আমাদের প্রজন্মের যেন উভয় সংকট। অভিভাবকের মন ভালো করে দেওয়ার মতো কিছু করে ফেললে শুনি, ‘তুই ব্যতিক্রম বলেই পারলি। তা না হলে তোদের জেনারেশনে এমন বাধ্য ছেলেমেয়ে মেলা ভার।’ প্রতিবাদ করলে শুনি, ‘সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি। তোদের বয়স তো আমরাও পেরিয়ে এসেছি, কই আমাদের তো হয়নি ডিপ্রেশন ! সব ফোন ঘাঁটার ফল। প্রজন্মটাই নিকৃষ্ট।’ একটা গোটা প্রজন্মকে প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করা হোক বা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলা, ‘তোদের এত জেন জি টার্ম বুঝি না বাবা’- ফিরে ফিরে আসে এক বিচ্ছিন্নতার বোধ, এলিয়েনেশন। আমরা বোধহয় মজ্জাগতভাবে ‘আলাদা’। লিখছেন রঞ্জাবতী চট্টোপাধ্যায়।
যেমন ‘আলাদা’ ২০২৬ সালের ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট বিল পাশ হওয়ার পর বহু ভারতীয় যাঁদের যৌন ও লিঙ্গ পরিচয় এখন নির্ণয় করবেন কোনো অপরিচিত, সম্ভবত সিসজেন্ডার ডাক্তার। ট্রান্সজেন্ডার মানুষের স্বকীয়তার কোনো মূল্য নেই রাষ্ট্রের কাছে, কেবল আছে তাঁদের দুই উরুর মাঝের গোপন রহস্য যা স্থির করবে তাঁরা নাগরিক কিনা, ভোটাধিকার থাকবে কিনা।
আরও পড়ুন:
ছোটোবেলায় ঠাকুমা-দিদিমারা গল্পের ছলে শিখিয়েছেন, ধর্ম আমাদের সমৃদ্ধ করে। একা পথ হাঁটার সাহস জোগায়। বড়ো হয়ে দেখি সৃষ্টির দিক থেকে টেনে-হিঁচড়ে ধর্মকে আনা হয়েছে ধ্বংসের রাস্তায়। বছর দুই আগেকার কথা। একদিকে জলকষ্টে মানুষ মরছে, অন্যদিকে বহু কোটি টাকা ব্যয় করে সৃষ্টিকর্তা প্রতিষ্ঠিত হলেন নিজ মন্দিরে। এসব দেখে জেন জি-ও কিন্তু হাত বাড়ায় বাঙালি-চেতনার চূড়ান্ত আশ্রয় রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্তরের দিকেই। মনে পড়ে যায়
‘…কিন্তু দারুণতম যে মৃত্যুবাণ নূতন তৈরি হল,
ঝক্ঝক্ করে উঠ্ল নরঘাতকের হাতে,
পূজারী তাতে লাগিয়েছে তাঁরই নামের ছাপ
তীক্ষ্ণ নখে আঁচড় দিয়ে।
খৃস্ট বুকে হাত চেপে ধরলেন;
বুঝলেন শেষ হয় নি তাঁর নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুর মুহূর্ত,
নূতন শূল তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞানশালায়,
বিঁধছে তাঁর গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে।…’
সৃষ্টিকর্তার মোহন্তরা যদি একবার সময় করে ‘রামায়ণ’খানা পড়ে ফেলে তাহলে স্বৈরশাসন চালাতে বিবেকে বাধবে নিশ্চয়ই। অবশ্য ধর্মান্ধর ইনবিল্ট বিবেককে রিসেট করা সহজ কাজ না। তাদের কাছে আমাদের কৃত্তিবাস ওঝাও বেজায় শক্ত বোধ হতে পারে যাঁর কাব্যের নায়ক আমাদের বাবা-কাকাদের মতোই সাদামাটা বাঙালি। তবু যদি কোনোভাবে ঠুলিটা খুলে যায়, তাহলে এক-পৃথিবী যুদ্ধের মাঝে দুটি মানুষকে প্রেম করতে দেখলে তাদের চুনকালি নয়, রাশি রাশি ফুল এনে দিতে ইচ্ছে করবে হয়তো।
ভারতবর্ষ হিন্দুরাষ্ট্র হলে সব্বাই খেতে পাবে ? ইশকুলে যাবে ? মিথ্যেরও সীমা থাকা উচিত। যদি এখনই রাষ্ট্রনায়কদের দেশের মানুষকে খেতে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে, এই বিরাট বিপ্লবটি ঘটানোর দায়বদ্ধতা থাকে, তবে ভোট অবধি অপেক্ষা কীসের ? মানুষের মৌলিক চাহিদাও কি ভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে যে ভোটে জিতলে তবেই মনুষ্যত্বের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে ? এমন পৈশাচিক সরকারের কি আদৌ প্রয়োজন আছে আমাদের ?
ভারতবর্ষ হিন্দুরাষ্ট্র হলে সব্বাই খেতে পাবে ? ইশকুলে যাবে ? মিথ্যেরও সীমা থাকা উচিত। যদি এখনই রাষ্ট্রনায়কদের দেশের মানুষকে খেতে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে, এই বিরাট বিপ্লবটি ঘটানোর দায়বদ্ধতা থাকে, তবে ভোট (West Bengal Assembly Election) অবধি অপেক্ষা কীসের ? মানুষের মৌলিক চাহিদাও কি ভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে যে ভোটে জিতলে তবেই মনুষ্যত্বের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে ? এমন পৈশাচিক সরকারের কি আদৌ প্রয়োজন আছে আমাদের ?
চার থেকে পা হড়কে দুনিয়ার ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি এখনও নাগরিকের বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে কোনো বিষয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা অধ্যয়ন। পরীক্ষা পরীক্ষা, তোমার মন নেই সিমেস্টার ! আমাদের রাজ্য জুড়েও চাকরি নিয়ে হাহাকার। উচ্চশিক্ষিত, যোগ্য প্রার্থীদের চাকরি নেই, এই দায় কার ? প্রতি বছর যথাসময়ে চাকরির পরীক্ষা নেওয়া হোক, ন্যায্য উপায়ে চাকরি দেওয়া হোক। গিগ শ্রমিকদের সবরকম সুরক্ষার দায় নিক সরকার।
মেয়েদের নিরাপত্তা রক্ষা করা হোক সরকারের প্রধান কর্তব্য। শুধু ক্যামেরা বসানো নয়, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক মানসিকতার বদল দুইয়েরই ব্যবস্থা করুক মানুষের নির্বাচিত সরকার। যৌনকর্মী হওয়া অথবা খাটো ঝুলের স্কার্ট যৌন হেনস্থাকে লঘু করতে খোঁড়া অজুহাত বন্ধ হোক। ইউটিউব জুড়ে রয়েছে একাধিক রাজনীতিকের মন্তব্য। কেউ বলেছেন অত রাতে বেরোনো ভুল, কেউ প্রশ্ন তুলেছেন জামার খোলা বোতাম অথবা ঠোঁটের গাঢ় রং নিয়ে। চাই না এমন ভিডিও। মিম হিসেবেও না। ঘেন্না করি আমরা এমন রসিকতাকে।
এবার জেন জি ভোট দেবে নিজেদের অস্তিত্বের পক্ষে। অবশ্য ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে আমরা সন্দিহান। ইতিহাস সাক্ষী, এই উদ্বেগ অকারণ নয়। যাঁদের পরিবার প্রতি ভোটে সরকার বেছে নিয়েছেন, আজ এস. আই. আর-এর কারণে তাঁদের অনেকেরই ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে। নাগরিকতার কী হবে খোদায় মালুম। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে ভোটের দুদিন আগে অব্দি ট্রাইবুন্যালের ছাড় পেলে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যাবে। কিন্তু ট্রাইবুন্যালের কাজে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে তো ? নাকি এও আদতে ধ্বংসস্তূপ ঢেকে দেওয়া গোলাপি কুয়াশা ?
এবার জেন জি ভোট (West Bengal Assembly Election) দেবে নিজেদের অস্তিত্বের পক্ষে। অবশ্য ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে আমরা সন্দিহান। ইতিহাস সাক্ষী, এই উদ্বেগ অকারণ নয়। যাঁদের পরিবার প্রতি ভোটে সরকার বেছে নিয়েছেন, আজ এস. আই. আর-এর কারণে তাঁদের অনেকেরই ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে। নাগরিকতার কী হবে খোদায় মালুম। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে ভোটের দুদিন আগে অব্দি ট্রাইবুন্যালের ছাড় পেলে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যাবে। কিন্তু ট্রাইবুন্যালের কাজে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে তো ? নাকি এও আদতে ধ্বংসস্তূপ ঢেকে দেওয়া গোলাপি কুয়াশা ?
সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রে আমরা কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তির অধীনে থাকতে বাধ্য নই। কিল মারার গোসাঁই কে চায় ! ক্ষমতা থাকলে সব মানুষের দুবেলা খাওয়ার বন্দোবস্ত করুক। কে কী খাব সেটা নিয়ে কারুর মতামতের প্রয়োজন নেই। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের মধ্যে দাঙ্গা লাগানো সহজ, যেমন সহজ ভোটের (West Bengal Assembly Election) আগে টুক করে একটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। স্টান্ট দিয়ে যদি দেশ চালানো যেত তাহলে রজনীকান্ত একাই একশো ছিলেন।
আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ জারি আছে আজও। মানুষের বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে সরকার চলছে। এই পুতুলখেলার পেছনে নখ-দাঁত বের করা মনুবাদীদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। রাষ্ট্র চাইলে এখনই ধ্বংস করে দিতে পারে আমাদের প্রজন্মকে।
বিবর্তনের সহজ সত্য, ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’। আমার প্রজন্মের প্রতিটি মানুষ আপ্রাণ লড়ছি নিজের শর্তে বাঁচতে। কারুর মনে হতে পারে আমাদের সমস্ত আবেগই লাগামছাড়া। সমস্ত চাহিদাই আদতে ছেলেমানুষি, অবুঝপনা। কিন্তু আমরা এমনই।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘স্মৃতিভ্রংশে’ ভুগছিল চ্যাটজিপিটি, সতর্ক ওপেনএআই, এবার আপনাকে ভুলবে না চ্যাটবট!
-
শেষ সূর্য জমানা! ভারতের নতুন টি-২০ অধিনায়ক শ্রেয়স, প্রথমবার জাতীয় দলে বৈভব
-
আউট হয়েও বাঁচলেন ‘ধুরন্ধর’ রাহুল! ‘ওকে অস্কার দাও’, বললেন প্রাক্তন ক্রিকেট তারকা
-
শওকত মোল্লাই ‘মূল সন্দেহভাজন’, ভাঙড়ে বিস্ফোরণ কাণ্ডে বিবৃতি জারি এনআইয়ের
-
‘পশ্চিমবঙ্গে ডিম এখন খুব সস্তা’, চড়া সুর যশের, বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই ‘জেগে উঠলেন’?
নিবেদিত


