গৌতম ব্রহ্ম: হাজার শরীরে ছড়িয়েছে ভাগাড়ের জীবাণু।
চিকিৎসকদের আশঙ্কা সত্যি করে টক্সোপ্লাজমোসিসে আক্রান্ত আরও সাড়ে পাঁচশো রোগীর হদিশ দিল কলকাতার দুই নামী ডায়গনস্টিক সেন্টার। যাঁদের সিংহভাগ প্রসূতি হওয়ায় দুশ্চিন্তা বেড়েছে। গড়িয়া, যাদবপুর ও টালিগঞ্জের ১৪ জন রোগীর টক্সোপ্লাজমোসিসে আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রথম ফাঁস করেছে ‘সংবাদ প্রতিদিন’। বহু মানুষের এই বিরল জুনোসিসে সংক্রামিত হওয়ার আশঙ্কা যে যথেষ্ট, তাও জানিয়েছে। আশঙ্কা সত্যি করে সোমবার উত্তর কলকাতার একটি নামী ডায়াগনস্টিক সেন্টার জানিয়ে দেয়, শুধু এপ্রিল মাসেই চারশোর বেশি টক্সোপ্লাজমোসিসের ‘পজিটিভ’ নমুনা পেয়েছে তারা। সংস্থার কর্ণধার সঞ্জীব আচার্য জানিয়েছেন, সম্প্রতি টক্সোপ্লাজমোসিস বাড়ছে। শুধু এপ্রিল মাসে ২০৭৫টি সেরোলজিক্যাল টেস্ট হয়েছে। এর মধ্যে চারশোর বেশি নমুনায় ‘টক্সোপ্লাজমা গন্ডাই’-এর সন্ধান মিলেছে। সোমবারও চারটি নমুনার মধ্যে বিড়াল ও ধেড়ে ইঁদুরের শরীরে থাকা এই পরজীবীর সন্ধান মিলেছে।
মধ্য কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের একটি নামী ডায়াগনস্টিক সেন্টারও ‘আইজিজি’ পরীক্ষা করে ১৫৬টি পজিটিভ নমুনা পেয়েছে। সংস্থার কর্নধার শুভেন্দু রায়ের দাবি, ৭৪৭টি নমুনার মধ্যে ১৫৬টি পজিটিভ হয়েছে। এর মধ্যে প্রসূতি, স্নায়ুরোগ ও চোখের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীও রয়েছে। ডাক্তারদের আশঙ্কা, ‘টক্সোপ্লাজমা গন্ডাই’-এর জন্যই এই উপসর্গ। শুভেন্দুবাবু আরও জানিয়েছেন, বিড়াল এই জীবাণুর মুখ্য বাহক হলেও বিড়ালের থেকে অন্য পশুর শরীরেও এই জীবাণু প্রবেশ করে। প্রত্যক্ষ না পরোক্ষভাবে রোগীরা সংক্রামিত হয়েছে তা দেখাটা জরুরি।
[ভাগাড় হয়েছে হাজার শরীর, বিরল জুনসিসে আক্রান্ত যাদবপুর-টালিগঞ্জের ১৪]
সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কের একটি বেসরকারি ল্যাবরেটরি টক্সোপ্লাজমোসিসের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে। সংস্থার কর্ণধার ডা. অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “২০১৪ সাল থেকে এফএনএসি করতে গিয়ে ‘টক্সোপ্লাজমা গন্ডাই’ পাচ্ছি মানুষের শরীরে। টিউমারের চরিত্র নির্ণয় করতে গিয়ে রোগীর শরীরে ধরা পড়ছে ইঁদুর-বিড়ালের শরীরে থাকা পরজীবী।” আঁতকে উঠছেন ডাক্তারবাবুরাও। তাঁদের পর্যবেক্ষণ, এই প্রবণতা আগে কখনও পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়নি। সবই ভাগাড়-কাণ্ডের ফসল বলে সিংহভাগের অভিমত।
স্বভাবতই আতঙ্ক ছড়িয়েছে শহর জুড়ে। সবার মনে প্রশ্ন, তিনটি ল্যাবেই যদি এতগুলো পজিটিভ নমুনার হদিশ মেলে তাহলে গোটা শহরজুড়ে কতজনের শরীরে ঢুকেছে ভাগাড়ের জীবাণু? ডাক্তারদের অনুমান, সংখ্যাটা কয়েক হাজার হবে। সমস্যা হল, এই জীবাণু মানবদেহে থাকলেই যে উপস্থিতির জানান দেবে তা নয়। ৩০-৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে টক্সোপ্লাজমোসিস ‘অ্যাসিম্পটোমেটিক’। তবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বা স্টেরয়েড থেরাপি চলা রোগী এই রোগের ছোবল সামলাতে পারে না। ‘ক্রনিক’ ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রেও এই রোগ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে উপসর্গ না দেখা গেলে বাকিদের তেমন চিন্তা নেই বলেই জানিয়েছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অরিন্দম বিশ্বাস। তাঁর মত, এফএনএসি বা রক্তের পিসিআর পরীক্ষা করলেই ধরা পড়বে এই জীবাণু।
[যাদবপুরে বহুতল থেকে ঝাঁপ কিশোর-কিশোরীর, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভরতি হাসপাতালে]
চিন্তা অবশ্য অন্যত্র। নতুন হদিশ পাওয়া এই সাড়ে পাঁচশো রোগীর সিংহভাগই প্রসূতি। বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ ডা. প্রভাসপ্রসূণ গিরি জানিয়েছেন, এমনিতে মানুষ থেকে মানুষে এই রোগ ছড়ায় না। ছড়ায় বিড়ালের বিষ্ঠা বা মাংস থেকে। কিন্তু, মা টক্সোপ্লাজমোসিসে আক্রান্ত হলে শিশুরও তাতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সেক্ষেত্রে সদ্যোজাতর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও মস্তিষ্কে বিকৃতি দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ ভাগাড় কাণ্ড শহরের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনেও ভয়ংকর অভিশাপ নামিয়ে আনছে। আতঙ্কিত যোধপুর পার্কের সেই বেসরকারি ল্যাবরেটরির কর্নধার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। জানালেন, একজন প্রবীণ মানুষ কাঁধে টিউমার নিয়ে এসেছিলেন। সেই টিউমারের চরিত্র নির্ধারণ করতে গিয়ে এফএনএসি করতে হয়। তাতেই ধরা পড়ে এই জীবাণু। একটি ছ’বছরের শিশু ও মাঝবয়সি মহিলার পেটে টিউমার হয়েছিল। তাঁদের শরীরেও মিলেছে টক্সোপ্লাজমা গন্ডাই। তাঁর মত, এই নিয়ে অবিলম্বে গবেষণা হওয়া উচিত। না হলে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাবে।
সর্বশেষ খবর
-
কলকাতার জোড়া শপিং মলে পুলিশ-দমকল, ‘অখাদ্য’র পর অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা অভিযান
-
জমি জট নিয়ে শুভেন্দুর দরবারে পূর্ণদাস বাউল, ‘কথায় ওঠবস করব না বলে…’, মমতাকে তোপ ছেলের
-
বঙ্গে নাবালিকা বিয়ে ও মাতৃত্ব: সামাজিক পচন রোধে সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়
-
রাফালের ‘প্রাণ ভোমরা’ খুঁজতে গিয়ে নিজেই ফাঁদে! চিনা জে-১৬এর খুঁটিনাটি এবার ভারতের মুঠোয়?
-
ফের বঙ্গোপসাগরে ঘনাচ্ছে নিম্নচাপ! ভারী বৃষ্টি দক্ষিণের জেলাগুলিতে, জারি হলুদ সতর্কতা