একটি শিশুর জন্মের অনেক আগেই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যায়। মায়ের গর্ভে একটি ক্ষুদ্র ভ্রূণের মধ্যে প্রতি সেকেন্ডে অসংখ্য নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি হয়, তারা একে অপরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মানুষের মস্তিষ্ক। এই জটিল নির্মাণপ্রক্রিয়ার কোথাও যদি জিনগত বৈশিষ্ট্য, গর্ভকালীন পরিবেশ এবং জীববিজ্ঞানের সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন একসঙ্গে প্রভাব ফেলে, তখন একটি শিশু পৃথিবীকে অন্যদের তুলনায় একটু ভিন্নভাবে অনুভব করতে পারে। সেই ভিন্নতারই নাম অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD)। লিখছেন ড. মোঃ সাহিদুল আরেফিন (অডিওলজিস্ট ও স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট)।
বহু বছর ধরে মানুষ অটিজমের জন্য কখনও মায়েদের, কখনও টিকাকে, কখনও আবার লালন-পালনকে দায়ী করেছে। কিন্তু গত পাঁচ দশকের হাজার হাজার গবেষণা আজ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—অটিজম কোনো একক কারণের ফল নয়। আপনার সামনে থাকা ছবিই সেই বৈজ্ঞানিক যাত্রার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
আরও পড়ুন:
জিন—অটিজমের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি
প্রথম ছবিতে ১৯৭৭ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন Twin Study ও Family Study-এর ফলাফল দেখানো হয়েছে। প্রতিটি গবেষণায় অটিজমের Heritability Estimate বা জিনগত অবদানের হার প্রায় ৭৫–৯২ শতাংশ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, একজন শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে জিনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই সংখ্যার অর্থ ভুলভাবে বোঝা উচিত নয়। এর মানে এই নয় যে “৯০ শতাংশ অটিজম জিন দিয়ে তৈরি” বা “অটিজম হবেই”। এটি একটি Population Estimate, যা দেখায় একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অটিজমের পার্থক্যের কতটা জিনগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। আর এখানেই বিজ্ঞান আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়—অটিজমের জন্য কোনো একক “Autism Gene” নেই। বরং শত শত জিন একসঙ্গে মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করে। তাই আজ অটিজমকে Polygenic Neurodevelopmental Condition বলা হয়।
জিনের পাশাপাশি পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ
যদি জিনই সবকিছু নির্ধারণ করত, তাহলে অভিন্ন যমজদের দুজনেরই সবসময় একইভাবে অটিজম হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে তা হয় না। এখান থেকেই শুরু হয় দ্বিতীয় ছবির গল্প।

এই গ্রাফে Odds Ratio (OR) ব্যবহার করে বিভিন্ন পরিবেশগত ঝুঁকির উপাদান দেখানো হয়েছে। এখানে OR=1 মানে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেই, আর OR যত বেশি, নির্দিষ্ট উপাদানের সঙ্গে সম্পর্ক তত শক্তিশালী। তবে এগুলো Risk Factor, কোনো Cause নয়।
সবচেয়ে উপরে রয়েছে Valproic Acid, যা মৃগী ও কিছু স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ওষুধ। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে এটি ব্যবহার করলে অটিজমসহ কিছু নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বাড়তে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা কখনোই নিরাপদ নয়।
এরপর রয়েছে Maternal Infection in First Trimester। গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে গুরুতর সংক্রমণের সময় মায়ের শরীরে তৈরি হওয়া প্রদাহজনিত রাসায়নিক (Cytokines) কিছু ক্ষেত্রে ভ্রূণের বিকাশমান মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো Air Pollution during Third Trimester। PM2.5-এর মতো অতিক্ষুদ্র দূষণকণা প্লাসেন্টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাধ্যমে মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
গ্রাফে আরও রয়েছে SSRIs, Heavy Metals, Pesticide Exposure, Advanced Paternal Age এবং Maternal Diabetes/Obesity। এগুলোর প্রত্যেকটির সঙ্গেই কিছু গবেষণায় ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে, তবে কোনোটিই এককভাবে অটিজমের কারণ নয়। এই পুরো ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জিন এবং পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে মিলে কাজ করে।
বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ভুল এবং সবচেয়ে বড় শিক্ষা
তৃতীয় ছবিটি একটি বৈজ্ঞানিক টাইমলাইন। ১৯৪৩ সালে ড. লিও ক্যানার প্রথম অটিজমকে একটি স্বতন্ত্র নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন। এরপর আসে “Refrigerator Mother Theory”, যেখানে ভুলভাবে মায়েদের দোষারোপ করা হয়। পরে গবেষণায় এটি সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়।

১৯৯৮ সালে আরেকটি বড় বিতর্ক শুরু হয়, যখন একটি ছোট গবেষণায় MMR টিকা এবং অটিজমের সম্ভাব্য সম্পর্কের দাবি করা হয়। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লক্ষ লক্ষ শিশুর ওপর গবেষণায় সেই দাবি সমর্থন পায়নি। শেষ পর্যন্ত গবেষণাটি প্রত্যাহার (Retracted) হয় এবং আজ WHO, CDC, AAP-সহ সব বড় স্বাস্থ্য সংস্থা একমত—বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অনুযায়ী টিকা অটিজম সৃষ্টি করে না।
এই ছবির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল—বিজ্ঞান ভুল করতে পারে, কিন্তু প্রমাণের ভিত্তিতে সেই ভুল সংশোধনও করতে পারে।
অটিজমের আধুনিক বৈজ্ঞানিক মডেল
শেষ ছবিটি আগের তিনটি ছবির সারাংশ। এখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে Genes, Environmental Factors, Epigenetics এবং Brain Development একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

জিন মস্তিষ্কের প্রাথমিক নকশা তৈরি করে, পরিবেশ সেই নকশার প্রকাশকে প্রভাবিত করতে পারে, আর Epigenetics নির্ধারণ করে কোন জিন কখন কতটা সক্রিয় হবে। এই সবকিছুর শেষ প্রভাব পড়ে বিকাশমান মস্তিষ্কের ওপর। ফলে নিউরনের সংযোগ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, ভাষা, সামাজিক যোগাযোগ ও সংবেদনশীলতার বিকাশ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।
এই কারণেই আজ বিজ্ঞানীরা বলেন—
“If you’ve met one person with autism, you’ve met one person with autism.”
অর্থাৎ একজন অটিস্টিক ব্যক্তিকে দেখে অন্য সবার সম্পর্কে ধারণা করা যায় না।
শেষ কথা
চারটি ছবি আমাদের চারটি শিক্ষা দেয়। প্রথমটি বলে—জিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়টি বলে—পরিবেশও ভূমিকা রাখে। তৃতীয়টি শেখায়—কুসংস্কার নয়, প্রমাণকে অনুসরণ করতে হবে। আর চতুর্থটি জানায়—অটিজম কোনো একক কারণের ফল নয়; এটি মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশের এক জটিল, বহুমাত্রিক এবং বৈজ্ঞানিকভাবে আকর্ষণীয় অধ্যায়।
সবচেয়ে বড় কথা, অটিজম কোনো শিশুর পরিচয় নয়; এটি তার স্নায়ুবিক বৈচিত্র্যের একটি অংশ মাত্র। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দোষারোপ নয়, দ্রুত শনাক্তকরণ; ভয় নয়, বৈজ্ঞানিক সচেতনতা; আর বিচার নয়, গ্রহণযোগ্যতা ও সহমর্মিতা। কারণ প্রতিটি শিশুই তার নিজস্ব সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়, আর সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
অতি লোভে তাঁতি নষ্ট! ৩৪ তারকাকে নিয়ে কেমন হল অক্ষয়ের ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’?
-
মেসিকে ছাড়, ভিনির বেলায় ফাউল! রেফারির বিরুদ্ধে ফিফায় নালিশ ঠুকল ক্ষুব্ধ ব্রাজিল
-
খাঁচায় বন্দি পাখি আর স্বাধীনতার অসহনীয় ভার! ‘পিঞ্জর’-এর ট্রেলার যেন সমাজের আয়না
-
৫১ আইটিআই-র ভোলবদল! বেসরকারি সংস্থার কাঁধে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানালেন উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী
-
খুনিদের ফাঁসি নিশ্চিত! বাগনানে তৃণমূলের হাতে খুন বিজেপি কর্মীর বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু