তৃণমূল যুব সংগঠনের দু’বারের সাধারণ সম্পাদক। ডিসেম্বর, ২০২২ থেকে তৃণমূলের রাজ্য সোশাল মিডিয়া ও আইটি সেলের ইনচার্জ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনের দুই ঐতিহাসিক অধ্যায়— নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে। তিনি দেবাংশু ভট্টাচার্য (Debangshu Bhattacharya)। এবার চুঁচুড়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে লড়বেন। একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন নিজের পরিকল্পনা।
প্রশ্ন: চুঁচুড়া বিধানসভা কেন্দ্র আপনার কাছে একেবারে নতুন। জিতলে বিধায়ক হিসেবে প্রথম কাজ কী হবে?
উত্তর: ডেভেলপমেন্ট ইজ আ কন্টিনিউয়াস প্রসেস। এ তো কোনও জাদুকাঠি নয় যে ছোঁয়ালেই কাজ হয়ে যাবে। এখানকার মানুষের ছোটখাটো নানা সমস্যা রয়েছে। এখানকার সরকারি হাসপাতালের দু-চারটে বিভাগে ডাক্তারের অভাব রয়েছে। আইসিইউ-সিসিইউ বেড নিয়ে কিছু দাবি রয়েছে মানুষের। কয়েকটা ওয়ার্ডে জলনিকাশির সমস্যা। বাম জমানায় চুঁচুড়ার যে অবস্থা ছিল, গত ১৫ বছরে সে ছবি আমূল বদলেছে। সেই উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাব। আমার কাজ, রাজ্য সরকারের সঙ্গে চুঁচুড়ার মানুষের একটা সমন্বয়কারী সেতুর ভূমিকা পালন করা।
আরও পড়ুন:

প্রশ্ন: চুঁচুড়াবাসীর অন্যতম প্রধান সমস্যা নিকাশি ব্যবস্থা। এই সমস্যার মোকাবিলা কীভাবে করবেন?
উত্তর: কিছু কাজ হয় ‘ফান্ড ওরিয়েন্টেড’, আবার কিছু হয় ‘সার্ভিস ওরিয়েন্টেড’। এই ‘সার্ভিস ওরিয়েন্টেড’ বা পরিষেবাভিত্তিক কাজগুলোকে কতটা ঠিক করা যায়, সেটা আমাদের দেখতে হবে। জনবল লাগালে যে কাজ করা সম্ভব, ওইটাই আগে করব। তাতেই ৭০% সমস্যা মিটে যাবে। বাকি ২০-৩০ শতাংশ সমস্যা সমাধানের জন্য বড় কোনও প্ল্যান করতে হবে, যেমন উন্নতমানের ড্রেনেজ সিস্টেম বসানো ইত্যাদি, তার জন্য রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে কাজে নামতে হবে। নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়েও আমি ভাবি। এখানে অনেক ছোট-বড়-মাঝারি ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাঁদের নিয়ে একটা বণিক সভা গঠন করতে পারি। বাইরে থেকে যে শিল্পপতিরা আসছেন, পশ্চিমবঙ্গে এলেও যেন তাঁদের গন্তব্য হয় চুঁচুড়া, সেই চেষ্টা আমরা করব। চুঁচুড়া বিধানসভার ছেলেরা যেন এই বিধানসভাতেই কাজ করতে পারে। এখানকার কিছু স্কুলে পরিশ্রুত পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে। সেখানে অ্যাকোয়াগার্ড বসানোর ব্যবস্থা করব। লাইব্রেরিগুলোর মানোন্নয়নের চেষ্টা করব। অনেক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন:
“বামেদের উপর আমার রাগ, ওদের ভোটটা বিজেপিতে চলে যায় বলে। ওরা নিজেদের লড়াই লড়ে না কেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি এত রাগ যে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে হবে? নিজেরাই তো পার্টি লাটে তুলে দিচ্ছেন। বিজেপির কাছে বেচে দিচ্ছেন। হয়তো ভাবছে, তৃণমূল সরে গিয়ে বিজেপি এলে, অতিদক্ষিণপন্থী শক্তি এলে অতিবামপন্থী শক্তি কায়েম হবে।”
প্রশ্ন: এই বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় আড়াই লক্ষ ভোটার। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের এখানে একত্রবাস। কিন্তু এখানকার শিল্প-কৃষি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনেকের অভিযোগ, সিঙ্গুর থেকে শিল্প তাড়ানোর মূলে আপনারাই। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি তো রয়েছেই। আপনার ব্যক্তিগত চরিত্রে কালি না থাকলেও এতরকম দুর্নীতির প্রশ্নের উত্তর দেবেন কীভাবে?
উত্তর: ১৫ বছর ধরে যে সরকার চলছে, তাতে এক শতাংশ খারাপ মানুষ তো থাকবেই। মধু ফেলে রাখলে যেমন পিঁপড়ে আসে, তেমনই ক্ষমতার চতুর্দিকে প্রচুর অসাধু ব্যক্তি ভিড় করে। আমাদের কাজ, সেই অসাধু মানুষদের চিনে, তাদের ‘এলিমিনেট’ করা। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তৃণমূল তাঁকে দল–সরকার উভয় থেকেই সরিয়েছে। অন্যদিকে, শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে নারদায় ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিজেপি তাঁকে পুরস্কৃত করে বিরোধী দলনেতা বানিয়েছে। এটাই তো দুই দলের মূল পার্থক্য। নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য ছিল ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’। আপনারা ভেবেছিলেন, তিনি দুর্নীতি করতে বারণ করেছেন। তিনি আসলে বলতে চেয়েছিলেন, “খা, লেকিন হামারে পার্টি মে আকে খা!” হেমন্ত বিশ্বশর্মা যখন কংগ্রেসে ছিলেন, বিজেপি তাঁর বাড়ির সামনে ‘সারদার চোর’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসত। কিন্তু পরের (২০১৬) ইলেকশানে তিনি বিজেপিতে যোগ দিলেন। একসময় অসমের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হলেন। এখন মুখ্যমন্ত্রী। রেড্ডি ব্রাদার্স… শরৎ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার… মারা গিয়েছেন বলে আলোচনা করতে চাইছি না। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধেও ১৫ হাজার কোটি স্ক্যামের অভিযোগ ছিল। আজ তাঁকে উপ-মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে দিল। যাঁরা নিজেরা এত কালি মেখেছেন, তাঁরা আবার তৃণমূলের দিকে আঙুল তোলেন!
“রাজনীতিকে পরিবার না ভাবতে পারলে তো আমি বিজেপি হয়ে যাবো! সিপিআইএম চারদেওয়ালের ভিতর পরস্পরকে জুতো মাসে, বাইরে এসে মিষ্টি খাওয়ায়। কিন্তু আমাদের নেতারা বাংলার মানুষকে পরিবার বলে মনে করে। এ জন্যই অনেক সময় জনসমক্ষে বেফাঁস মন্তব্যও করে ফেলেন।”
প্রশ্ন: হুগলি জেলাকে ঐতিহাসিকভাবে বামেদের ‘শক্ত ঘাঁটি’ মনে করা হয়। উত্তরপাড়ায় মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মতো লড়াকু ও পরিচিত তরুণ মুখকে প্রার্থী করা হয়েছে।
উত্তর: যতই বামেদের ‘শক্ত ঘাঁটি’ বলেন, ততই ওরা জিরো পায়!
প্রশ্ন: ওরা শূন্য বলেই কি আপনার এত রাগ?
উত্তর: আমার রাগ, ওদের ভোটটা বিজেপিতে চলে যায় বলে। ওরা নিজেদের লড়াই লড়ে না কেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি এত রাগ যে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে হবে? নিজেরাই তো পার্টি লাটে তুলে দিচ্ছেন। বিজেপির কাছে বেচে দিচ্ছেন। হয়তো ভাবছে, তৃণমূল সরে গিয়ে বিজেপি এলে, অতিদক্ষিণপন্থী শক্তি এলে অতিবামপন্থী শক্তি কায়েম হবে? একেবারেই ভুল! তেমন হলে ত্রিপুরাতেও বামেরা ফিরত। বিজেপি কোনও রাজ্যে ক্ষমতায় এলে সরকারি পরিবর্তনের আগে তারা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটায়। চিকেন-মটনের ভক্ত আপনি, ওরা এমন চাপ সৃষ্টি করবে যে একসময় আপনি খেতেই ভয় পাবেন। ওরা মানুষকে এমন রোবটে পরিণত করবে যে সে ধর্মগুরুদের নির্দেশ ছাড়া চলতে পারবে না।
প্রশ্ন: চুঁচুড়া বিধানসভায় রাজনীতির ক্ষেত্রেও কিছু ব্যক্তিগত ফ্যাক্টর কাজ করেছে। অসিত মজুমদার ও রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী থেকেছেন এখানে। অসিত মজুমদার মাঝে রাগ করলেন আপনার উপর। পরে যদিও মিটমাট হল। কীভাবে সামলালেন?
উত্তর: আপনি কখনও রাগেননি কারও উপর?
প্রশ্ন: রাজনৈতিক আর পারিবারিক পরিসর কি এক?
উত্তর: রাজনীতিকে পরিবার না ভাবতে পারলে তো আমি বিজেপি হয়ে যাব! সিপিআইএম চারদেওয়ালের ভিতর পরস্পরকে জুতো মারে, বাইরে এসে মিষ্টি খাওয়ায়। কিন্তু আমাদের নেতারা বাংলার মানুষকে পরিবার বলে মনে করে। এ জন্যই অনেক সময় জনসমক্ষে বেফাঁস মন্তব্যও করে ফেলেন। আমরা ইমোশনে তৈরি রাজনৈতিক দল। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান যে চারটি রাজনৈতিক দল, তার মধ্যে একমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসই একজন বাঙালির তৈরি। আর তার মাথাতেও বসে আছেন একজন বাঙালি। কংগ্রেস মানেই তো সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী। বুঝতেই পারছেন, বাংলা অত নিতে পারবে না। বিজেপি তো ইউপি-বিহারের পার্টি, চালিত হচ্ছে গুজরাটের নির্দেশে। আর সিপিএম? তারা তো আন্তর্জাতিক দল! একমাত্র তৃণমূলনেত্রীই বাংলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিৎকার করে ফান্ড আদায় করেন। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হলে তো নরেন্দ্র মোদির সামনে গিয়ে ‘মিউ মিউ’ করেন।
প্রশ্ন: শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম, দু’টি আসন থেকে লড়বেন। তাঁকে কোনও বিশেষ বার্তা দিতে চান?
উত্তর: দু’টো সিটে দাঁড়িয়েছে মানে জোড়া রসোগোল্লা খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে! ২০১৯ সালে রাহুল গান্ধী আমেঠি এবং কেরলের ওয়ানড়— দুই কেন্দ্র থেকেই লড়েছিলেন। তখন বিজেপি বলেছিল, “রাহুল গান্ধী দো সিট পে ইসি লিয়ে লড় রহা হ্যায়, কিঁউকি রাহুল গান্ধী কো পতা হ্যায় কি, কোয়ি এক সে তো হারেগা জরুর। দো সে ভি হার সকতা হ্যায়।” আর হয়েছিলও তাই। আমেঠিতে হেরেছিলেন তিনি। শুভেন্দুও এখন সেই পথেই হাঁটছেন। ২০২১-এর নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু শুধুমাত্র নন্দীগ্রাম থেকেই লড়েছিলেন, পরে উপনির্বাচনে জিতেছিলেন। শুভেন্দু তো জিতেছিলেন ‘লোডশেডিং’ করে। সেই মামলা এখনও হাই কোর্টে পেন্ডিং। শুভেন্দু নিজেই ফেঁসে গিয়েছে। ও যে পাড়া দিয়ে যায়, ওটাই বিজেপির জন্য পোড়াতে পোড়াতে যায়। দুই সিটেই উনি হারছেন এবারেও। আমার প্রশ্ন, তারপর বিরোধী দলনেতা কে হবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই কেবলমাত্র নবান্নের ১৪ তলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারে। ওই কোমরের জোর বিজেপির কারও নেই।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
নতুন তৃণমূল আত্মপ্রকাশের পরদিনই সন্দীপনের বাড়িতে বিক্ষোভ, কাটমানি-তোলাবাজিতে সরব বিজেপি
-
আরজিকর কাণ্ড এবার বড়পর্দায়, পরিচালনায় শঙ্কুদেব পণ্ডা, ‘অভিশপ্ত’ আগস্টেই শুরু শুটিং
-
বিশ্বজয়ের ৩ মাসের মধ্যে অধিনায়কত্ব যাচ্ছে সূর্যকুমারের, নেতৃত্বের দৌড়ে আপাতত ৩
-
দিল্লির পর বিহার, বিধ্বংসী আগুন হাসপাতালে, ঝলসে মৃত অন্তত ৪
-
কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা প্রত্যাহার হুমায়ুনের, অধীর, নওশাদের উদাহরণ তুলে আদালতে যাচ্ছেন এজেইউপি নেতা
নিবেদিত


