মিলানের সেই রাতটা আজও টাটকা। ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইন্টার মিলান ও শালকের ম্যাচ। প্রথম মিনিটেই শালকের গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যয়ার গোলপোস্ট ছেড়ে অনেকটা উঠে এসে বল ক্লিয়ার করেন। সেই সুযোগই কাজে লাগান ইন্টার মিলনের এক মিডফিল্ডার। বল মাটিতে পড়ার আগেই প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত এক ভলি। যা চকিতে আছড়ে পড়ল জালে। গোওওওল! ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই লং রেঞ্জ গোল ডেজান স্ট্যানকোভিচের নামে।
৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার এই ফুটবলারের নাম উঠলেই বিখ্যাত এই গোলের কথা মনে পড়ে। যাঁরা তাঁর খেলা দীর্ঘদিন ধরে দেখেছেন, তাঁদের কাছে অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়। দূরপাল্লার বজ্রগতির শটে গোল করা একপ্রকার অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছিলেন। অসাধারণ সব গোল দিয়ে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে ‘শাস্তি’ দিতে জানেন।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শিশুদের দলে বড় হয়েই তাঁর ফুটবল-যোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প। ১৯৭৮ সালে বেলগ্রেডের জেমুনে জন্ম। স্টানকোভিচের ছোটবেলা কেটেছে রাজনৈতিক চাপান-উতোরের মধ্যে।
তবে স্ট্যানকোভিচের গল্প এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শিশুদের দলে বড় হয়েই তাঁর ফুটবল-যোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প। ১৯৭৮ সালে বেলগ্রেডের জেমুনে জন্ম। স্টানকোভিচের ছোটবেলা কেটেছে রাজনৈতিক চাপান-উতোরের মধ্যে। চারদিকে অনিশ্চয়তা। এর মাঝেও অলিগলিতে ফুটবল খেলেই বেঁচে থাকার রসদ পেতেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বেড়ে ওঠা মানেই নির্মম বাস্তবতা। সেখানে শৈশবের সুখ বদলে সঙ্গী হয় গোলাগুলির শব্দ, অনিশ্চয়তা আর ভয়। একদিন সেই দিনগুলোর কথা মনে করে স্ট্যানকোভিচ বলেছিলেন, “আমি যখন নিজের ফুটবল কেরিয়ারের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বলতে পারি, আমার ফুটবলের শুরুটা আসলে ফুটসল থেকেই। তখন অবশ্য আমরা একে শুধু ‘স্ট্রিট ফুটবল’ বলতাম।”
মাত্র ১৩ বছর বয়সে রেড স্টার বেলগ্রেডে যোগ দেন। এরপর যেন একের পর এক রেকর্ড তাঁর অপেক্ষায় ছিল। ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ অভিষিক্ত খেলোয়াড়, সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা, সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়ক– সবকিছুই একে একে নিজের করে নেন। কিন্তু গল্পের টুইস্ট এখানে নয়। ভাবুন তো, একজন ফুটবলার বিশ্বকাপে খেলেছেন তিন ভিন্ন দেশের জার্সি গায়ে। শুনে মনে হতে পারে, নিশ্চয়ই তিনি বারবার নাগরিকত্ব বদলেছেন। কিন্তু না। তাঁর জীবনে এমন কিছুই ঘটেনি। ডেয়ানের গল্পটা আসলে শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়, বদলে যাওয়া এক দেশেরও গল্প। তিনি জন্মেছিলেন যুগোশ্লাভিয়ায়। কিন্তু সেই দেশ ভেঙে গেল, মানচিত্র পালটাল, নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হল। আর সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গেই বদলে গেল তাঁর জাতীয় দলের জার্সি। নাগরিকত্ব বদলানোর দরকার হয়নি। কারণ দেশটাই বদলে গিয়েছিল।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে রেড স্টার বেলগ্রেডে যোগ দেন। এরপর যেন একের পর এক রেকর্ড তাঁর অপেক্ষায় ছিল। ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ অভিষিক্ত খেলোয়াড়, সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা, সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়ক– সবকিছুই একে একে নিজের করে নেন।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বমঞ্চে পা রাখেন ডেয়ান। তখন তিনি খেলছিলেন ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোশ্লাভিয়ার হয়ে। প্রথম বিশ্বকাপেই প্রতিভার ঝলক দেখান। জার্মানির বিপক্ষে গোল করে নজর কাড়েন। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দল পৌঁছে যায় শেষ ষোলোয়। এরপর ইতিহাস আবার মোড় নেয়। যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে তৈরি হয় সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে ডেয়ান নামলেন সেই নতুন দেশের অধিনায়ক হিসেবে। যদিও আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের গ্রুপে পড়ে দল বেশিদূর এগোতে পারেনি।
ক্লাব ফুটবলেও তখন ডেয়ানের সোনালি সময়। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল করার পর ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের নজর কেড়ে নেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ইটালির লাৎসিওতে পাড়ি জমান। সেখানে শিরোপা জেতেন। ২০০৪ সালে তিনি যোগ দেন ইটালির ইন্টার মিলানে। পরে হোসে মোরিনহোর অধীনে তিনি হয়ে ওঠেন দলের অন্যতম ভরসা। ২০০৯-১০ মরশুমে ইন্টার মিলান জিতে নেয় ‘ট্রেবল’। সিরি আ, কোপা ইটালিয়া এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের অন্যতম নায়ক ডেয়ান। জেনোয়ার বিপক্ষে তাঁর দূরপাল্লার সেই দুর্দান্ত গোল আজও সমর্থকদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল করার পর ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের নজর কেড়ে নেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ইটালির লাৎসিওতে পাড়ি জমান। সেখানে শিরোপা জেতেন। ২০০৪ সালে তিনি যোগ দেন ইটালির ইন্টার মিলানে।
এরপর আসে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ। কিন্তু তার আগেই আবার বদল মানচিত্রে। সার্বিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে ডেয়ান এবার বিশ্বকাপে নামলেন সার্বিয়ার জার্সি গায়ে। অর্থাৎ, একই কেরিয়ারে তিনটি ভিন্ন দেশের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ খেলার বিরল রেকর্ড তাঁর নামে। সেই বিশ্বকাপে সার্বিয়া জার্মানিকে ১-০ গোলে হারিয়ে চমকে দিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্ব পেরনো হয়নি। তবু ডেয়ানের বিশ্বকাপ সফর ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হলেও ডেয়ান স্ট্যানকোভিচ ফুটবল ছাড়েননি। এখন তিনি সার্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রেড স্টার বেলগ্রাডের কোচ। ফুটবল ইতিহাসে বহু তারকা এসেছেন, বহু কিংবদন্তি জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু এমন ফুটবলার, যিনি নাগরিকত্ব না বদলিয়েই তিনটি ভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন, এমন উদাহরণ জুড়ি মেলা ভার।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
জোড়া চোটের ধাক্কা! টানা ব্যর্থতার মধ্যে টিম ইন্ডিয়া থেকে ছিটকে গেলেন হর্ষিত-বরুণ, বদলি কারা?
-
কম পরিশ্রমে দ্রুত কাজ সারতে চান? আপনার জন্য আদর্শ এই ৫ এআই টুল
-
ফাঁকা রাস্তায় মহিলাদের দেখলেই হস্তমৈথুন! ছাত্রীকে ‘ধর্ষণে’র চেষ্টার অভিযোগে ধৃত যুবক
-
‘মেয়ের নাম রাখুন’, বিধায়ক সৌমেনের অনুরোধে সদ্যোজাতর নামকরণ শুভেন্দুর
-
যন্তর মন্তরে ‘আরশোলা’র বিক্ষোভে ‘বেফাঁস’ মন্তব্য, অভিজিৎ দীপকের নিশানায় দিলজিৎ!
