বিশালবিপুল মাঠ। এপ্রিলের ফুল শুকিয়ে কাঠ। কড়া রোদের কড়কানি। তবু, বাংলায় ভোটের মরশুম। শহর-অলিগলি-শহরতলি– সব এলাকায় এখন প্রার্থীদের দহরম মহরম। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার থেকে রোড শো, এমনকী, জনসভাও। কিন্তু এমনও হয় যে, বিরাট মাঠে ছাউনি-টাউনি লাগিয়েও প্রার্থী দেখেন লোকজন বিশেষ নেই! যে ক’জন আছে, তা দিয়ে বাংলার সাংস্কৃতিক সন্ধে করা চলে বড়জোর (অবশ্য যদি হাফটাইমে চা-শিঙাড়া থাকে, নতুবা তা-ও নয়) কিন্তু ভোটের প্রচার হবে না। তার চে’ বড় কথা, এ তো ভারি অপমানজনক ব্যাপার! এত আশা করে আসা! অতএব করণীয় কিছুই নেই, প্রার্থী সে চত্বর ছেড়ে দ্রুতই ভাগলবা। এমন করুণ এপ্রিলে, প্রার্থীকে জনগণ কিনা এপ্রিল ফুল করল!
কে ইনি? হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)। বীরভূমের মাড়গ্রামে এমন একটা জনসভা হওয়ারই কথা ছিল, কিন্তু কী আর করবেন। ভারতের জনসংখ্যা নেহাত কম নয়, তবু, তিনি তেমন জনতাই পাচ্ছেন না ছাই যে, একটা জনসভা করবেন! অথচ খানছয়েক বাস, টোটো, চারচাকা কিছুরই কোনও অভাব ছিল না। যাক গে, গতস্য শোচনা নাস্তি! তাছাড়া, ত্যাগই ধর্ম– মনে করে এসেছেন হুমায়ুন। নইলে অধীর চৌধুরীর প্রায় ডানহাত হয়েও তাঁকে ত্যাগ করবেন কেন! তাপ্পর তৃণমূলে যোগ দিলেন, কিছুকাল পর সে দলও ত্যাগ করেছেন। আর এই সেদিনকার ঘটনা তো বললামই, জনতা না দেখে তিনি মাঠই ত্যাগ করেছেন। তবে সব সময় স্বেচ্ছায় করেছেন, তা নয়। অনেক সময় জনগণই তাঁকে ‘গো ব্যাক’ শ্লোগান দিয়ে এলাকা ছাড়তে বলেছেন। এই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি, তিনি খিদিরপুরের একবালপুর ষোলোআনা মসজিদের সামনে ব্যক্তিগত কাজে গিয়েছিলেন, ওমনি একদল লোক, ওই ষাটোর্ধ্ব লোককে দেখতে পেয়েই দুচ্ছাই করা শুরু করলেন। নিরাপক্ষারক্ষীর দেখা এ শহরে এখনও মেলে, অনেক ক্ষেত্রেই, তাই সে যাত্রায় ভিড়ভাট্টা থেকে বীরবিপ্লবী কবীরকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
তৃণমূল কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে একটি ভিডিও হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছিল ভোটের বাজারে। কী সেই ভিডিও? তৃণমূল সরকার ফেলার জন্য বিজেপির সঙ্গে ১০০০ কোটি টাকার চুক্তির কথা হচ্ছে হুমায়ুন কবীরের! যদিও হুমায়ুন, কী ভাগ্যিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আবিষ্কার হয়েছিল, শূলে চড়িয়েছেন এআই-কে। এদিকে অমিত শাহ ও হুমায়ুন কবিরের মধ্যে প্রকাশ্যে ঝুটঝামেলা তৈরি হয়েছে। তা অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যই সম্ভবত।!
খুব সম্প্রতি তিনি ‘ভাইরাল’। তৃণমূল কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে একটি ভিডিও হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছিল ভোটের বাজারে। কী সেই ভিডিও? তৃণমূল সরকার ফেলার জন্য বিজেপির সঙ্গে ১০০০ কোটি টাকার চুক্তির কথা হচ্ছে হুমায়ুন কবীরের! যদিও হুমায়ুন, কী ভাগ্যিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আবিষ্কার হয়েছিল, শূলে চড়িয়েছেন এআই-কে। এদিকে অমিত শাহ ও হুমায়ুন কবিরের মধ্যে প্রকাশ্যে ঝুটঝামেলা তৈরি হয়েছে। তা অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যই সম্ভবত! হুমায়ুন হুংকার ছাড়ছেন, মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় তাঁর বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর তো হয়ে গিয়েছে, চাইলে অমিত শাহরা সেটা ভেঙে দেখাক। এদিক শাহবাবুরাও বলে দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে যদি ক্ষমতায় আসেন কোনওভাবেই বাবরি মসজিদের ওই প্রতিরূপ নির্মাণ করতে দেবেন না। এসবের চক্করে নাকি হুমায়ুন কবীরের (Humayun Kabir) প্রতিষ্ঠিত আমজনতা উন্নয়ন পার্টির সদস্যদের অনেকেই দল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। কী যে বিপাকে পড়েছেন হুমায়ুন, দলেও লোকসংখ্যা কমছে, জনসভায় কেউ আসছে না, তিনি প্রচার করবেন এ অবস্থায় কোন শ্রীমুখে?
শ্রীমুখ বললাম বটে, সেজন্য দুঃখিত। তিনি তো সরাসরি খুনের হুমকিও দিয়ে থাকেন! হুমায়ুনের বাবরি মসজিদের ট্রাস্টের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ যিনি– মইনুল হক রাণা, তাঁকেই খুনের হুমকি দিয়েছেন হুমায়ুন। এমনকী, বাবরির তলায় ১০০টা লাশ পোঁতার হুমকিও দিয়েছেন তিনি! এই বিতৃষ্ণার কারণ কেন্দ্রের সঙ্গে হুমায়ুনের ওই ‘ডিল’-এর ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরই, মইদুল হক রাণা তৃণমূলে যোগ দেন। এমন হুমকি সাধারণত বাঘা নেতাদের ডানহাতেরা দিয়ে থাকেন দরকারে-অদরকারে, কিন্তু স্বয়ং দলের প্রতিষ্ঠাতা, একজন প্রার্থী, ভোটভিক্ষুক, জনতার জন্য কাজ করার ‘স্বপ্ন’ যাঁর থাকবে, সেই স্কিপার কি এই ভাষা ব্যবহার করতে পারেন?
হুমায়ুনের উদ্যোগে বাবরির পুনর্নির্মাণ কি ইতিহাসের বাবরির স্মৃতি মুছিয়ে ফেলতে পারে? কোনওভাবেই না। কিন্তু যে-হুমায়ুন এই বাবরি নির্মাণের নেপথ্যে– তাঁর যদি এই হুমকির ভাষা হয়ে থাকে, যদি সহজেই নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারেন সাম্প্রদায়িক দলের কাছে ব্যক্তিগত লাভের আশায়, তাহলে এই নতুন বাবরি শুধুমাত্র পুরনো বাবরির একটা আদল। তাতে অসাম্প্রদায়িক, অহিংস ভারতের কোনও ছায়া থাকবে না।
বাবরি মসজিদ। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২। তার বিলীন হয়ে যাওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা গত শতাব্দীতে অসাম্প্রদায়িক ভারতে বিশেষ ঘটেনি। সেই বাবরি মসজিদের প্রতি সারা ভারতের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন সহৃদয়। তাঁরা ঘৃণা করেছিলেন একরাতের মধ্যে ভারতের এই ঐতিহ্যশালী মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায়। হুমায়ুনের উদ্যোগে বাবরির পুনর্নির্মাণ কি ইতিহাসের বাবরির স্মৃতি মুছিয়ে ফেলতে পারে? কোনওভাবেই না। সেই ক্ষত চিরকালীন। কিন্তু সে প্রসঙ্গে শব্দ খরচ না-করলেও, যে-হুমায়ুন এই বাবরি নির্মাণের নেপথ্যে– তাঁর যদি এই হুমকির ভাষা হয়ে থাকে, যদি সহজেই নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারেন সাম্প্রদায়িক দলের কাছে ব্যক্তিগত লাভের আশায়, তাহলে এই নতুন বাবরি শুধুমাত্র পুরনো বাবরির একটা আদল। তাতে অসাম্প্রদায়িক, অহিংস ভারতের কোনও ছায়া থাকবে না। এর থেকে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।
নিবেদিত


