BREAKING NEWS

২ আশ্বিন  ১৪২৭  রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ 

Advertisement

ভিড় থেকে দূরে সময় কাটাতে চান? ঘুরে আসতে পারেন মৈরাংয়ে

Published by: Bishakha Pal |    Posted: May 9, 2019 9:00 pm|    Updated: May 9, 2019 9:00 pm

An Images

যেখানে প্রথম উড়েছিল ভারতের পতাকা। ঐতিহাসিক সেই মৈরাংয়ের মাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক রোমান্টিক কাহিনিও। লিখছেন প্রসূন চক্রবর্তী।

ইতিহাসের ফিসফিস

কালের নিয়মে আজ সবাই প্রায় ভুলতে বসেছে ভারতের প্রথম পতাকা ওড়ানোর কথা। না ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দিল্লি নয়। সেটা ছিল ১৯৪৪, ৪ এপ্রিল। ভারতের প্রথম পতাকা ওড়ানো হল মৈরাংয়ের মাটিতে। ভারতের মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম নেতা সুভাষচন্দ্র বসু দেশের বাইরে গিয়ে স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য গঠন করেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। তার এই আজাদ হিন্দ ফৌজই ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করেছিল এই স্থানটি। ১৯৪৪-এর বসন্তকালে শুরু হল অভিযান। আজাদ হিন্দ ফৌজে তখন হাজার বারো সৈন্য। এই সৈন্য দিয়েই গঠিত হল চারটি ব্রিগেড কর্নেল শাহনওয়াজের অধীনে সুভাষ ব্রিগেড, কর্নেল ইয়ান্য কিয়ানির অধীনে গান্ধী ব্রিগেড, কর্নেল মোহন সিংয়ের অধীনে আজাদ ব্রিগেড আর নেহরু ব্রিগেড কর্নেল ধীলনের অধীনে। এঁরা চারদিক থেকে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল আক্রমণের জন্য তৈরি। আসলে রাজনৈতিক দিক থেকে ইম্ফলের গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট।

সেই জন ২৮ মার্চ কর্নেল শাহনওয়াজ নেতাজির কাছে ইম্ফল আক্রমণের অনুমতি চাইলেন। নেতাজি জানালেন আজাদ ব্রিগেড আর গান্ধী ব্রিগেড ইম্ফল আক্রমণ করছে, সুভাষ ব্রিগেডও যেন তৈরি থাকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইম্ফল হস্তগত হবে এবং শাহনওয়াজকে যেতে হবে ব্রহ্মপুত্রের পরপারে। তিনি রওনা হলেন কোহিমার দিকে। ব্রহ্মদেশের দুর্গম অরণ্যে ম্যালেরিয়ার আক্রমণেও সৈন্যদের উদ্যম নষ্ট হয়নি। আর এই যুদ্ধে নাগারা তাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিল। ইংরেজদের উপর নাগাদের রাগ ছিল দীর্ঘদিনের। কারণ তাদের মুক্তিসংগ্রামের নেতা রানি গুইন্দালোকে বন্দি করেছিল ইংরেজরা। এইভাবেই একসময় আজাদ হিন্দ ফৌজ এসে পৌঁছায় ভারতের মৈরাং।

তাই ভারতের ইতিহাসে আজাদ হিন্দ ফৌজের পাশাপাশি মৈরাংয়ের নাম ভাস্বর হয়ে থাকবে চিরকাল। ইম্ফল থেকে মাত্র পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরে এই শহরটির অবস্থান। মৈরাং বাজার যেখানে শেষ হয়েছে তারই বাঁদিকের পথ ধরে একটু এগোলেই দেখা যাবে একটি দোতলা বাড়ি: যার প্রাঙ্গণে আই.এন.এ. মেমোরিয়াল। এ জায়গাটিকে মৈরামের মার্টার্স মেমোরিয়াল গ্রাউন্ড বলে। বাড়িটির দোতলায় আই.এন.এ.ওয়ার মিউজিয়াম আর একতলায় নেতাজি লাইব্রেরি।

netaji

নজরে রাখুন

মিউজিয়ামটি উদ্বোধন করেছিলেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। বহু মূল্যবান ছবি, চিঠিপত্র, আজাদ হিন্দ বাহিনীর কর্নেল ও লেফটেন্যান্টদের বিবিধ ব্যাজ এখানে রয়েছে। নেতাজির শেষ ছবিটি যেটি সাইগনে তোলা হয়েছিল ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট সেটিও স্থান পেয়েছে এখানে। এই ভবনটিতে ঢুকতেই চোখে পড়বে সাজানো বাগানে রয়েছে নেতাজির মানুষ সমান ব্রোঞ্জের স্ট্যাচু। ১৯৭২ সালের ২১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ভি.ভি. গিরি এই মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন। অন্যদিকে রয়েছে একটি পাথরের স্তম্ভ, যার গায়ে লেখা আছে: ইত্তেহাদ, ইৎমাদ ও কুরবানি। নেতাজি সিঙ্গাপুরে যে আই.এন.এ. মেমোরিয়াল স্থাপন করেছিলেন ইংরেজরা তা ভেঙে দিয়েছিল। ঠিক সেইরকমই একটি স্মৃতিস্তম্ভও এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

লোকতাকের লোককথা

শুধু ইতিহাস নয়, মৈরংয়ের অন্যতম আকর্ষণ লোকতাক লেক এবং কৈবুল লামজাও জাতীয় উদ্যান। আর এই লোকতাক লেককে কেন্দ্র করে রোমিও জুলিয়েটের রোমান্টিক কাহিনির মতোই খাম্বা-থইবির লোককাহিনি আজও মৈরাংয়ের বাতাসে ভেসে বেড়ায়। বারাহের রূপ ধারণ করে ভগবান থাং জিং মর্তে এসেছিলেন এবং তাঁরই হাতে সৃষ্টি মৈরাংয়ের কিন্তু কলিযুগের প্রথম রাজার সুশাসনের ফলে মানুষ ভুলে যায় থাং জিং কে। সেই প্রথম রাজার নাতি যখন মৈরাংয়ের রাজা তখন খাম্বার বাবা তাকে শিকারকালীন অবস্থায় বাঘের হাত থেকে রক্ষা করেন। এই রাজার ভাই যুবরাজের একমাত্র কন্যা ছিলেন থইবি। সুন্দরী থইবির একদিন ইচ্ছা হল লোকতাক লেকে সখীদের নিয়ে তিনি মাছ ধরবেন। রাজা ঢেঁড়া পিটিয়ে সমস্ত পুরুষের সেদিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ করলেও খাম্বা সে কথা জানতো না। ফলে সুন্দর বলিষ্ঠ খাম্বাকে দেখে রাজকন্যা মুগ্ধ হলেন ও খাম্বার প্রতি অনুরক্ত হলেন। এদিকে থইবির বিবাহ ঠিক হয়ে রয়েছে ধনী যুবক নঈবানের সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই খাম্বাকে নঈবানের সঙ্গে নানা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়, একটার পর একটার শক্তি পরীক্ষা দিতে হয়। পাগলা ষাঁড়কে বশ করা, হাতির পায়ের তলা থেকে বেঁচে ফিরে আসা প্রভৃতি নানা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর যখন নঈবান বাঘের হাতে মারা গেল তখন অবশেষে খাম্বা আর থইবির আকাঙ্ক্ষিত মিলন হল। কিন্তু বিবাহিত জীবনে খাম্বার মনে হতে লাগল থইবি তাকে প্রকৃতই ভালবাসে কি না জানা প্রয়োজন। এদের সমাজে প্রিয় নারীকে ঘর থেকে বাইরে বার করে আনার এক অদ্ভুত প্রথা ছিল। মেয়েটি যখন একলা ঘরে থাকবে তখন পুরুষটি ঘরের বাইরে থেকে বেড়ার ফাঁক দিয়ে একটি লাঠি ঢুকিয়ে দেবে। যদি সেই বিবাহিত মেয়েটি লাঠিটি চেপে ধরে তাহলে বাইরের পুরুষটি বুঝে নেবে যে তার সম্মতি রয়েছে। একদিন গভীর রাতে থইবি দেখল তার ঘরে কেউ লাঠি ঢুকিয়েছে। বিরক্ত এবং ক্রুদ্ধ থইবি কোনও কথা না বলে খাম্বার বর্শা নিয়ে সোজা ঢুকিয়ে দিল বেড়ার বাইরের মানুষটার বুকে। যন্ত্রণায় কাতর খাম্বা চেঁচিয়ে উঠল: থইবি, আমি। আমি খাম্বা। পাগলের মতো বাইরে বেরিয়ে এসে থইবি দেখল রক্তে ভেসে যাচ্ছে খাম্বার সারা শরীর। সে আর দেরি না করে ওই বর্শা টেনে নিয়ে বসিয়ে দিল নিজের বুকে। দু’জনেরই মৃত্যু হল একই সঙ্গে। এক রোমান্টিক ট্র‌্যাজেডির নির্মম উদাহরণ খাম্বা-থইবি। মণিপুরি সাহিত্যেও এই কাহিনি স্থান করে নিয়েছে তার আপন বৈশিষ্ট্যে।

যে লেকের জলে খাম্বা-থইবির প্রথম চার চোখের মিলন হয়েছিল সেটি আই.এন.এ. মেমোরিয়ালের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে অবস্থিত। অর্থাৎ মৈরাং বাজার থেকে যে রাস্তাটি ডান দিকে গিয়েছে সেটিই পৌঁছে দেবে লোক তাকে। রিকশা, মোটরগাড়ি এবং টুরিস্ট বাসও সহজেই যেতে পারে এ পথে। পথের ধার দিয়ে নালার মতো নদী বয়ে চলেছে। ছোটো ছোটো ডিঙি দিয়ে নৌকোয় যাতায়াত করছে মেয়েরা। এই বিস্তীর্ণ লেকের মাঝে রয়েছে ছোটো ছোটো দ্বীপ আর পাহাড়। বর্তমানে এখানে প্রায় দু’শো ঘর মানুষের বসবাস।

moirang-2

প্রেমের প্রকৃতি

সেন্দ্রা দ্বীপের উপর থেকে লোকতাক লেকের প্রাকৃতিক দৃশ্য অসাধারণ। সবুজাভ নীল পাহাড়ে নিচে যে বিশাল এলাকা জুড়ে জলরাশি, সেখানে কচুরিপানা তার সবুজ বেগুলির কার্পেট বুননে যেন নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে শিল্পীর সামনে। লোকতাকের দক্ষিণ-পশ্চিমে পৃথিবীর অন্যতম ভাসমান পার্কটিই কৈবুল লামজাও জাতীয় উদ্যান। বিভিন্ন জাতের হরিণের মধ্যে সাংগাই হরিণ, যাকে নৃত্যরত হরিণ বলা হয়, সেটিই এই পার্কের প্রধান সম্পদ। এছাড়াও অন্যান্য হরিণ, পরিযায়ী পাখি, বনবিড়ালের দর্শন মেলে নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে। বন দপ্তরের তত্ত্বাবধানে এখানেও রয়েছে দুটি বিশ্রামাগার। আর উৎসুক ভ্রমণার্থীদের আকর্ষণ করবে ইম্ফলে গোবিন্দজির মন্দির, ইমা বাজার (মহিলা পরিচালিত), শহিদ মিনার, ওয়ার সিমেট্রি, জাতীয় মিউজিয়াম, অর্কিড হাউস প্রভৃতি।

যাতায়াত ব্যবস্থা

প্লেনে দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ইম্ফল। শিলচর থেকে ইম্ফল সরাসরি বাস আছে। ইম্ফল থেকে প্রতি দশ মিনিট অন্তর বাস ছাড়ে মৈরাংয়ের। এছাড়া ট্যাক্সিও যায়। মণিপুর সরকারের কনডাক্টেড ট্যুরও হয়ে থাকে মৈরাংয়ে।

থাকার ব্যবস্থা

টু্রিজম ডিপার্টমেন্টের অধীনে ইম্ফলে রয়েছে হোটেল ইম্ফল। স্টেট গেস্টহাউসও রয়েছে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। এছাড়া সেন্দ্রাতে রয়েছে টুরিস্ট হোম সরকারি ব্যবস্থায়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গেস্টহাউসও রয়েছে মৈরাংয়ে। এছাড়া থাকবার জন্য ইম্ফলে রয়েছে প্রচুর প্রাইভেট হোটেল। মনে রাখা প্রয়োজন সরাসরি ইম্ফলে আসতে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য কোনও ইনার লাইন পারমিট লাগে না, গুয়াহাটি থেকে ৩৯ নং জাতীয় সড়ক পথেও ইম্ফলে আসা যায়।

এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত খবর জানবার জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে: মণিপুর ভবন, ২৬ রোল্যান্ড রো, কলকাতা-২০। এবং ইন্ডিয়া টুরিজম কলকাতা, ৪, শেক্সপিয়র সরণি, কলকাতা-৭০০০৭১, ফোন : ২২৮২৫৮১৩/৭৭৩১।  

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement