তিনি আগ্রহের প্রতিবেশী শব্দ। এই গ্রহে, তাঁর নাম অধীর– অধীর চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury)। অধীর আগ্রহে কীসের জন্য অপেক্ষা আর করতে পারেন? ভোটে জেতা। সকলেই জানেন, বহরমপুর মানেই অধীর-গড়। সেই গড় গড়নের নেপথ্যে তিনি কম রক্তঘাম বিসর্জন করেননি। এককালের নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে আগাপিছু জড়িয়ে। রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বের কালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন। তারপর থেকে কংগ্রেসের যতই অধঃপতন হোক, অধীর চৌধুরীকে কেউ টলাতে পারেনি! একমাত্র গত লোকসভা নির্বাচনে তিনি পপাত চ! মুশকিল হল, সেবারেই তিনি বলেছিলেন, হেরে গেলে বাদাম বেচবেন। ‘কাঁচা বাদাম’ গানের জনপ্রিয়তার কারণেই কি না, জানি না। তাঁর রাজনৈতিক দাম বাদামের চেয়ে ঢের বেশি। সে তিনি যেমন বিরোধী-ই হন না কেন!
বাংলার সাধারণ মানুষের পাশে নানা সময় এসে দাঁড়িয়েছেন। কোভিডকালে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনিই। বম্বে, কেরল, অন্ধপ্রদেশের পরিযায়ী শ্রমিকরা ফিরে এসেছিল সেই ট্রেনে করেই। সাফ জানিয়েছেন ভোট দেওয়া-না-দেওয়ার সঙ্গে এসবের কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি জিতলেও মানুষের জন্য, না জিতলেও তাই।
আরও পড়ুন:
বিরোধী– এই শব্দটিকে অধীর চৌধুরী নিঃসন্দেহে গূঢ়ভাবে ভালোবাসেন। মনে করেন, স্রেফ ক্ষমতায় অধিষ্ঠান করাই শেষ কথা নয়। বিরোধী ও ক্ষমতাসীনের ক্রমাগত দ্বন্দ্বে গড়ে উঠবে এক সমাজের ছবি। কিন্তু বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীরা সংকটে– এও মনে করেন তিনি। মনে করেন, বিরোধিতার সৌন্দর্য নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিরোধিতার ক্ষমতাটাকে শেষ করে ফেলা হয়েছে। ফলে রাজনীতি হয়ে উঠেছে অনেকখানি স্বৈরাচারী, যা বাংলার সাংস্কৃতিক মনন ও বোধের বিরুদ্ধে। শুধু বিজেপি নয়, তিনি মনে করেন তৃণমূলও একইভাবে এই সাম্প্রদায়িক পোলারাইজেশনের জন্য দায়ী। গত নির্বাচনে তিনি নিজের হারের কারণ বলে মনে করেন এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনকেই।
দীর্ঘকালের সংসদ, সংসদীয় রাজনীতিতেই বিশ্বাসী অধীর চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury) অবশ্য শুধু নিজের গড় নিয়ে ভাবিত, একথা বললে ভুল হবে। বাংলার সাধারণ মানুষের পাশে নানা সময় এসে দাঁড়িয়েছেন। কোভিডকালে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনিই। বম্বে, কেরল, অন্ধপ্রদেশের পরিযায়ী শ্রমিকরা ফিরে এসেছিল সেই ট্রেনে করেই। সাফ জানিয়েছেন ভোট দেওয়া-না-দেওয়ার সঙ্গে এসবের কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি জিতলেও মানুষের জন্য, না জিতলেও তাই। শুধু কোভিডকালের জনদরদী নেতা নয়, বিজেপির কূট চালে যখন ওড়িশায় বাংলার শ্রমিকদের প্রতি ‘বাংলাদেশি’ তকমা লাগানো হচ্ছিল, সেসময় তিনি আক্রান্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে দৌড়ে গিয়েছিলেন সম্বলপুরে। সেখানেই থামেননি, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ করেছিলেন, কেন এ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে আক্রান্ত হচ্ছে বাঙালিরা। কেন বাংলা বলা হয়ে উঠছে ‘অপরাধ’? এমনকী, সেই সমস্ত অভিযোগের ভেতর বাদ যায়নি এসআইআর-এর কারণে মতুয়াদের হেনস্তা হওয়ার কথাও! যদিও বারেবারেই অধীর বিরোধীদের বক্তব্য: বিজেপির সঙ্গে তাঁর গোপন আঁতাঁত রয়েছে। এই অভিযোগ অবশ্য হেলায় উড়িয়ে দিয়েছেন অ. চৌ! বলেছেন, রাজনীতির কোনও গোপন গন্ধ নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতে ছিল না, তা একেবারেই মানুষের জন্য, মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলার বৈঠক ছিল।
দিল্লির প্রজাতন্ত্র দিবসের উদযাপনে, প্রথম সারিতে, তাঁর জন্য চেয়ার থাকলেও, তিনি থাকতেন না সেখানে। চলে আসতেন এই বাংলায়। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরেই। কাটাতেন নিজের পার্টি অফিসে। এখানেই তাঁর মতো করে উদযাপন। একথা বলতে দ্বিধা হয় না, অধীর চৌধুরী নিজের বাংলাকে ভালোবাসেন। বাংলার মানুষকে ভালোবাসেন।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও, এপ্রিলের শুরুতেই প্রচারাভিযানে বেরিয়ে অধীর চৌধুরী খুব সদর্থক হতে পারলেন কি? সেদিন বহরমপুরের প্রায় তিন জায়গায় শুনতে হল ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। যদিও জানা যায়, এই গো ব্যাক এসেছিল গোঁড়া তৃণমূল সমর্থকদের কাছ থেকে। এমনকী, দু’পক্ষের মধ্যে বচসা, হাতাহাতির পর্যায়েও গিয়েছিল ঘটনাটা। তবে এসব সামান্য কিছু না হলে কি বাংলার ভোটের নির্বাচনকে বড় ‘নিরামিষ’ লাগে না?
দিল্লির প্রজাতন্ত্র দিবসের উদযাপনে, প্রথম সারিতে, তাঁর জন্য চেয়ার থাকলেও, তিনি থাকতেন না সেখানে। চলে আসতেন এই বাংলায়। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরেই। কাটাতেন নিজের পার্টি অফিসে। এখানেই তাঁর মতো করে উদযাপন। একথা বলতে দ্বিধা হয় না, অধীর চৌধুরী নিজের বাংলাকে ভালোবাসেন। বাংলার মানুষকে ভালোবাসেন। দিল্লির রাজপাট ছেড়ে নইলে নিজের ছোট্ট গড়ের প্রতি নইলে এমন আগ্রহ কোন স্কিপার দেখায়? শিকড়ের প্রতি এমন ভালোবাসা, সত্যিকারের স্কিপারকেই তো মানায়!
নিবেদিত


