বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা ও নিজস্ব সংবাদদাতা, মেদিনীপুর: নতুন বিতর্কে ভারতী ঘোষ! এবার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে মামলা হল রাজ্যের এই প্রাক্তন আইপিএস অফিসারের বিরুদ্ধে। সোনার বিনিময়ে টাকা দ্বিগুণ কাণ্ডের পর পশ্চিম মেদিনীপুরের বিতর্কিত এই প্রাক্তন পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে ৪৫ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে বুধবার নতুন একটি মামলা দায়ের হয়েছে মেদিনীপুর আদালতে। অভিযোগকারী বসিরহাটের গাড়ি ব্যবসায়ী ইউনুস আলি মণ্ডলের দাবি, পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার থাকাকালীন ২০১৬ সালে ভারতী ঘোষ তাঁর কাছ থেকে ৪৫ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন। মেদিনীপুরের মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে ইউনুসের হয়ে মামলা দায়ের করেন তিন আইনজীবী তিলক মিত্র, সুমিত ভঞ্জ ও দেবীপ্রসাদ চক্রবর্তী। অভিযোগে নাম রয়েছে ভারতীদেবীর তৎকালীন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী সুজিত মণ্ডল, খড়গপুর লোকাল থানার তৎকালীন ওসি রাজশেখর পাইন এবং ওই থানারই এসআই চিরঞ্জিৎ ঘোষেরও।
[চরম দুঃসময় বামেদের! অর্থাভাবে দলীয় কার্যালয় ভাড়া দেওয়া হল প্রোমোটারকে]
অন্যদিকে, মঙ্গলবারের পর বুধবার কলকাতার মাদুরদহে এক ভারতী-ঘনিষ্ঠের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায় সিআইডি। আবার মঙ্গলবার মাদুরদহের যে ফ্ল্যাটে সিআইডি তল্লাশি চালিয়েছিল, বুধবার ওই ফ্ল্যাটের মালিক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী আনন্দপুর থানায় গিয়ে ভারতীর স্বামী এম এ ভি রাজুর বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন। মেদিনীপুর আদালতে এদিন ইউনুসের আইনজীবীরা জানান, “গত ২০১৬-র ২৪ সেপ্টেম্বর ঘটনা ঘটলেও আজ পর্যন্ত এক টাকাও উদ্ধার করতে পারেননি তাঁর মক্কেল। টাকা ফেরত পেতে তিনি হাই কোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু আদালতের বাইরে নানারকম ভয় দেখিয়ে জোর করে সেই মামলা তাঁর মক্কেলকে দিয়ে প্রত্যাহার করানো হয়। সেসময় টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তা ফেরত দেওয়া হয়নি।” ইউনুস জানিয়েছেন, “এর পরও একাধিকবার আমি বিভিন্ন পুলিশ কর্তার কাছে গিয়েছি। ভারতী ঘোষের বদলির পরও আমি খড়্গপুর লোকাল থানায় অভিযোগ দায়ের করেও কোনও ফল পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে ফের আদালতের দ্বারস্থ হলাম।” তাঁর অন্যতম আইনজীবী দেবীপ্রসাদবাবু জানিয়েছেন, “মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট প্রসূন ঘোষ খড়্গপুর লোকাল থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন অভিযোগকে এফআইআর হিসেবে গণ্য করে তদন্ত শুরু করতে।” সেই নির্দেশ অনুযায়ী ভারতী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে চলেছে। ভবানীভবন সূত্রের খবর, এফআইআর দায়ের হলেই এই মামলার তদন্তভার নেবে সিআইডি।
অভিযোগকারী ইউনুসের গাড়ির ব্যবসা আছে। বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের স্বরূপনগরে। তাঁর ১০-১২টি ট্রাক আছে। এর মধ্যে দু’টি ট্রাক ভাড়া খাটে গরু ব্যবসায়ীদের কাছে। ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুরের ফেকোহাট থেকে গরু কিনে এই দু’টি ট্রাকে নিয়ে আসা হত উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন স্থানে। সেই সূত্রে অনেক ব্যবসায়ীই তাঁদের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মহাজনদের সঙ্গে টাকা আদান প্রদান করেন। ইউনুসের বয়ান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আটজন ব্যবসায়ীকে টাকা মেটানোর জন্য দাদা সামাদ আলি মণ্ডলের মাধ্যমে তিনি ৪৫ লক্ষ টাকা পাঠিয়েছিলেন। ভোর তিনটে নাগাদ তাঁদের গাড়ি খড়্গপুর লোকাল থানার সাদাতপুরে ৬ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর একটি লরির পেছনে গিয়ে ধাক্কা মারে তাঁদের গাড়ি। গুরুতর আহত হন সামাদ ও চালক। খবর পেয়ে পেট্রোল ডিউটিতে থাকা স্থানীয় থানার এসআই চিরঞ্জিৎ ঘোষ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করান। ইউনিসের অভিযোগ, আহতদের কাছ থেকে উদ্ধার করা সামগ্রীর কোনও সিজার লিস্ট তাঁদের দেওয়া হয়নি। তাঁরা উদ্ধার হওয়া টাকা-পয়সা ও অন্যান্য সামগ্রীর জন্য যোগাযোগ করেন চিরঞ্জিৎবাবু এবং খড়গপুর লোকাল থানার ওসির সঙ্গে। প্রত্যেকেই তখন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরে সব পেয়ে যাবেন। পরে ওসি জানান, বড়সাহেব (তৎকালীন পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ) বিষয়টি দেখছেন। সেই কথামতো পুলিশ সুপারের কাছে একাধিকবার যান ইউনুস। কিন্তু সেখানেও কাজ হয়নি। শেষমেশ তাঁকে ভারতী ঘোষের নিরাপত্তারক্ষী সুজিত মণ্ডলের ফোন নম্বর দিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। ঘটনাপ্রবাহে রীতিমতো হতাশ হয়ে তিনি উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করেন। ইউনুসের অভিযোগ, ওই মামলার পর থেকে তাঁর উপর অত্যাচার আরও বেড়ে যায়। তাঁর দুটি গাড়িকে আটকে রাখা হয়। এক ঘনিষ্ঠকে গ্রেফতার করে ৭৫ দিন জেলও খাটানো হয়। নানাভাবে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপও দেওয়া হতে থাকে। নতুন করে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় তিনি মামলা প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু তারপরও টাকা ফেরত না পেয়ে এবার ফের তাঁরা আদালতে এসেছেন।
[ব্যবসায়ীকে সোনার বিস্কুট বিক্রির অভিযোগ, ‘ক্লোজ’ করা হল খোদ এসআইকে]
অন্যদিকে, মাদুরদহের বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী নামে এক ব্যক্তি এদিন আনন্দপুর থানায় গিয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর বক্তব্য, “মঙ্গলবার মাদুরদহের যে ফ্ল্যাটে সিআইডি হানা দেয়, সেটি আমার। ফ্ল্যাটটি ফাঁকাই থাকত। ভারতীর স্বামী এম এ ভি রাজু ওই ফ্ল্যাটে কয়েকটি বাক্স রাখতে দেন। আমিও বাক্স না খুলেই তা আলমারিতে রেখে দিই। মঙ্গলবার সেই আলমারি ভেঙে আড়াই কোটি টাকা উদ্ধার করে সিআইডি।” যদিও রাজুও ওইদিন থানায় অভিযোগ দায়ের করে জানিয়েছিলেন, ফ্ল্যাটটি ভারতী ঘোষের নামেই। এর ফলে ফ্ল্যাটের প্রকৃত মালিকানা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। লালবাজার সূত্রের খবর, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এদিন ভারতীর স্বামীকে ভবানীভবনে ডেকে পাঠানো হলেও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি আসেননি। আইনজীবী মারফৎ তিনি এক সপ্তাহের সময় চেয়ে নিয়েছেন।
এদিকে এদিন ফের মুখ খুলেছেন ভারতী ঘোষ। তাঁর প্রশ্ন, “দাসপুর থানার যে মামলা নিয়ে এত চেঁচামেচি হচ্ছে, তার এফআইআরে আমার নাম নেই। তা সত্ত্বেও আমার স্বামীর বাড়িতে তল্লাশি হয়ে গেল। সিআইডি কি ম্যাজিক জানে, যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই জেনে গেল আমি ও আমার স্বামী দোষী? এফআইআরে উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও ১২ জায়গায় রাতারাতি তল্লাশি হল কীভাবে? এফআইআর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গোয়েন্দাদের দল রাতারাতি তল্লাশি চালাতে বেরিয়ে পড়ল! তদন্ত শুরুর আগেই ওই ১২টি জায়গার হদিস কী করে সিআইডি জানল? তল্লাশি চালানোর সময় গোয়েন্দারা আমার অনেকগুলি ছবি ভেঙেছে। আমাদের জমির দলিল বাজেয়াপ্ত করেছে। তা সত্ত্বেও সরকারি বিবৃতিতে তারা কী করে জানাচ্ছে যে, বাড়ির মালিককে আমরা চিনি না? আমার বাড়িতে লোক ঢুকে বসে থাকবে, অথচ আমি জানব না? সম্পূর্ণ ধোঁয়াশার তল্লাশি।” প্রাক্তন আইপিএস অফিসারের বক্তব্য, “সিআইডি বলছে, ভারতী ঘোষের ঘনিষ্ঠের বাড়িতে তল্লাশি। সিআইডির কাছে এই ঘনিষ্ঠতার কী প্রমাণ আছে? দাসপুরের এক চাউমিন বিক্রেতা না কি সোনা বিক্রি করেছিল। আগে দেখা উচিত, ওই গরিব বিক্রেতা এত সোনা পেল কী করে? সোনা কেনা-বেচার লাইসেন্স ছিল কি? তা না করে এটিকে তোলাবাজির মামলায় পরিণত করে ‘অপারেশন ভারতী ঘোষ’ চালু করল সিআইডি। এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তল্লাশির নামে আমার বাড়িতে লুঠপাট চালানো হয়েছে। ঠাকুরঘর ভেঙেছে, ঠাকুরের গলা থেকে হার ছিনতাই করেছে, ঠাকুরকে অপমান করেছে। মহিলাদের অত্যাচার করেছে। অনেক ব্যক্তিগত জিনিস নিয়ে গিয়েছে। এটাই কি জঙ্গলমহল শান্ত ও সুন্দর করার পুরস্কার?”
[চিংড়িঘাটায় দুর্ঘটনার জের, সরিয়ে দেওয়া হল বেলেঘাটা ট্রাফিক গার্ডের ওসিকে]
সর্বশেষ খবর
-
বাইক দাঁড় করিয়ে ফোনে কথা, পিছন থেকে বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কা, বেঘোরে মৃত্যু শিশু-সহ গোটা পরিবারের
-
ভারত-চিনের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন! ইউনানের শিল্পীরা মাতালেন কলকাতার মঞ্চ
-
সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণই কি ভবিষ্যৎ? ৯ কর্মী সংগঠনের চিঠির উত্তর দিল ইসরো
-
জল্পনার অবসান! ‘বিগ বস বাংলা’য় প্রথম ওয়াইল্ড কার্ড এন্ট্রি রাজবীরের, চেনেন এই অভিনেতাকে?
-
দিল্লিতে বাড়ি ভেঙে মৃত ৫, শোকপ্রকাশ মোদি-মুর্মুর, ‘এড়ানো যেত’, তোপ কংগ্রেসের