঞ্জিনিয়ার না আমরা ইঞ্জিনিয়ার? এই কথা শুনে আমি বলি, আপনারা অবশ্যই ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু, আমারও তো একটা বেসিক সেন্স আছে। এই অবস্থা দেখার পরেও আপনি যদি বলেন, চকলা খসছে। তা হলে আমরা রাত্রিতে কী নিরাপত্তায় থাকব? যখন তখন চাঁই ভেঙে পড়বে। এরপরই আমার বড়জা তাঁকে বলেন, আমরা এখানে থাকতে পারব না। আমাদের অন্য জায়গায় পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। তারপর থেকে আমরা হোটেলে আছি। কিন্তু, আজ এসে দেখলাম পুরো বাড়িটাই ভেঙে পড়েছে। নিচের ঘর তৈরির জন্য ঋণ নিয়েছিলাম। সেই ঋণের কিস্তি এখনও চলছে। কিন্তু, সেই ঘরটাই আর নেই।’

দেখুন ভিডিও: 

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং