Advertisement
Advertisement
Bengal Election 2026

মহাকাল মন্দিরের ঘোষণাতে কি বাজিমাত তৃণমূলের? শিলিগুড়িতে শংকর বনাম গৌতমের লড়াই আদতে গুরু-শিষ্যের দ্বন্দ্ব

আগামী ২৩ তারিখ শিলিগুড়িতে চতুর্মুখী লড়াইয়ে নামছেন প্রার্থীরা। ফলাফল স্পষ্ট হবে ৪ মে।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ব্যুরো
সংবাদ প্রতিদিন ব্যুরো

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২৬, ১১:২১

link
সংবাদ প্রতিদিন ব্যুরো
সংবাদ প্রতিদিন ব্যুরো

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২৬, ১১:২১

options
link
মহাকাল মন্দিরের ঘোষণাতে কি বাজিমাত তৃণমূলের? শিলিগুড়িতে শংকর বনাম গৌতমের লড়াই আদতে গুরু-শিষ্যের দ্বন্দ্ব zoom
ভোটের 'হটস্পট' শিলিগুড়ি। গ্রাফিক্স: অরিত্র দেব

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিতি তার। এখানে পৌঁছে যাওয়া মানে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াদর্শন মাত্র দুই পায়ের দূরত্ব। আবার প্রতিরক্ষার দিক থেকে ‘চিকেনস নেক’। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে নেপাল, ভুটান, চিন সীমান্ত নাগালের মধ্যে। উত্তরের পাহাড়ি এলাকায় ওঠার পথে শেষধাপের গুরুত্বপূর্ণ সমতল শহর এই শিলিগুড়ি। এই শিলিগুড়ি বঙ্গ রাজনীতিতেও বেশ বর্ণময়। বাম জমানা পতনের পরও এখানে কয়েক বছর ধরে জ্বলজ্বল করত লাল পতাকা। কালের নিয়মে লাল রং ফিকে হওয়া থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে। প্রত্যেক নির্বাচনের মতোই ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটেও (Bengal Election 2026) তাই বাংলার অন্যতম হটস্পট শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্র। আসুন, জেনে নিই এর খুঁটিনাটি।

মূলত চতুর্মুখী লড়াই শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে। তৃণমূলের প্রার্থী এখানে বর্ষীয়ান নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেব। বিজেপির বিদায়ী বিধায়ক শংকর ঘোষ ফের লড়ছেন। সিপিএম ও কংগ্রেসের হয়ে রণাঙ্গনে যথাক্রমে শরদিন্দু চক্রবর্তী ও অলোক ধাড়া।

শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে এই মুহূর্তে ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৩ হাজার ৪০৫। এই মুহূর্তে লিখলাম তার এক ও একমাত্র কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। নির্বাচন কমিশনের সেই কাজের পর বাদ পড়েছেন ২৩,৮১৫ ভোটার। কতজন এখনও বিবেচনাধীনের তালিকায়, তা জানা নেই। ভোটের (Bengal Election 2026) হাওয়া এখনও পর্যন্ত গেরুয়ার পালে হলেও, এসআইআরের কারণে সংখ্যালঘুদের অধিকাংশ বিজেপিকে নিয়ে ক্ষুব্ধ। তৃণমূলের ভাষ্য স্বীকার করে তাঁরাও মনে করেন, নাম বাদের নেপথ্যে বিজেপির ষড়যন্ত্র আছে। আগামী ২৩ এপ্রিল ভোট। মূলত চতুর্মুখী লড়াই শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে। তৃণমূলের প্রার্থী এখানে বর্ষীয়ান নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেব। বিজেপির বিদায়ী বিধায়ক শংকর ঘোষ ফের লড়ছেন। সিপিএম ও কংগ্রেসের হয়ে রণাঙ্গনে যথাক্রমে শরদিন্দু চক্রবর্তী ও অলোক ধাড়া। লড়াই কতটা জমবে, তা বোঝার আগে একবার শিলিগুড়ি রাজনৈতিক ইতিহাসটা ঝালিয়ে নেওয়া যাক।

Advertisement

শিলিগুড়ি (Siliguri) আসন বরাবর বিরোধীদের ঘাঁটি। একসময় লাল দূর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন তা গেরুয়া শিবিরের দখলে। ২০১১ সালে গোটা রাজ্যে পালাবদল হলেও শিলিগুড়ি আসনে জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছিল সিপিএম। প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা অশোক ভট্টাচার্য জিতে বিধায়ক হন। ২০১৬ সালেও তিনি জিতেছিলেন তৃণমূলের প্রার্থী, খ্যাতনামা ফুটবলার বাইচুং ভুটিয়াকে হারিয়ে। ২০২১ এ অবশ্য অশোক ভট্টাচার্য হেরে যান একদা শিষ্য, পরে বিজেপিতে যোগদানকারী শংকর ঘোষের কাছে। একুশে শিলিগুড়ির বিধায়ক হন শংকর।

সম্প্রতি রামনবমী, হনুমান জয়ন্তীর উদযাপন দেখে বিজেপি আর তৃণমূলের ফারাক করা প্রাথমিকভাবে বেশ কঠিনই হয়েছিল। হনুমান জয়ন্তীতে শিলিগুড়ির তৃণমূল বিধায়ক গৌতম দেব শুধু ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানটুকুই যা উচ্চারণ করেননি। এছাড়া হলুদ পাগড়ি বেঁধে গোটা শহর পরিক্রমা থেকে প্রসাদ বিলি, বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা – সবটাই তিনি করেছেন এবার প্রথম। চমক ছিল আরও। কমিউনিজম সুলভ নাস্তিকতা ভুলে সিপিএম প্রার্থীও ওইদিন মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়েছিলেন। দিনের আলোয় এসব দৃশ্যে স্পষ্ট, কীভাবে ধীরে ধীরে শিলিগুড়ির রাজনীতিতে বদল হচ্ছে।

BJP MLA Shankar Ghosh suspended from WB assembly
২০২১ সালের ভোটে জিতে বিধায়ক হন বিজেপির শংকর ঘোষ। ২০২৬-এও তিনিই বিজেপির প্রার্থী। ফাইল ছবি

সে অর্থে শৈলশহর শিলিগুড়ি জয় এখনও অধরা রাজ্যের শাসকদলের কাছে। ২০১১ সালে আজ পর্যন্ত শিলিগুড়ির রাজনৈতিক মহলের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, এ শহরের রং লাল থেকে ক্রমে গেরুয়া হয়েছে। আর হাওয়া বুঝে ইদানিং ঘাসফুল শিবিরও নরম হিন্দুত্বে শান দিয়েছে। দার্জিলিংয়ে পাহাড়ের উপর মহাকাল মন্দির কেনই বা সমতলে থাকবে না? এই ভাবনা থেকে শিলিগুড়িতেও মহাকাল মন্দিরের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এছাড়া সম্প্রতি রামনবমী, হনুমান জয়ন্তীর উদযাপন দেখে বিজেপি আর তৃণমূলের ফারাক করা প্রাথমিকভাবে বেশ কঠিনই হয়েছিল। হনুমান জয়ন্তীতে শিলিগুড়ির তৃণমূল বিধায়ক গৌতম দেব শুধু ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানটুকুই যা উচ্চারণ করেননি। এছাড়া হলুদ পাগড়ি বেঁধে গোটা শহর পরিক্রমা থেকে প্রসাদ বিলি, বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা – সবটাই তিনি করেছেন এবার প্রথম। চমক ছিল আরও। কমিউনিজম সুলভ নাস্তিকতা ভুলে সিপিএম প্রার্থীও ওইদিন মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়েছিলেন। দিনের আলোয় এসব দৃশ্যে স্পষ্ট, কীভাবে ধীরে ধীরে শিলিগুড়ির রাজনীতিতে বদল হচ্ছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই বদল আরও নজরকাড়া।

রামনবমীতে প্রচারে বেরিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানে শিলিগুড়ি মাতালেন তৃণমূল প্রার্থী গৌতম দেব, বিজেপির শংকর ঘোষকে টেক্কা। ফাইল ছবি

শিলিগুড়ি পুরনিগম এখন তৃণমূলের দখলে। মেয়র রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেব। ৪৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৩টি শিলিগুড়ি আসনের মধ্যে। বাকি আসন ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির অধীনে। শিলিগুড়ি আসনের অধীন ৩৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৩টি তৃণমূলের দখলে। এছাড়া ৫টি বিজেপি, সিপিএম ৪টি এবং কংগ্রেসের দখলে ১টি।

অন্যদিকে, শিলিগুড়ি পুরনিগম এখন তৃণমূলের দখলে। মেয়র রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেব। ৪৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৩টি শিলিগুড়ি আসনের মধ্যে। বাকি আসন ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির অধীনে। শিলিগুড়ি আসনের অধীন ৩৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৩টি তৃণমূলের দখলে। এছাড়া ৫টি বিজেপি, সিপিএম ৪টি এবং কংগ্রেসের দখলে ১টি।

বিরোধীদের দখলে থাকা শিলিগুড়ি বিধানসভা এলাকায় কতটা উন্নয়ন হয়েছে, তা নিয়ে অবশ্য প্রচুর প্রশ্ন আছে। পার্কিং ব্যবস্থা থেকে জল জমা, বেহাল নিকাশি থেকে পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহ – প্রাথমিক নাগরিক পরিষেবাই এখানে নড়বড়ে বলে অভিযোগ। কয়েক পশলা বৃষ্টিতে এ শহরের হাবুডুবু দশা একেবারে জ্বলন্ত সমস্যা। রাস্তার পাশে ডাঁই হয়ে থাকা জঞ্জাল, পুঁতিগন্ধময় পরিবেশে নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত। তার উপর নিয়মিত পানীয় জল পাওয়া এখনও দুষ্কর। বেড়েছে বেআইনি বহুতল ও অন্যান্য নির্মাণ। টোটোর দখলে পথে চলাই দায়। ফুটপাত দখল করে দিব্যি অবৈধ ব্যবসার রমরমা। তীব্র যানজট এই শহরের নিত্যসঙ্গী। বেড়ে চলা চুরি ছিনতাই, মাদকের বেআইনি কারবার নিরাপত্তার প্রশ্ন উসকে দিয়েছে। এছাড়া জমি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য, প্রমোটার রাজ নয়া সমস্যা শিলিগুড়িবাসীর। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে, ২০২৪ সালে শালুগাড়া, মাটিগাড়ায় রামকৃষ্ণ মিশনের জমিতে মাফিয়াদের দাপট, ভুয়ো কাগজ দেখিয়ে জমিদখলের চেষ্টার অভিযোগে শোরগোল ফেলার মতো ঘটনা। মহানন্দা, ফুলেশ্বরী, জোড়াপানি নদীর চর দখলের পাশাপাশি বেড়ে চলা বায়ুদূষণ বাড়তি বিপদ। 

West Bengal Assembly Election: Goutam Deb won’t contest from Dabgram-Fulbari
শিলিগুড়ির তৃণমূল প্রার্থী গৌতম দেব। ফাইল ছবি

ভোটের লড়াইয়ের মুখে সমস্যা সমাধান নিয়ে কী বলছে বিভিন্ন শিবিরের প্রার্থীরা? তৃণমূল প্রার্থী তথা শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র গৌতম বলছেন, ”পুরনিগম প্রচুর কাজ করেছে। তিনবেলা আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। নতুন সাজে সেজেছে ইন্ডোর স্টেডিয়াম, তৈরি হয়েছে নিকাশি নালা, রাস্তা, কালভার্ট। আরও অনেক কাজ চলছে। বিধানসভাতেও তৃণমূল এলে উন্নয়নের কাজ আরও গতি পাবে। শিলিগুড়িবাসী আরও নাগরিক পরিষেবা পাবেন।”

অতীত বলছে, এসআইআর কাঁটা যতই থাক, শিলিগুড়ি এবারও বিরোধী দুর্গ হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করবে। আর ট্রেন্ড বলছে, মেয়র হিসেবে গৌতম দেবের কাজ ও সেইসঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক ধর্মীয় উৎসব পালন তৃণমূলকে খানিকটা হলেও এগিয়ে রাখছে। সিপিএম, কংগ্রেসের সম্ভাবনা কতটা?

যদিও বিজেপি প্রার্থী শংকর ঘোষের কথায়, ”উন্নয়নের কোনও কাজ এখানে হয়নি। শহরবাসী সমাজবিরোধীদের দাপটে নাজেহাল। নিরাপত্তা বলে কিছুই নেই। বর্ধমান রোডে কয়েক বছর থেকে চলছে উড়ালপুলের কাজ আজও শেষ হয়নি। যানজট বেড়েই চলেছে। বেড়েছে দূষণের সমস্যা। রাজ্য সরকারের অসহযোগিতায় বিধায়ক তহবিলের টাকায় পরিকল্পিত উন্নয়নের কাজ করা সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনকে আন্তর্জাতিকমানের স্টেশনে উন্নীত করেছে। চলছে হাইওয়ে নির্মাণের কাজ।”

বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রচারে শিলিগুড়ির সিপিএম প্রার্থী শরদিন্দু চক্রবর্তী। নিজস্ব ছবি

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, গত ৫ বছর তো শিলিগুড়ির বিধায়ক ছিলেন শংকরই। তিনি কেন অসমাপ্ত কাজ করতে পারেননি? আর ঠিক এই জায়গাতেই তৃণমূল-বিজেপির বিরোধিতায় শান দিয়েছেন সিপিএম প্রার্থী শরদিন্দু চক্রবর্তী। তাঁর অভিযোগ, সকলেই বিধায়ক হিসেবে শুধু ক্ষমতা জাহির করেছেন। কেউ কোনও কাজ করেননি। সিপিএম ক্ষমতায় এলে শুধু জনতার পরিষেবার কাজই করবে। কংগ্রেসের অলোক ধাড়ার মতে, শিলিগুড়ি শহর এখনও নানা দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। তাঁর প্রতিশ্রুতি, কংগ্রেস জিতলে ন্যায়ের পথে তৈরি হবে নতুন শিলিগুড়ি।

শিলিগুড়িতে প্রচার কংগ্রেস প্রার্থী অলোক ধাড়ার। নিজস্ব ছবি

অতীত বলছে, এসআইআর কাঁটা যতই থাক, শিলিগুড়ি এবারও বিরোধী দুর্গ হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করবে। আর ট্রেন্ড বলছে, মেয়র হিসেবে গৌতম দেবের কাজ ও সেইসঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক ধর্মীয় উৎসব পালন তৃণমূলকে খানিকটা হলেও এগিয়ে রাখছে। সিপিএম, কংগ্রেসের সম্ভাবনা কতটা? এলাকাবাসীর মতে, দুই দলই কিছুটা ভোট টানতে সক্ষম হবে। অশোক ভট্টাচার্যের মতো প্রবীণ সিপিএম নেতা নিজে যদি ফের প্রচারে সক্রিয় হয়ে নামেন, তাহলে কোথাও কোথাও লাল পার্টির ভোটব্যাঙ্কে যৎকিঞ্চিত সঞ্চয় হতে পারে। এর বেশি কিছু নয়। তবে সব উত্তরই মিলবে আগামী ৪ মে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.