১ আশ্বিন  ১৪২৭  শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ 

Advertisement

করোনা-ভূমিকম্পের জোড়া ধাক্কা সামলে হাসছে ক্রোয়েশিয়া, গল্প শোনালেন প্রবাসী গবেষক

Published by: Sucheta Sengupta |    Posted: May 2, 2020 10:35 pm|    Updated: May 3, 2020 8:57 pm

An Images

করোনার কামড়ে কাতর ইউরোপ। একথা যখন বলা হচ্ছে, তখন মূলত পশ্চিম ইউরোপের ধনাঢ্য দেশগুলোর পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছি আমরা। কিন্তু পূব আর পশ্চিমে ফারাক আছে। ঘটনা হল, পূর্ব ইউরোপের ধনপ্রাচুর্যহীন ছোট ছোট দেশগুলোতে সেভাবে দাপট দেখাতে পারেনি করোনা ভাইরাস। বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া দেশগুলোর অল্পে খুশি, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত নাগরিকরা রয়েছেন অনেকটাই নিরাপদে। তেমনই এক দেশ ক্রোয়েশিয়া। সেখান থেকে পরিস্থিতির সবিস্তার বর্ণনা দিলেন গবেষক শুভদীপ ঘোষ

– ‘কখন বুঝেছিলেন যে যুদ্ধটা আপনারা হারবেন?’ ‘মস্কো’, এই একটি শব্দ বলেছিলেন ফিল্ড মার্শাল কাইটেল, নুরেমবার্গ ট্রায়ালে। জীবনে প্রথম বিদেশের মাটিতে পা রাখা, পুশকিনের নামে এয়ারপোর্ট, আকাশ থেকে দেখা বরফজমা বনভূমি, লেক। এখানেই কোথাও ফ্যাসিস্টরা থমকে গিয়েছিল, এই রাস্তা দিয়েই হেঁটেছেন লেনিন, স্তালিন, আরও কত নাম না জানা মানুষ-মানুষী, যাঁরা সাম্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

Croatia1

প্রথম বিদেশযাত্রা মহামারির আতঙ্ক নিয়ে। মুখে মাস্ক। দিল্লি এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেক ইনের সময় মুখোশ খুলতে যেতেই জওয়ানের কড়া নিষেধ- “আপনার থেকে আমার হতে পারে।” সেটা ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে। পয়লা মার্চ সকালে পুশকিন এয়ারপোর্টের মানুষজনের মধ্যেও বাড়তি সতর্কতা। আমার গন্তব্য মস্কো থেকে আরও দূরে। সাবেক যুগোস্লাভিয়া টুকরো হয়ে তৈরি হওয়া দেশ – ক্রোয়েশিয়া।

[আরও পড়ুন: আঁধার কাটছে করোনার আঁতুরঘরে, চিনে গত ২৮ দিনে আক্রান্ত মাত্র এক!]

ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগ্রেব শহর। খুব ছোট কলকাতার তুলনায়। টিটোর যুগোস্লাভিয়া ভাঙার পর ক্রোট এবং সার্বদের গৃহযুদ্ধ – যা ক্রোটদের কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধ – এসব ইতিহাসের মাঝে এসে আমি পড়লাম পয়লা মার্চ, রবিবার। ফ্রানজ ট্রুডম্যান এয়ারপোর্টের কাস্টমস অফিসারের জিজ্ঞাসাবাদ – শেষ ১৫দিনে আমি ভারত থেকে অন্য কোনও দেশে গেছি কিনা, করোনার সতর্কতা হিসেবে এসব প্রশ্ন। সোমবার, প্রথম দিন ইউনিভার্সিটি গিয়ে বুঝলাম, করোনা মহামারিকে ক্রোয়েশিয়ার মানুষ তত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। কলকাতায় পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানের মতোই এখানে কফি এবং বিয়ার বার। মানুষের জমাটি গজল্লা – বাস স্ট্যান্ডে, রাস্তার ধারের বেঞ্চে, পার্কে, সর্বত্র। তখন কে-ই বা ভেবেছিল, ১৫ দিন পর এইসব জায়গায় পাথুরে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়বে? কফিবারে বসে এমা অবশ্য বলছিল, বর্ডার সিল করে দেওয়া উচিত,ইটালি এত কাছে…সেদিনই ওর থেকে জানলাম, বেশিরভাগ ব্লন্ড আসলে চুল রং করা ব্লন্ড, ওরই মতো।

কলকাতা ছাড়ার সময়ে দেখে এসেছি, সর্বত্র আমের মুকুল আর বৌল। জাগ্রেবের প্রথম বসন্তে দেখলাম, নেড়া চেরি গাছে গোলাপি বা সাদা ফুল ধরছে। তারপর একদিন ‘বল দেখি তুই মালি?/হয় সে কেমন করে’ অবস্থা। সারা শহরের যে চুলোতেই একটু মাটি, একটু ঘাস, সেখানেই ফুটে বেরোচ্ছে অজস্র নাম না জানা ফুল – সাদা, হলুদ, বেগুনি, নীল, গোলাপি। শীত তুচ্ছ করে আসছে বসন্ত, কিশোর বসন্ত।

এর মধ্যে এক শুক্রবার, ১২ মার্চ, ইউনিভার্সিটি থেকে নির্দেশ এলো দু’দিন ঘরবন্দি হয়ে থাকার জন্য। যেহেতু সরকার ঘোষণা করেছে পয়লা মার্চ বা তার পর বিদেশ থেকে এলে তাকে ১৪ দিন আলাদা হয়ে থাকতে হবে। আমার যদিও ১২ দিন পার হয়ে গেছে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে ঘুরে বেরিয়ে, তবু দু দিন আলাদা থাকতে হবে। দু দিনের খাবার জোগাড় করে, ঘর বন্ধ করে বসতেই ফোন। মিষ্টি অথচ দৃঢ় গলায় – “তোমার তো দু দিন ঘরের বাইরে বেরোনোর কথা নয়। খাবার বা অন্য কিছু যা কিছু আমরা এনে দেব।” তারপরই দেখি আমার পোস্ট ডক্টরাল হোস্ট অধ্যাপক পাভিনের মেল – ” আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। তুমি দু’দিন ঘরের বাইরে বেরিও না।” করোনা যে ক্রোয়েশিয়ার ঘাড়ে উঠে পড়েছে।

Croatia2

করোনার জ্বালায় রক্ষা নেই, তারউপর এক সকালে একেবারে ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’। ভোরবেলা প্রবল ভূমিকম্প। ১৪০বছরের মহয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী। দাঁত ঠকঠক করে গেছে, এমন ভয় লেগেছে। কোনওরকমে জ্যাকেট চাপিয়ে, চটি গলিয়ে তিনতলা থেকে নেমে বেরিয়েছি – জীবনের প্রথম তুষারপাত। ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টির মতো ইলশে গুঁড়ি বরফ ঝরে পড়ছে। যুগোস্লাভিয়া আমলের দাদু সিকিউরিটি আমাকে হাত,পা নেড়ে ইশারায় অভয় দিচ্ছেন, “গেস্ট হাউসের বাড়ি একদম নতুন। খুব মজবুত, কিচ্ছু হবে না।” পরে জানলাম, জাগ্রেব শহরের সবচেয়ে বড় চার্চটার চূড়া ক্রশ সমেত ভেঙে পড়েছে আর্চবিশপের বাড়িতে। পুরোনো বাড়ির দেওয়াল, চিমনি ভেঙে শীতের মধ্যে বহু নাগরিক আশ্রয় নিয়েছেন স্টুডেন্ট ডরমিটরিতে। সব কিছুর মধ্যেও ক্রোয়েশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলে চলেছেন, “ভূমিকম্পের সময় সবাই বাইরে থাকুন, কিন্তু পরস্পরের মধ্যে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখুন।” বন্ধ হয়ে গেছে ইউনিভার্সিটি, গণপরিবহণ। ট্রামলাইনগুলো ফাঁকা। দেশের মধ্যে এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।

Croatia4

– “Where should I go?”
– “Go home.”

প্রশ্নটা আমার। উত্তর জাগ্রেবের এক পুলিশ কর্তার। খোঁজ করছিলাম ওয়ার্ক পারমিট আর রেসিডেন্স পারমিট পাওয়ার। “সব বন্ধ হয়ে গেছে, বাড়ি চলে যাও”, বললেন পুলিশ অফিসার। হোম মানে গেস্ট হাউসে তো ফিরবই। সমস্যা হলো, ওয়ার্ক পারমিট না পেলে ইউনিভার্সিটি আমাকে বেতন দিতে পারবে না। বেশি করে টাকা এনেছি সিলেটি, বাঙাল বউয়ের কোঁৎকা খেয়ে। আমি ভাবছিলাম, এত টাকা আবার কেউ নিয়ে যায় নাকি? গিয়েই তো মাইনে পাব।

‌যাই হোক, পুলিশের সঙ্গে কথা বলে, বরফের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেস্ট হাউসে ফিরছি। যত অনিশ্চয়তার কথা মাথায় আসছে। পড়ছিও একটা অসম্ভব মনখারাপ করা উপন্যাস – ‘The grapes of wrath’, ১৯৩০ সালে বিশ্বব্যাপী মহামন্দা, সেইসঙ্গে খরায় আমেরিকার সম্পন্ন কৃষকদের ভিটেমাটি চাটি হয়ে যাওয়া। তবে সত্যিকারের অসুবিধা আমার এখানে এখনও অব্দি হয়নি। কিন্তু বাকিদের কী হবে? কীভাবে চলছে?
‌ভারতে শত শত মাইল হেঁটে যাওয়া শ্রমিকের সারি, বাবার কাঁধে ঘুমিয়ে পড়া ছেলে, গ্রামে পৌঁছানোর শেষ ১২কিলোমিটার আগে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়া কিশোরী, খিদের জ্বালায় পাঁচ সন্তানকে গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলা মা, দর্জি থেকে সবজি বিক্রেতা হওয়া, রিকশাচালক থেকে ভিখিরি হয়ে যাওয়া, কুকুরের সঙ্গে রাস্তায় গড়ানো দুধ চাটা মানুষের মতো দেখতে এক প্রাণী! কতশত ‘The grapes of Wrath’.

বাংলায় শহরে, গ্রামে যেমন পাড়ার মিষ্টির দোকান, এখানে তেমনই পাউরুটির দোকান। টক ছানা ভরা বা মাংসের পুর ভরা তুর্কিশ রুটি বুরাক, জ্যাম-চকলেট ভরা ক্রুসো, আরও কত কী। করোনার জেরে সব বন্ধ। মালিক বুড়ি বা কর্মচারী ছুঁড়িগুলো খাবে কী? জাগ্রেবের খোলা বাজারে সবজি নিয়ে বসা চাষি বা মেমসাহেব মেছুনিগুলোরও সব চৌপাট।

[আরও পড়ুন: কবে আসবে করোনার প্রতিষেধক? উত্তর দিলেন বিল গেটস]

ক্রোয়েশিয়ার বর্তমান সরকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে ঠেকনা দিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধস আটকাতে। খাদ্যসামগ্রী, সাবান, কাপড়-চোপড়ের দাম না বাড়ানোর ঘোষণা করে সরকার, চাকরি চলে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে ন্যূনতম আর্থিক সাহায্য নিশ্চিত করে। ফলত সর্বশক্তিমান বাজার ভাইরাসের ধাক্কায় কুঁকড়ে লুকিয়ে পড়ে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের আড়ালে।
বর্তমানে ক্রোয়েশিয়ার অবস্থা ভাল থেকে আরও ভালর দিকে চলেছে। দ্রুত উন্নতির কারণে সরকার তিন ধাপে লকডাউন তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। আজ দেশে অসুস্থ, মৃত্যুর চেয়ে সুস্থতার সংখ্যা বেশি। অতএব, বাজার অচিরেই আবার নিজের সর্বশক্তিমান অবতারে পুনরাবির্ভূত হবে বলে আশা করা যায়।

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement