প্রিয় পোশাক শাড়ি। ফিটনেস ফ্রিক। এনার্জি টইটম্বুর। বাঞ্জি জাম্পিংয়ে সিদ্ধপদ! ভোটের প্রচারে বেরিয়ে, হাঁটেননি, প্রায় দৌড়েছেন। হাঁটায় সম্ভবত তাঁর কোনও কুশলতা নেই। কীসের তাড়া কে জানে! একে বেজায় গরম, তায় এমন হুড়োতাড়া। কর্মোদ্যোগ না কথার দম– কোন ভাগে ফেলবেন শ্রেয়া পাণ্ডেকে (Shreya Pande)? নাকি তিনি এই দুয়ের যৌথতা মিলিয়ে গড়ে ওঠা কোনও আজব অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক প্রোডাক্ট! ’২৬ সালের বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়েছেন মানিকতলা থেকে। বলা বাহুল্য, সাধন পাণ্ডে-সুপ্তি পাণ্ডের সফল উত্তরাধিকারী। কিছুকাল অভিনয়ও করেছেন, কিন্তু প্রচারে নেমেও তাঁর গ্ল্যামার একচুল মার যায়নি। মানিকতলার রোদ কি বাকি কলকাতার থেকে আলাদা– আবহাওয়া অফিসকে এ প্রশ্ন সসন্দেহ করতে চাই!
জাঁদরেল সাংবাদিককে প্রতিপ্রশ্নে ঘাবড়ে দিতে একচুল ডরান না। তিনি কতটা কনফিডেন্ড, এ প্রশ্ন করায়, ক্যামেরাকে তাঁর দিকে ফোকাস করতে বলে জানান, ‘কী মনে হচ্ছে মুখ-চোখের অভিব্যক্তি দেখে?’ এমনভাবে প্রেস কনফারেন্স সম্ভবত ক্যাপ্টেন কুল এম. এস. ধোনি ছাড়া আর কাউকে করতে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। তবে, সবসময়ই যে তিনি এমন দাপুটে, তাও নন। এক সাংবাদিকের কাছেই সলজ্জ স্বীকার করেছেন, তাঁর প্রিয় রং লাল। মনখারাপ-টারাপ হলে নিঃসন্দেহে তিনি লাল বেছে নিতে পারেন। কূট রাজনৈতিক পাঠকরা, নিশ্চিতভাবেই এখান থেকে গূঢ়তর ও গুরুতর ইঙ্গিত খোঁজার চেষ্টা করবেন, কিন্তু শ্রেয়া সে ব্যাপারেও আগাম সতর্কতা দিয়ে রেখেছেন যে, লাল স্রেফ রং হিসেবেই অতি পছন্দের। অতএব, বিতর্কের সহজ অবসান! শ্রেয়াকে যখনই ভোটের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তিনি সাফ জানিয়েছেন ভোটের লড়াই নিয়ে তাঁর কোনও টেনশনই নেই। তবে দায়িত্ব রয়েছে। যে পথ গড়ে দিয়ে গিয়েছেন তাঁর পূর্বসূরিরা, সেই পথেই হাঁটতে চান। সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহ তো রয়েইছে।
আরও পড়ুন:
একজন সচেতন নাগরিক, সমাজসেবী হিসেবে, প্রার্থী হওয়ার অনেক আগেই শ্রেয়া পাণ্ডে মানুষের জন্য কাজ করে চলেছিলেন। সম্ভবত এই কারণেই, তাঁর মা সুপ্তি পাণ্ডে খানিক গর্বভরা গলায় বলতে পারেন, ‘শ্রেয়া ঝাঁকের কই নয়।’
কিন্তু কে না জানে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া তেমন কাজের কথা না। তৃণমূল সরকার যখন ক্ষমতায় এল, তখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কনফিডেন্সও ছিল আকাশছোঁয়া। বামেদের থেকে তিনি এইটুকু অন্তত শিখে নিতে পারেন, বিশেষ করে তাঁর প্রিয় রং যেহেতু লাল!
কীরকম নেত্রী শ্রেয়া? যখন তিনি আদৌ প্রার্থীই নন, তখনকার একটা ঘটনা না বলে পারছি না। ২০২১ সালের ইয়াশ ঘূর্ণিঝড়ে, যখন পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকাগুলি প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, বিশেষ করে সুন্দরবন– তখন উল্টোডাঙা থেকে লোকনাথ দাস নামক এক তৃণমূল কর্মী দুর্গতদের পাশে থাকতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন এই ঝঞ্ঝায়। লোকনাথের সঙ্গে ছিল দুর্গতদের জন্য ত্রাণ। লোকনাথ দাসের দুই সন্তানের দায়িত্ব তখন নিয়েছিলেন শ্রেয়া পাণ্ডে। মনে রাখবে হবে, লোকনাথ দাসের পরিবারে তিনি ছাড়া আর কেউ-ই উপার্জনক্ষম ছিলেন না। একজন সচেতন নাগরিক, সমাজসেবী হিসেবে, প্রার্থী হওয়ার অনেক আগেই শ্রেয়া পাণ্ডে মানুষের জন্য কাজ করে চলেছিলেন। সম্ভবত এই কারণেই, তাঁর মা সুপ্তি পাণ্ডে খানিক গর্বভরা গলায় বলতে পারেন, ‘শ্রেয়া ঝাঁকের কই নয়।’
গতবারে মা, তারও আগেরবারে বাবা– রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বলছে, দু’বারই পাণ্ডেরা কামাল করেছেন। যদিও বিরোধীরা আক্রমণ করতে ছাড়েনি। বলেছেন এ তো আজব ‘পরিবারতন্ত্র’। কিন্তু শ্রেয়াও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। তিনি বলেছেন, অন্য লোকজন সেরকম পরিবারে জন্মাননি, তাঁদের বাবা-মায়েরা সেরকম কাজ করেননি তো আমি কী করতে পারি! কাউন্টার হিসেবে ফচাং করে এ কথা বেরিয়ে গিয়েছে বটে, কিন্তু এ কি কোনও যুক্তিযুক্ত কথা হল? কারও বাবা-মা কিংবা আত্মীয়স্বজন যদি তেমন কিছু ‘করে উঠতে’ না-ও পারেন, তাঁর রাজনৈতিক ক্ষুধা যথেষ্টই থাকতে পারে। এমন যুক্তি দেখালে বিরোধীরা বরং বঙ্গরাজনীতির নেপো কিড হিসেবে তাঁকে দাগিয়ে দিতেই পারে। এমনকী, বাংলার সেই প্রবাদ– নেপোয় মারে দই-ও, সেক্ষেত্রে ব্যবহার হলে অবাক হব না।
মানিকতলার ১২ নম্বর ওয়ার্ডে এই বাংলা নববর্ষের মূল থিম ছিল ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। এমনকী, একজন আস্ত মাছ বিক্রেতা রুই-কাতলা-ইলিশ-চিংড়ি নিয়ে দিব্যি দোকান সাজিয়ে বসেছিলেন। শ্রেয়া পাণ্ডে এই অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে বলেছেন, ‘বাঙালি মানেই মাছ। এটা আমরা সবসময় খাই। যারা অন্য সংস্কৃতিকে বিশ্বাস করে না। যারা একদম বাংলাকে চেনে না তারা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন।’
‘নিপাট বাঙালি’ বলতে যা বোঝায়, শ্রেয়া পাণ্ডে তাই। কিন্তু কথা হল ‘নিপাট বাঙালি’ কথাটি কি আজকের দিনে ‘রাজনৈতিক’ নয়? যেভাবে রাজ্য ও দেশ জুড়ে বাঙালি-প্রবাসী বাঙালিকে অপমান করা হচ্ছে নানা প্রকারে, যেভাবে বাঙালির খাদ্যাভাস বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেভাবে বাংলা বললেই শুনতে হচ্ছে ‘বাংলাদেশি’– সেই পরিস্থিতিতে একজন বাঙালি যদি নিজের ‘নিপাটত্ব’ বজায় রাখতে পারে, তাহলে তাই-ই হয়ে একটা রাজনৈতিক লড়াই। শ্রেয়া পাণ্ডে আপাদমস্তক সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছেন বাঙালি অস্মিতার পক্ষ নিয়েই। মানিকতলার ১২ নম্বর ওয়ার্ডে এই বাংলা নববর্ষের মূল থিম ছিল ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। এমনকী, একজন আস্ত মাছ বিক্রেতা রুই-কাতলা-ইলিশ-চিংড়ি নিয়ে দিব্যি দোকান সাজিয়ে বসেছিলেন। শ্রেয়া পাণ্ডে এই অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে বলেছেন, ‘বাঙালি মানেই মাছ। এটা আমরা সবসময় খাই। যারা অন্য সংস্কৃতিকে বিশ্বাস করে না। যারা একদম বাংলাকে চেনে না তারা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন।’
এত কিছুর পরও, মনে রাখতে হয়, শ্রেয়া সিঙ্গল মাদার। সন্তানের নাম আদর। এত রাজনৈতিক কাজ, সেবামূলক কাজ, ক্যামেরা-প্রচার-সাক্ষাৎকার পেরিয়ে টুকরো সময় থাকে সন্তানের জন্য। হয়তো খুব দীর্ঘ সময় নয়, কিন্তু ছোট্ট, বড় আদরের সময়। রাতের ঘুমটুকু একসঙ্গেই। একদিন মায়ের ছবি দেওয়া প্ল্যাকার্ড ছোট্ট আদরের বালিশে রাখা ছিল, শ্রেয়ার অনুপস্থিতিতেই।
পরিবার, বৃহত্তর পরিবারের মানিকতলা– দু’দিকই সামলে, নিজের প্রতি বিরোধীদের আক্রমণ সামলে নিয়েও যে নিরন্তর আত্মবিশ্বাসী– সে-ই তো স্কিপার। ৪ মে, আবির খেলার মধ্যে কি আদরও উপস্থিত থাকবে না? উত্তর তো সেদিনই পাবেন।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
বঙ্গে সাংগঠনিক রদবদলের পথে বিজেপি, দিল্লিতে শমীক-বনসল দীর্ঘ বৈঠক
-
মমতার জন্যই ধ্বংস ইন্ডিয়া জোট, নীতীশের এনডিএ যোগের নেপথ্যেও কালীঘাট! প্রকাশ্যে রিপোর্ট
-
জমি দুর্নীতি ও তোলাবাজির অভিযোগ! পুলিশের জালে তৃণমূলের আরও এক প্রাক্তন বিধায়ক
-
যুদ্ধের ধাক্কায় বেসামাল, ফুরিয়ে এসেছে অস্ত্র! এবার হার মানবে ইরান?
-
নবদ্বীপের ‘ত্রিপলচোর’ তৃণমূল চেয়ারম্যানের মামলাই লড়লেন না আইনজীবীরা! এজলাসের বাইরে ‘চোর’ স্লোগান, পড়ল ডিম
নিবেদিত


