রথযাত্রার মহোৎসবের একদিন আগে পুরীর জগন্নাথধামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান পালিত হয়। এটি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এই অনুষ্ঠানের নাম গুন্ডিচা-মার্জন। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের মধ্যলীলার দ্বাদশ অধ্যায়ে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী এই প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। রথযাত্রার সময় শ্রীজগন্নাথদেব গুন্ডিচা মন্দিরে আগমন করবেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং শত শত ভক্তকে সঙ্গে নিয়ে সেই মন্দির পরিষ্কার করেছিলেন। সেই আধ্যাত্মিক ঘটনা তুলে ধরলেন ভক্তি বেদান্ত রিসার্চ সেন্টারের ডিন ড. সুমন্ত রুদ্র।

আরও পড়ুন:
ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য পরম পূজ্য এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ তাঁর ব্যাখ্যায় এই বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। মূল জগন্নাথ মন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দির প্রায় দুই মাইল দূরে অবস্থিত। এটিই রথযাত্রার মূল গন্তব্যস্থল। জগন্নাথদেব রথে চড়ে সেখানে গমন করেন। তিনি কয়েকদিন সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তিনি পুনরায় মূল মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করেন। ভগবানের আগমনের পূর্বে মহাপ্রভু একটি বিষয় নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি মন্দিরের প্রতিটি কোণ নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করিয়েছিলেন। এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্যেই এক গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিহিত রয়েছে। কী সেই শিক্ষা?
শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেন যে গুন্ডিচা মন্দির ভক্তের হৃদয়ের প্রতীক। জগন্নাথদেবের আগমনের জন্য মন্দিরকে নির্মল করা প্রয়োজন। ঠিক তেমনই শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ে আসন দিতে হলে হৃদয়কে সমস্ত অনর্থ থেকে মুক্ত করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে বড় বড় আবর্জনা সরানো হয়। তা হল স্থূল অনর্থের প্রতীক। এর মধ্যে রয়েছে ভোগের বাসনা, জড় আসক্তি এবং স্বার্থপর প্রবৃত্তি। দ্বিতীয় পর্যায়ে সূক্ষ্ম ধূলিকণা অপসারণ করা হয়। তা হল গভীরতর অনর্থের প্রতীক। এর মধ্যে রয়েছে অহংকার, কপটতা, প্রতিষ্ঠার লালসা এবং সূক্ষ্ম আত্মগরিমা।

শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্রভু নিজ হাতে ঝাঁটা দিয়ে মন্দির পরিষ্কার করেছিলেন। তিনি খড়, ধুলো ও আবর্জনা সংগ্রহ করে স্তূপাকারে জমা করেছিলেন। তিনি প্রত্যেক ভক্তের কাজ নিজে পরীক্ষা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি দ্বিতীয়বারও মন্দির পরিষ্কার করিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, যাতে ক্ষুদ্রতম ধূলিকণাও অবশিষ্ট না থাকে। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি একটি বিশেষ শিক্ষা দিলেন। আধ্যাত্মিক জীবন কেবল বাহ্যিক আচরণের বিষয় নয়। এটি আসলে অন্তরের গভীর পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া।
শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেন যে গুন্ডিচা মন্দির ভক্তের হৃদয়ের প্রতীক। জগন্নাথদেবের আগমনের জন্য মন্দিরকে নির্মল করা প্রয়োজন। ঠিক তেমনই শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ে আসন দিতে হলে হৃদয়কে সমস্ত অনর্থ থেকে মুক্ত করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে বড় বড় আবর্জনা সরানো হয়। তা হল স্থূল অনর্থের প্রতীক। এর মধ্যে রয়েছে ভোগের বাসনা, জড় আসক্তি এবং স্বার্থপর প্রবৃত্তি। দ্বিতীয় পর্যায়ে সূক্ষ্ম ধূলিকণা অপসারণ করা হয়। তা হল গভীরতর অনর্থের প্রতীক। এর মধ্যে রয়েছে অহংকার, কপটতা, প্রতিষ্ঠার লালসা এবং সূক্ষ্ম আত্মগরিমা।
এই শিক্ষা মহাপ্রভুর শিক্ষাষ্টকের প্রথম শ্লোকের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। সেই শ্লোকটি হল—’চেতোদর্পণ-মার্জনম্’। এর অর্থ হল হৃদয়ের আয়নাকে পরিষ্কার করা। গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন অনুযায়ী, এই পরিশুদ্ধির প্রধান উপায় হল ভক্তিসাধনা। বিশেষত হরিনাম-সংকীর্তন এর মূল ভিত্তি। ভগবানের পবিত্র নামের কীর্তন হৃদয়ে জমে থাকা বহু জন্মের কলুষতা দূর করে। এটি হৃদয়কে ঈশ্বরচেতনার উপযুক্ত করে তোলে।
গুন্ডিচা-মার্জনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মহাপ্রভুর ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধান। তিনি প্রত্যেক ভক্তের আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ পরীক্ষা করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি একটি বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। আধ্যাত্মিক উন্নতি কেবল বাহ্যিক কর্মব্যস্ততার উপর নির্ভর করে না। এর মূলে রয়েছে আন্তরিকতা, বিনয় এবং আত্মসমীক্ষা। মন্দির পরিষ্কার করা কোনও আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এটি ছিল আত্মশুদ্ধির এক জীবন্ত শিক্ষা।

ষোড়শ শতকের পুরীর সেই ঘটনা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আধুনিক মানুষ বাহ্যিক উন্নতি, আর্থিক সাফল্য এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু অন্তরের অশান্তি, হিংসা, অসন্তোষ ও অহংকার দূর না হলে প্রকৃত শান্তি লাভ করা যায় না। মহাপ্রভুর গুন্ডিচা-মার্জন আমাদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকেই।
গুন্ডিচা-মার্জন আমাদের রথযাত্রার প্রকৃত প্রস্তুতির শিক্ষা দেয়। জগন্নাথদেবের আগমনের আগে যেমন মন্দির পরিষ্কার করা প্রয়োজন, তেমনই শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ে স্থান দিতে হবে। তার জন্য হৃদয়কেও জঞ্জালমুক্ত করা প্রয়োজন। মহাপ্রভু তাঁর নিজের আচরণের মাধ্যমে এটি বুঝিয়েছিলেন। আধ্যাত্মিক রূপান্তরের সূচনা বাহ্যিক আড়ম্বর থেকে হয় না। এর সূচনা হয় অন্তরের পরিশুদ্ধি থেকে। সেই অর্থে রথযাত্রা কেবল পুরীর রাজপথে রথের অগ্রযাত্রা নয়। এটি হল হৃদয়-মন্দিরকে ভগবানের জন্য প্রস্তুত করার এক আহ্বান।
ভক্তি ও হরিনামের মাধ্যমে মানুষের অহংকার, স্বার্থপরতা, ঈর্ষা এবং জড় আসক্তির ধুলো দূর হয়। তখন হৃদয় শ্রীকৃষ্ণের উপযুক্ত আবাসে পরিণত হয়। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের এই চিরন্তন শিক্ষায় মহাপ্রভু আমাদের একটি বিশেষ সত্য স্মরণ করিয়ে দেন। রথযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক জগন্নাথদেবের গুন্ডিচায় গমন নয়। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হল আমাদের নিজেদের আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে প্রেমময় ভক্তির পথে অগ্রসর হওয়া।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
হাবাসই নতুন কোচ ইস্টবেঙ্গলের, নয়া মরশুমে আরও সাফল্যের অঙ্গীকার মোহনবাগান প্রাক্তনীর
-
উচ্চবর্গের স্মৃতি ও নিম্নবর্গের যন্ত্রণা, দেশভাগের দোলাচল
-
বাংলায় ইস্পাত-বস্ত্র শিল্পে বড় বিনিয়োগ দুই সংস্থার! চলতি মাসেই শিলান্যাস, জানালেন শিল্পমন্ত্রী
-
‘সঙ্গে আছি, দিদিকেই ভালোবাসি’, বিতর্ক উসকে মমতাকে নিয়ে বার্তা সাংসদ শতাব্দীর!
-
বন্ধ করেছেন খাওয়াদাওয়া! ফাঁসানোর অভিযোগ তুলে টানা জেরায় কান্নাকাটি দেবরাজের