গড়ের আগেও মৌসম নূরের (Mausam Noor) মাথাব্যথা তাঁর পরিবার, নিজস্ব মৌসম ভবন। রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়রা তো বটেই, এমনকী, কংগ্রেসের কর্মীদেরকেও ‘ঘরের লোক’ বলেই মনে করেন। যদিও তৃণমূল কংগ্রেস এখন দূরসম্পর্কের– আত্মীয় নির্ঘাত নয়। তিনি বেজায় বাকপটু, তবে কথা খচ্চা করেন না বিশেষ। দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসীও। যখন যে-সিটে দাঁড়িয়েছেন, নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন সেখান থেকে জিতবেনই। তবে সবসময় জনগণ তাঁর পক্ষে যায়নি। ফলে উনি যা বলার বলেছেন, ভোটবাক্স যা করার করেছে। মালদার মালতিপুর বিধানসভা কেন্দ্রে এইবার তিনি দাঁড়িয়েছেন। এই গরমে প্রচার-টচার করার পর নির্ঘাত আমের নানা রেসিপি জড়ো হচ্ছে তাঁর সম্মুখে। আমপোড়ার শরবত গ্রীষ্মে তো চমৎকার। এছাড়া, পাকলে তো কথাই নেই। যাক গে, এ লেখার মূলে আম নেই, আমজনতা আছে। আর মালদার লোক মানেই আম-জনতা। আমজনতার হয়ে কাজ করতে পারার সৌভাগ্য তাঁর হয় কি না, দেখা যাক।
তবে তাঁর সৌজন্যবোধ প্রশ্নাতীত। তিনি হাত-এ ফিরেছেন, কিন্তু কাউকেই একহাত নেননি। এমনকী, হুমায়ুন কবীরের নির্মীয়মাণ বাবরি মসজিদকেও নাম দিয়ে বিচার না-করে, ‘আল্লার ঘর’ ভাবতে আর্জি জানান সমর্থকদের। যে-দলেই থাকুন না কেন, বিরোধী দলের সম্পর্কে চট করে কোনও বক্রোক্তি করতে শোনা যায়নি তাঁকে। এই মিশমিশে ভদ্রতার নেপথ্য কারণ কী? তিনি বলে থাকেন তাঁর বড়মামা গণি খান চৌধুরীর মানবিকতার পাঠের কথা। আর এইখান থেকেই বুঝি যাবতীয় সমস্যার সূচনা হয় মৌসম বেনজির নূরের।
আরও পড়ুন:
তৃণমূল কংগ্রেস থেকে এই যে ঘাস ছেঁটে কংগ্রেসে ফিরেছেন, তার কারণ তাঁর পরিবার। রাজনীতি নয়। সাধারণত গদগদে বাংলা সিরিয়ালে পরিবার ভেঙে যাচ্ছে দেখে প্রবাসী ছেলেমেয়েরা যেমন ধাঁ করে ফিরে আসে, বাংলার রাজনীতিতে মৌসম সেরকম মৌলিক আবহাওয়া তৈরি করেছেন।
আগেই বলেছি, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তিনি মালদহের মালতিপুর আসনের কংগ্রেস প্রার্থী। তাঁর অন্যতম পরিচয়, তিনি আবু বরকত আতাউর গণি খান চৌধুরীর ভাগ্নি। পরিবারের প্রতি তাঁর প্রেম নিঃসন্দেহে ‘বেনজির’। তার চাইতেও বেনজির– তাঁর মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছে! কখনও কাজ করতে চেয়ে, আইনজীবীর লাভজনক কেরিয়ার ছেড়ে পা রেখেছেন রাজনীতিতে। কংগ্রেসে কাজ করতে পারছেন না বুঝে, গিয়ে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূলের ছত্রছায়ায়। আবার সেখানেও কাজ হচ্ছে না মনে হওয়ায় ফিরে এসেছেন কংগ্রেসে। কাজ করুন, না-করুন, কাজের প্রতি এমন নিষ্ঠাবান চিন্তক কে আছে! কর্মমনোভাবাপন্ন রাজনৈতিকের সংখ্যাই বা কতটুকু!
তবে এমন খতরনাক ঘামঝরানো নিষ্ঠাবান কর্মোদ্যোগীর প্রতিও নিন্দুকের সমালোচনা কম পড়েনি! তারা বলে, ২৬-এ বিধানসভার টিকিট পাবেন না বুঝেই কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন মৌসমের। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে এই যে ঘাস ছেঁটে কংগ্রেসে ফিরেছেন, তার কারণ তাঁর পরিবার। রাজনীতি নয়। সাধারণত গদগদে বাংলা সিরিয়ালে পরিবার ভেঙে যাচ্ছে দেখে প্রবাসী ছেলেমেয়েরা যেমন ধাঁ করে ফিরে আসে, বাংলার রাজনীতিতে মৌসম সেরকম মৌলিক আবহাওয়া তৈরি করেছেন। এবং এতকাল বাদে দলে ফিরে নাকি বাড়ি ফিরেছেন বলেই মনে হয়েছে তাঁর!
রাজনীতির সঙ্গে যেন তাঁর মান-অভিমানের পালা। কংগ্রেসে ফিরেই বড়মামা গণিখান চৌধুরীর সমাধিতে মাথা ঠেকিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। খানিক বিবাহ-বহির্ভূত প্রেমের পক্ষে যুক্তি দেখানোর ঢঙে বলেছেন, স্রেফ বিজেপি-জুজুর ভয়েই এমন হঠাকারী সিদ্ধান্ত তাঁর। নয়তো তৃণমূলের প্রতি কোনওকালে তাঁর কিচ্ছুটি নেই! উঁহু! মাঝের তৃণমূল-পর্বের ভুলকে দাগিয়ে মৌসম স্মৃতিচারণ করে চলেছেন পুরনো দিনের। মালদহের সামসির মাঠ-ভর্তি মৌসমের সমর্থকদের ভিড় দেখে প্রণব মুখোপাধ্যায় বিস্মিত হচ্ছেন। আবার, প্রথমদিন পার্লামেন্টে দুরুদুরু বুকে তাঁকে বসে থাকতে দেখে ডাক পাঠাচ্ছেন সোনিয়া গান্ধী। কাছে যেতেই টেনে নিচ্ছেন বুকে। বলতে গিয়ে চোখ ছলছল মৌসমের। যেন ছোটবেলার মামাবাড়ির গল্প!
কংগ্রেস অবশ্য আশাবাদী, মৌসমের ফেরায় একটু হলেও মৌসম বদলাবে জাতীয় দলটির। মাঝামাঝি নয়, সিট ১২টির মধ্যে ১২টিই জিতবে কংগ্রেস– দাবি মৌসম নূরেরও। তাই তো শাসক দলের সঙ্গ ছেড়ে হাত শিবিরের হাত ধরা! কিন্তু নিন্দুকেরা পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলতেও ছাড়েনি তাঁর বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, মালতিপুরের মঞ্চসভায় দাঁড়িয়েই মৌসমের নাম না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ বলছেন, ‘নিজে রাজ্যসভায় যেতে পারিনি। ওকে পাঠিয়েছিলাম।… পলাতকদের মানুষ ক্ষমা করবেন না।’ এখানেই শেষ নয়, দুঃসময়ে দল ছেড়ে গিয়েছিলেন মৌসম, এই আঘাত মেনে নিতে পারেননি বহু কর্মী-সমর্থক। তাই মৌসম কংগ্রেসে ফিরতেই, পাঁচ ক্ষুব্ধ কর্মী তড়িঘড়ি গিয়ে যোগ দিলেন তৃণমূলের পতাকা-তলে। জল্পনা শোনা গেল, অন্তত আরও ৫০০ সমর্থক মৌসমের ঘর-ওয়াপসিতে মর্মাহত হয়ে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে! এ যেন খানিক ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ জাতীয় সমস্যা।
কংগ্রেস অবশ্য আশাবাদী, মৌসমের ফেরায় একটু হলেও মৌসম বদলাবে জাতীয় দলটির। মাঝামাঝি নয়, সিট ১২টির মধ্যে ১২টিই জিতবে কংগ্রেস– দাবি মৌসম নূরেরও। তাই তো শাসক দলের সঙ্গ ছেড়ে হাত শিবিরের হাত ধরা! কিন্তু নিন্দুকেরা পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলতেও ছাড়েনি তাঁর বিরুদ্ধে। তাই হয়তো ‘ফ্যামিলি সিট’ সুজাপুর ছেড়ে তাঁকে লড়তে পাঠানো হয়েছে মালতিপুর আসনে। মানুষ বরকত সাহেবের পরিবারকে ভালোবাসেন, মৌসম যদিও মরিয়া হয়ে বলছেন বারেবারেই।
স্কিপার যে সাধারণ মানুষকে ‘পরিবার’ ভাববেন, এমনটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু অসময়ে ছেড়ে যাওয়া স্কিপারকে মালতিপুরের সাধারণ মানুষও কি পরিবার ভাবতে পারছেন? উত্তর: ৪ মে।
নিবেদিত


