হিমালয়ের কোলে প্রলয়! নিমেষে বিধ্বস্ত নেপাল, লেন্সবন্দি প্রকৃতির ‘তাণ্ডবনৃত্য’
২০১৫ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের পর এত বড় বিপর্যয় দেখেনি নেপাল। নিখোঁজ ১০৫ জন ভারতীয়-সহ ৪০০ জন কৈলাসযাত্রী।
২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের সাক্ষী হয়েছিল নেপাল। 'গোর্খা ভূমিকম্প' নামে পরিচিত ওই দুর্যোগে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ৯ হাজার মানুষের। এরপর ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট দিনটিকেই সম্ভবত লেখা হবে কালো অক্ষরে। জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে বাড়ি-ঘর-সেতু-রাস্তা-সহ বহু জনপদ। ভাইরাল ভিডিও দেখলে মনে হবে হলিউডের সাইফাই সিনেমার দৃশ্য।
আরও পড়ুন:
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, বিপর্যয়ের সূত্রপাত চিনের তিব্বতে। সেখান থেকে বন্যার জল প্রবেশ করে নেপালের রসুয়া জেলায়। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিমি দূরে অবস্থিত এই জেলার উপর দিয়েই বয়ে গিয়েছে ভোটেকোশী নদী। বুধবার সকাল থেকেই আচমকা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরপরই চিন সীমান্তবর্তী ওই জেলায় হড়পা বান নামে। আকস্মিক বন্যার জেরে রীতিমতো ধ্বংসযজ্ঞ চলে রসুয়া জেলায়।
চিনের সংবাদ সংস্থা ‘সিনহুয়া’র খবর অনুযায়ী, হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিব্বতের গাইরং প্রদেশ-সহ বহু এলাকা। সেখানেও হতাহতের সংখ্যা বহু। হড়পা বানের কারণ নিয়ে নানা মত উঠে আসছে। নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ জানিয়েছে, রসুয়ায় ভারী বৃষ্টির জেরে এই বিপর্যয় ঘটেছে, এমন সম্ভাবনা কম। ফলে তিব্বত থেকে জল নেমে আসার বিষয়টিই প্রকট। পাশাপাশি, হিমবাহের জলাধার ভাঙা বা ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’-এর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বন্যাদুর্গত এলাকা থেকে অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশিদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। অন্যদিকে, রাসুয়া জেলায় নেপাল পুলিশের অন্তত ২৬ জন আধিকারিক এখনও নিখোঁজ। পাশাপাশি, খোঁজ মিলছে না নেপালি আধাসেনার কমপক্ষে ৭ জওয়ানেরও।
আরও পড়ুন:
নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুগলিন এলাকা-সহ ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নেপালি প্রশাসন। ভয়াবহ এই দুর্যোগে উদ্বিগ্ন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। তিনি জানিয়েছেন, বিপর্যয় মোকাবিলায় নেমে পড়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসক দল, স্কাউট, রেড ক্রস। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে অতিরিক্ত অ্যাম্বুল্যান্স ও চিকিৎসাকর্মীদের পাঠানো হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশে দুর্যোগের মৃতদের প্রতি শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফোন করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহকে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এক্স হ্যান্ডেলের পোস্টে মোদি লিখেছেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহর সঙ্গে কথা বলেছি। নেপালে বন্যায় প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছি। এই কঠিন সময়ে ভারতের জনগণ নেপালের ভাই-বোনদের পাশে রয়েছে।” আরও লিখেছেন, “নেপালকে সম্ভাব্য সব ধরনের মানবিক সহায়তা দিতে ভারত প্রস্তুত।"
এদিকে নেপালের দুর্যোগ থাবা বসাতে পারে ভারতেও! এই আশঙ্কা বাড়ছে। ইতিমধ্যে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বিপর্যয় সামাল দিতে বিহারের প্রশাসন কতটা প্রস্তুত রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে দু’জনের মধ্যে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। মুখ্যসচিব এবং ডিজিপি ক্রমাগত নজর রাখছেন পরিস্থিতির দিকে। সতর্ক করা হয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তরকেও।
নেপালে বিপর্যয়ে পড়েছেন শতাধিক ভারতীয় পর্যটকও। কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনে গিয়েছিলেন তাঁরা। পড়শি দেশে আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকের তথ্য ও খবরাখবর নেওয়ার জন্য ভারতের বিদেশ মন্ত্রক দু’টি জরুরি নম্বর প্রকাশ করেছে— +৯৭৭৯৮৫১৩১৬৮০৭ এবং +৯৭৭৯৭০৯১০৭৫০০। নেপালের বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয়রা সহায়তা এবং তথ্যের জন্য ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন। নেপালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে দিল্লি। উদ্ধারকাজ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের কাজে সাহায্য করছে ভারত।