বঙ্গ রাজনীতি অন্যতম হটস্পট নন্দীগ্রাম। আর সেই নন্দীগ্রামেই এবার বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে তৃণমূলের তুরুপের তাস পবিত্র কর। গেরুয়া গড়ে জয় পেতে কীভাবে রোডম্য়াপ সাজিয়েছেন তিনি, জানালেন সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-কে।
প্রশ্ন: অনেকেই বলেন সুনামি এলে সবকিছু তচনচ করে দেয়। আপনি বোধহয় প্রথম সেরকম তৃণমূল প্রার্থী যিনি সকাল ১১ টা নাগাদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জড়িয়ে একটি ছবি তোলেন। তার কয়েক ঘণ্টা পরই তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় আপনার নাম। যে আসন থেকে মমতা বন্দোপাধ্যায় লড়েছিলেন গত বিধানসভা নির্বাচন, সেই নন্দীগ্রামের প্রার্থী আপনি। কীভাবে সম্ভব হল?
উত্তর: দল খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে দিয়েছে। এর জন্য দলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন: আপনি বিজেপি করছিলেন। হঠাৎ কেন তৃণমূলে গেলেন?
উত্তর: আচমকা নয়, আমি তৃণমূলই করতাম।
প্রশ্ন: হ্যাঁ, ২০২০ সালে আপনি বিজেপিতে যোগ দেন। শুভেন্দু অধিকারীর আগেই।
উত্তর: হ্যাঁ, পুনরায় আমি আমার বাড়িতে চলে এসেছি। বর্তমানে নন্দীগ্রাম বিধানসভার মধ্যে বিজেপির ছোট-মাঝারি যে নেতারা আছে, তাদের ভাষাচয়ন, কুরুচিকর মন্তব্য আমাকে আঘাত করছে। কারণ মা-বোনেরা চোখের জল ফেলছে। তার কোন প্রতিকার নেই। দলীয় কাজের কর্মীরা সুযোগ না পেয়ে অকাজের মানুষরা বড় বড় কথা বলে সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, যতগুলো স্কিমের নাম বা যোজনার নাম ঘোষণা করেছে, কোনওটাই বাস্তবায়ন হয়নি। সাধারণ মানুষের জন্য আমাদের রাজনীতি করা। এই কাজ করতে গেলে আমরা যদি মানুষের কাছেই না পৌঁছতে পারি, তাহলে এরকম রাজনীতি কেন করব? সেই জন্যই আবার বাড়ি ফিরলাম।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: কেন মনে করছেন যে আপনি তৃণমূল প্রার্থী হলে নন্দীগ্রামকে জয় এনে দিতে পারবেন? কারণ শুভেন্দু অধিকারী পালটা বলছেন তিনি বিপুল ভোটে জিতবেন।
উত্তর: খুব বেশিদিন তো বাকি নেই। ৪ মে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। ভোটের দিন ৮০% চিত্র ক্লিয়ার হবে। ১০০% আমরা বিপুল ভোটে জয় লাভ করব। আমরা প্রত্যাশা করছি ৩০ হাজারের মার্জিন। তবে দিনের পর দিন যে ভাবে এগিয়ে চলছি, তাতে প্রতিনিয়ত আমাদের ব্যবধান বাড়ছে। নন্দীগ্রামে খেলা হবে।

প্রশ্ন: ঠিক কীরকম খেলা হবে?
উত্তর: বিজেপি থেকে অনেকেই আমাদের সঙ্গে চলে আসছে। মানুষ চাইছে পরিবর্তন। নন্দীগ্রামে মুক্তি চাইছে, শান্তি চাইছে।
প্রশ্ন: তাহলে ২০২১ থেকে নন্দীগ্রামে মানুষের শান্তি নেই? আপনার দলেরই তো প্রাক্তন নেতা শুভেন্দু।
উত্তর: উনি রাজ্য রাজনীতি করেন, কেন্দ্র রাজনীতি করেন। আমি নন্দীগ্রামের মাটিটা ভালো বুঝি। অলিতে গলিতে প্রতিটা পরিবার আমার আত্মীয় পরিজন। অতএব, আমার রাজনীতি করতে কোনও অসুবিধা নেই। এবং আমার প্যারালাল সংগঠনও আছে। সেই সংগঠনের দ্বারা আমি জানি ওঁকে কখন কী উত্তর দিতে হবে, কী করতে হবে।
প্রশ্ন: একই দল, শুভেন্দু অধিকারী দুই আসনেরই প্রতিপক্ষ। আপনারও, মমতা বন্দোপাধ্যায়েরও। এই বিষয়টা কীভাবে এনজয় করছেন? নাকি নন্দীগ্রামে লড়াই একটু চাপের।
উত্তর: একেবারে মিলিয়ে দেবেন না। জননেত্রী অনেক উচ্চমার্গের, উনি প্রণম্য। ওঁর সঙ্গে আমার তুলনা করা ঠিক নয়। বিরোধী দলনেতা,আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, ওনারা অনেক বড় এরিয়া নিয়ে রাজনীতি করেন। আর আমরা নন্দীগ্রাম বিধানসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাজনীতি করি। তবে আমার প্যারালাল একটা সংগঠন আছে, যে সংগঠনের জোরে শুভেন্দু অধিকারীর পরাজয় নিশ্চিত।
প্রশ্ন: আপনি সাংগঠনিকভাবে মজবুত। বয়াল এক বোয়াল দুই থেকে শুরু করে রেয়াপড়া বাদে, অধিকাংশ জায়গায় বিজেপি একটা সময় শক্তিশালী হয়েছিল। তার কারিগর নাকি আপনি। কারণ ২০২১-এ শুভেন্দু অধিকারী কম ভোটে জয়ের পেছনে আপনার হাত রয়েছে। বিজেপিকে ধাক্কা দিয়ে আচমকা সিদ্ধান্তে বদল। তৃণমূলের প্রার্থী তালিকার ঘোষণা দিন কেন মনে হল আমি কলকাতায় অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের হাত ধরে যোগ দেবেন?
উত্তর: সত্য কথা বলতে ভালোবাসি। কখনও কখনও মনে হয়েছে ওই সংসারে থাকা ঠিক হচ্ছে না। অনেক কুরুচিকর মন্তব্য, সামাজিক বিচ্ছেদের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, এটা আমার পক্ষে খুব কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চাইছিলাম।
প্রশ্ন: এই বয়সে অবসর?
উত্তর: হ্যাঁ। আমার ফ্যামিলি রাজনীতির পরিবার নয়। আমরা তো সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা। রাজনীতিটা আমাদের আবেগ। যতটুকু সময় পেয়েছি রাজনীতির কাজ করার চেষ্টা করেছি। মানুষের ভালোবাসাও পেয়েছি। কিন্তু ওই বাড়িতে ঢুকে দেখলাম যে ওখানে যেভাবে সামাজিক বিভাজন এবং সর্বোপরি কুরুচিকর কথাবার্তা, এটাই আমাকে খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে। আমি দেখলাম যে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটা যোগসাজস হল, ওঁরা আমাকে আহ্বান করলেন, আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। আমি পুনরায় লড়াইয়ের মাঠে নামলাম।
আমার ভালোবাসায় কোনও খাদ নেই। আমাকে মানুষ ভালোবাসে, আমি সম্পূর্ণরূপে মানবসেবার জন্য যতটুকু কাজ আজ পর্যন্ত করেছি, তার মধ্যে কোনওরকম কোনও কৌশল নেই।
প্রশ্ন: বিজেপির কেউ কেউ দাবি করছেন আপনি বিধায়ক হতে চান। এবং আপনার সঙ্গে একটা বিরাট রফা হয়েছে তৃণমূলের। তাই আচমকা বিজেপি ছাড়ছেন। এটা কতটা সত্যি?
উত্তর: একেবারে মিথ্যা। কোনও রফা নয়, রফা একটাই, বাংলার ভবিষ্যৎ। একটাই রফা তৃণমূল দিয়েছে, মানুষের কাজ করার প্রতিশ্রুতি। সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা।
প্রশ্ন: বিরোধীদের একাংশ বলছে, আপনি শুভেন্দু অধিকারীর টিম সম্পর্কে অনেক গোপন তথ্য জানেন। যেগুলো ফাঁস করে দেবেন। মানে ওঁর হয়ে কাজ করছে, অথচ ভোটে আপনার লাভ হবে।
উত্তর: গোপনের কিছু নেই। ওঁর ডান পাশে, বাম পাশে সামনে পিছনে যারাই আছে, তার অধিকাংশই আমার। ভোটের দিনই বুঝতে পারবেন।
প্রশ্ন: এত কনফিডেন্ট কেন আপনি?
উত্তর: কারণ আমার ভালোবাসার মধ্যে কোনও খাদ নেই। আমাকে মানুষ ভালোবাসে, আমি সম্পূর্ণরূপে মানবসেবার জন্য যতটুকু কাজ আজ পর্যন্ত করেছি, তার মধ্যে কোনওরকম কোনও কৌশল নেই।
প্রশ্ন: এবার ভোটের আগে কোনও খুনোখুনির রাজনীতি, রক্তের রাজনীতির আশঙ্কা করছেন?
উত্তর: নন্দীগ্রামবাসীর কাছে করজোড়ে অনুরোধ, শান্তি এবং সম্প্রীতি বজায় রেখে, সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিরাপদভাবে যেন নির্বাচনী বৈতরণী পার করেন। আমি হিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে। আমাদের কোনওরকম উশৃঙ্খল কর্মসূচি নেওয়ার মানসিকতা নেই। কিন্তু বিরোধী দল কী করবে, তাদের ইচ্ছা।
প্রশ্ন: বিজেপিতে থাকাকালীন আপনারাও তো বারবার বিভাজনের রাজনীতি করেছেন। এখন ভোটপ্রচারে গিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজনের কাছে ভোট চাইতে কুণ্ঠাবোধ কাজ করছে?
উত্তর: আমার একটা ফুটেজও আপনি দেখাতে পারবেন না। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা বা এইরকম ধরনের বিভাজনের মানসিকতা নিয়ে কথা বলা, কোথাও নেই। এটুকু আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি।
প্রশ্ন: কোথাও কি এখন একটু অনুশোচনা হয় যে, সত্যি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে ভুল করেছিলেন?
উত্তর: ১০০ পারসেন্ট, একুশের নির্বাচনে আমি চরম ভুল করেছি। নির্বাচনে নন্দীগ্রামের মানুষের স্বার্থে মাননীয় মানবিক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পাশে থাকা উচিত ছিল।
প্রশ্ন: আপনি বিজেপিতে থাকাকালীন বহু তৃণমূল কর্মী মার খেলো,আক্রান্ত হল। অনেক কেসে আপনার নামও জড়িয়েছে। আপনি কিছু করেছেন না করেননি, সেটা পরের বিষয়। সেটা বিচারাধীন। কিন্তু অনুশোচনা কাজ করে?
উত্তর: যেদিনই যোগদান করি, সেদিন নন্দীগ্রামবাসীর কাছে আমার পরিষ্কার বার্তা ছিল, নন্দীগ্রামকে সুস্থ এবং শান্তিতে রাখতে গেলে, এই যে মিথ্যা মামলা যা কমিউনিস্ট জমানা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত চলছে, তার শেষ হওয়া দরকার।
প্রশ্ন: দায়ী কে?
উত্তর: আমি কোনও একটা দলকে ইন্ডিকেট করতে চাই না। তবে স্পেশাল কোর্ট করে আইনি বিচার খুব দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করে, মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। হাজার হাজার কেসের মামলা ঝুলছে, যেকোনও বিধানসভার তুলনায় নন্দীগ্রাম বিধানসভার মাটিতে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক মামলা।
প্রশ্ন: বারবার অভিযোগ উঠছে, কেন্দ্রীয় বাহিনী, নির্বাচন কমিশনকে নাকি বিজেপি চালাচ্ছে। এতে প্রভাব পড়বে না?
উত্তর: প্রতিটা ভোটার ধরে ধরে যদি একটা করে সেন্ট্রাল ফোর্সও দেয়, তারপরেও নন্দীগ্রাম বিধানসভার মাটিতে তৃণমূল কংগ্রেস ৩০ হাজারের বেশি ভোটে জিতবে।
প্রশ্ন: জিতলে কী কাজ করবেন? প্রথম টার্গেট কী?
উত্তর: পাঁচ বছরে কিছুই কাজ হয়নি। কোনও উন্নয়ন হয়নি। সাধারণ মানুষ বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত হয়েছে। যোগদান করার সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল জানতে চেয়েছে, পবিত্র তোমার কী চাই? আমি বলেছি, হলদি নদীর উপর ব্রিজ। কথা দিয়েছেন- যেদিনই জয় লাভ করবে তার সাতদিনের মধ্যে ওখানে শিলান্যাস হবে।
প্রশ্ন: নন্দীগ্রামের মতো আসন থেকে জিতে যাওয়া মানে তো আপনি মন্ত্রী হচ্ছেন?
উত্তর: দলের কাছে আমার যা চাওয়া, তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি। দল যা ঠিক করবে, তাই হবে। ওটা নিয়ে আমার কোনও আশা, আকাঙ্ক্ষা নেই।
নিবেদিত


