প্রথমে ভয় পেতেন, পরে কিশোরকুমারের সঙ্গেই আইকনিক পার্টনারশিপ আশা ভোঁসলের
দুই কিংবদন্তির মধ্যে ছিল দারুণ এক সম্পর্ক। কীভাবে তৈরি হয়েছিল সেই দুরন্ত রসায়ন?
রবিবাসরীয় সকালে সঙ্গীতের দুনিয়ায় ঘনিয়ে ওঠে শোকের ছায়া। মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আশা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। এই প্রয়াণে এক যুগের অবসান হয়েছে। অনেকেরই মনে পড়েছে দিদি লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণের পরে আশা ব্যথিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ''সবাই চলে যাচ্ছে।'' তাঁর মৃত্যুতে যেন সেযুগের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সকলের প্রস্থানই সম্পূর্ণ হল।
আরও পড়ুন:
রবিবাসরীয় দুপুর থেকেই আশা ভোঁসলেকে নিয়ে সকলে স্মৃতিচারণ করতে থাকেন। একে একে উঠে আসে নানা কথা। অল্প বয়সে বিয়ে করে আশার সংসারী হওয়া, বিয়ে ভাঙা, রাহুলের সঙ্গে প্রেম- ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি আলোচনা চলতে থাকে তাঁর শ্রেষ্ঠ গানগুলিকে নিয়েও। আর তখনই দেখা যায়, কিশোরকুমারের সঙ্গে তাঁর গানের কথা না বললে এ আলোচনা সম্পূর্ণতাই পাবে না।
বলিউডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডুয়েট-জুটি তৈরি হওয়ার অনেক আগে আশা ভয়ই পেতেন কিশোরকে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ''আমি ওঁকে খুব ভয় পেতাম। উনি আমাকে সারাক্ষণ খেপাতেন।'' সেই মিষ্টি খুনসুটির একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। একবার একটি গানে মারাঠি টানে আশা ‘এক, দো, তিন’ বলতে গিয়ে বলেন ‘দোন’। এরপর থেকে কিশোর নাকি তাঁকে 'ডন' বলে খেপাতেন।
আরও পড়ুন:
আশা ও কিশোরের উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে দুর্দান্ত লড়াইয়ের গল্পও। একবার এক রেকর্ডিস্ট তাঁদের তুমুল অপমান করে তাড়িয়ে দেন স্টুডিও থেকে। তাঁর দাবি ছিল, আশা ও কিশোর, কারও গলাই ভালো নয়! একপেট খিদে ও ভগ্ন হৃদয় নিয়ে তাঁরা সেদিন এক স্টেশনে অনেক বসেছিলেন। অপমানের জ্বালা হয়তো সেদিন তাঁদের গনগনে প্রতিভাকে আরও সেঁকে বেড়ে তুলেছিল।
তবে অপমানের ফুলকি আগুন ধরাতে পারেনি তাঁদের আত্মবিশ্বাসে। মাত্র কয়েক বছরেই তাঁরা জায়গা করে নেন প্লেব্যাকের দুনিয়ায়। কিশোর রীতিমতো খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। পিছিয়ে ছিলেন না আশাও। পরে এই বিষয়ে জানাতে গিয়ে গায়িকা বলেছিলেন, কিশোর নাকি পরে অপমান ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আশা নিরস্ত করেন তাঁকে। বোঝান, সেটা ঠিক হবে না। আসলে সেই সময়টাই ছিল খারাপ।
কিশোর সেদিন বুঝেছিলেন আশার কথা। নিজেকে সংযত রেখেছিলেন। আরও বেশি করে মনঃসংযোগ করেছিলেন গানেই। আর এর ফলও পান হাতে নাতে। ১৯৬৯ সালে 'আরাধনা' ছবি রাতারাতি কিশোরকে আরও উঁচুতে পৌঁছে দিল। পাশাপাশি আশাও ততদিনে পায়ের তলায় তৈরি করে ফেলেছেন শক্তপোক্ত জমি। সাতের দশকে দু'জনেই যেন তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে ফেলেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি।
আশা-কিশোরের ডুয়েট শ্রোতাদের কাছে শুরু থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে তা আরও জনপ্রিয় হতে থাকে। তৈরি হয় অসংখ্য সুপারহিট ও কালজয়ী গান। মাইক্রোফোনের সামনে তাঁরে কণ্ঠস্বর যেন একে অপরকে প্রেরণা জোগাত। আসলে এর নেপথ্যে ছিল ব্যক্তিগত বন্ধুতার রসায়ন। আশা একবার বলেছিলেন, খুব সিরিয়াস গান গাইবার সময়ও পরিবেশটাকে হালকা করে দিতে পারতেন কিশোরকুমার। এই হাসি-মজার ভিতরে গানটা বেরিয়ে আসত স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই।
একের পর এক হিট গান উপহার দিয়েছে এই জুটি। 'এক ম্যায় অউর এক তু', 'মেরি সোনি মেরা তামান্না', 'ইয়ে দুনিয়াওয়ালে', 'আঁখো আঁখো মে'-র মতো অসংখ্য অজস্র রোম্যান্টিক গান আজও নব্যপ্রজন্মের প্লে লিস্টে রয়ে গিয়েছে। আসলে কিশোর ও আশার কণ্ঠস্বরে একধরনের ঝকঝকে সমসাময়িকতা ও চিরন্তন প্রেমের যুগলবন্দি ছিল। সেটাই তাঁদের গানকে এতদিন ধরে জনপ্রিয় করে রেখেছে।