এক সময় ভারতীয় ক্রিকেটের মান বাঁচিয়েছিলেন, কীভাবে বিশ্বকাপের সঙ্গে জুড়ে লতা মঙ্গেশকর?
ফিরে দেখা যাক চার দশক আগের সেই স্মৃতি।
কারণ কনসার্টের পুরো পরিকল্পনা তাঁর ওপর নির্ভর করেই রচিত হয়েছিল। পর্দায় ‘৮৩’ সিনেমা আসায় অনেকের কাছে ভারতের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ বা প্রুডেনশিয়াল কাপ জয়ের স্মৃতি টাটকা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে আবার সেই ইতিহাস তৈরির কারিগরদের বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ মিলেছে। সেই সময় যাঁরা তরুণ, আজকে তাঁরা প্রৌঢ়ত্বের শেষ প্রান্তে। তাঁদের এই বিশেষ কনসার্টের উদ্যোগের বিষয়ে ধুলোমাখা স্মৃতি রয়ে গেলেও বর্তমান দিনে প্রজন্মের কাছে সেদিনের সেই...
আরও পড়ুন:
১৭ আগস্ট ১৯৮৩-তে একটি বিশেষ কনসার্ট আয়োজন করে সদ্য বিশ্বজয়ী ভারতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের কিছু আর্থিক পুরস্কার তুলে দিতে উদ্যোগী হয়েছিল তৎকালীন বিসিসিআইয়ের কর্তা-ব্যক্তিরা। কারণ সেই সময় ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের তহবিলে এত টাকা ছিল না যে, তাঁরা কপিল দেবের ছেলেদের হাতে কোনও অর্থ পুরস্কার-স্বরূপ তুলে দেবেন।
তৎকালীন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি (১৯৮২-৮৫) এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এন কে পি সালভে তাঁর জীবনীতে খেলোয়াড়দের আর্থিক পুরস্কার দেওয়ার প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘‘রাজ সিং দুঙ্গারপুর একটি চমৎকার প্ল্যান নিয়ে এসে দেখা করে জানালেন যে, দিল্লিতে লতা মঙ্গেশকরের একটি কনসার্ট আয়োজন করে টাকা তোলা যেতে পারে। এছাড়া সেই সময় বোর্ডের হাতে অন্য কোনও উপায় ছিল না। কারণ সেই সময় বোর্ডের আর্থিক অবস্থা আজকের দিনের মতো ছিল...
দুঙ্গারপুরের লেখনী থেকে জানা যায়, লতা মঙ্গেশকরের পরিবারের সঙ্গে তাঁর বাড়ির পাশে টেনিস খেলতে যাওয়ার সময় দুঙ্গাপুরের পরিচয় হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে সেরকমই কোনও একদিন লতার মুখোমুখি হয়েছিলেন রাজ সিং। মঙ্গেশকর পরিবারে চায়ের আমন্ত্রণে হাজির হয়েছিলেন দুঙ্গাপুর। পরিচয় সূত্র সেখান থেকেই শুরু। আরও পরে সত্তরের দশকে লন্ডনে লতা মঙ্গেশকরের একটি কনসার্ট আয়োজনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন রাজ সিং দুঙ্গাপুর। ফলে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দুঙ্গাপুরের ঘনিষ্ঠতা আরও...
আরও পড়ুন:
শুভ্রাংশু রায়ের লেখা থেকে জানা যায়, পরে এক রেডিও অনুষ্ঠানে লতা মঙ্গেশকর বলেছিলেন, ‘‘প্রস্তাব পাওয়া মাত্র বলেছিলাম আমি নিশ্চয় অনুষ্ঠান করব।" জানা যায় ১৭ আগস্ট সকালে দিল্লি পৌঁছান লতা। সন্ধ্যায় কনসার্টে অংশগ্রহণ করেন। সুরেশ ওয়াদেকর এবং মুকেশপুত্র নীতিন মুকেশ সঙ্গে ছিল। সেদিন রাজীব গান্ধীও কনসার্টে উপস্থিত ছিলেন। যে কথাটি লতা মঙ্গেশকর কোনও দিনই প্রকাশ্যে বলেননি যে, সেদিনের অনুষ্ঠানের জন্য লতাজি নিজে একটি টাকাও নেননি। পরে...
ঘটনাচক্রে লতা মঙ্গেশকর নিজে লর্ডসে উপস্থিত ছিলেন ফাইনাল ম্যাচে। পিটিআইকে ১৭ আগস্ট ১৯৮৩ এক সাক্ষাৎকারে লতা বলেছিলেন, “আমি লর্ডসে ফাইনাল খেলাটি দেখেছিলাম। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, আমরা দু'বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে বিশ্ব খেতাব জয়ে সমর্থ হয়েছি। খুব স্বাভাবিক কারণে এই কৃতিত্বের জন্য একজন ভারতবাসী হিসেবে আমার ভীষণই গর্ব হয়েছিল… আমি কপিল দেব ও তাঁর দলের সদস্যদের আমার হোটেলে ফাইনাল ম্যাচের আগে ডিনারে...
পরে রেডিও সাক্ষাৎকারে লতা নিউ দিল্লির তৎকালীন ইন্দ্রপ্রস্থ স্টেডিয়ামে আয়োজিত সেদিনের কনসার্টের বিষয়ে বলেছিলেন, “সেদিনের অনুষ্ঠানের সময়সীমা ছিল চার ঘণ্টা। আমার মনে আছে, কপিল দেবের সেই বিশ্ব বিজয়ী দলের প্রত্যেক সদস্যই আমার সঙ্গে স্টেজে আমার ভাই পণ্ডিত হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরের সুর করা একটি গানে গলা মিলিয়েছিল। বিশেষ করে মনে আছে কপিল দেব আর সুনীল গাভাসকর আমার ঠিক পাশে দাঁড়িয়েই গানটিতে গলা মিলিয়েছিলেন।” ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে কোনও...
লতা মঙ্গেশকরের এই কনসার্ট নিয়ে রাজধানী শহর নিউ দিল্লিতে তুমুল আগ্রহ তৈরি করেছিল। এটাও স্মরণ করার দরকার, আন্তজার্তিক ক্ষেত্রে অন্য দলগত খেলায় ’৮৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগেও বড় সাফল্য এসেছিল। ’৬২-তে ফুটবলে এশিয়ান গেমসে সোনা এসেছিল। হকিতে অলিম্পিক গেমসের কয়েকটি সোনা বাদ দিলেও ১৯৭৫ ভারত হকিতে বিশ্বকাপ জয়ী হয়েছিল। কিন্তু সেই সব সাফল্য শেষে কৃতীদের প্রাপ্তি ছিল প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি সঙ্গে চা বা ডিনার পার্টি এবং...
ক্রিকেট বিশ্বজয়ের পরে রাজধানীতে লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে ফান্ড রাইজিং কনসার্ট আয়োজন করা এবং খেলোয়াড়দের লাখ টাকা আর্থিক মূল্যে পুরস্কৃত করা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অন্য ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছিল। এদেশে ক্রিকেটের সঙ্গে বিনোদন জগতের শক্তপোক্ত গাঁটছড়া যেন সেদিনের কনসার্টের মাধ্যমে বাঁধা হয়েছিল। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে অবশ্য বোর্ডের সুসম্পর্ক আজীবন বজায় ছিল। প্রায় দুই দশক পরে, ২০০১-এ পুণে শহরে লতা মঙ্গেশকর তাঁর বাবার দীননাথ মঙ্গেশকর নামে...
লতা মঙ্গেশকরের নাম আরও অন্য খেলার সংস্থার সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন। ১৯৮৮ ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রি প্ল্যাটিনাম জুবিলি উপলক্ষে তাঁর এবং অমিত কুমার নাইটের স্মৃতি আজও কলকাতার অনেক ফুটবলপ্রেমীদের মনে টাটকা। যদিও সেটি পুরোদস্তুর পেশাদার শো ছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরের সম্পর্কের বিষয়ে আরও অনেক কিছুর উল্লেখ করা যায়।
ইন্দ্রপ্রস্থ স্টেডিয়ামের (বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী ইন্ডোর স্টেডিয়াম) সেই কনসার্টে ভারতের নাইটিঙ্গেল বিশ্বজয়ী ক্রিকেটারদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গিয়েছিলেন: ‘ভারত বিশ্ব বিজেতা’। নিউ দিল্লি-সহ ভারতজুড়ে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের টেক অফের সঙ্গে সেই কারণেই জড়িয়ে আছে লতা মঙ্গেশকরের নাম। বিসিসিআই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট সংস্থা। এই সময়কার ক্রিকেটাররা মোটা টাকা বেতন পান। অথচ আজ থেকে চার-পাঁচ দশক আগেও বাস্তবটা এমন ছিল না। তবে সব ভালোর...