সাঁড়াশি অভিযানের চাপে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দু’দশকের লড়াইতে ইতি! স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে বাংলায় আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন শীর্ষ মাওবাদী দম্পতি শচীন ওরফে রামপ্রসাদ মাণ্ডি এবং মিতা ওরফে নয়নতারা। যাঁদের উপর ২৫ লক্ষ টাকা ইনাম ছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করবেন। ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার পটমদা থানার ঝুঁঝকা গ্রামের বাসিন্দা তথা সিপিআই (মাওবাদী) বাংলা-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা আঞ্চলিক কমিটির সদস্য রামপ্রসাদ মাণ্ডি ওরফে সচিন ওরফে মহাদেব ওরফে সুনীল। ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন থানা মিলিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ৪৪ টি মামলা রয়েছে। তিনি AK 47 ব্যবহার করতেন।
অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী মিতা শাহু ওরফে নয়নতারা ওরফে ঝুম্পা ওরফে পরি ওরফে নতুন। তাঁর বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামের সোনাচূড়া গ্রামে। তিনি বর্তমানে সিপিআই(মাওবাদী) পূর্ব সিংভূম এরিয়া কমিটির সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ডে ১৯ টি মামলা রয়েছে। যার কারণে তারও মাথার দাম ১০ লাখ টাকা রাখা হয়েছিল। মিতার হাতে থাকত ইনসাস রাইফেল। তবে এই দুজনের বিরুদ্ধে বাংলাতেও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। শুক্রবার শচীনের বাবা সনাতন মাণ্ডি বলেছেন, ‘‘বহু বছর ধরে ছেলেকে খুঁজেছি। একটাই আশা করেছিলাম, যাতে মৃত্যুর আগে ছেলেকে সমাজের মূলস্রোতে দেখতে পরি। বহু অপেক্ষার পর পুলিশ এসে জানিয়েছে ছেলে ও বউমা ফিরেছে। এই খবর পেয়ে আমরা গোটা পরিবার খুশি।”
আরও পড়ুন:

পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, স্কুলে পড়ার সময় মাওবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে পড়েন অভাবী ঘরের সন্তান রামপ্রসাদ। পরে ২০০৬ সালে তিনি সরাসরি সংগঠনে যোগ দেন। সেই সময় পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ছুঁয়ে থাকা ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার পটমদা, এমজিএম, গালুডি, বড়াম এলাকায় সংগঠন বিস্তারের দায়িত্ব ছিল বাংলা-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা আঞ্চলিক কমিটির সদস্য রঞ্জিত পাল ওরফে রাহুলের। তার হাত ধরেই রামপ্রসাদ থেকে মাওবাদী ক্যাডারের নাম হয়ে যায় শচীন। অন্যদিকে, ২০০৭ সালে নন্দীগ্রাম আন্দোলনে মাতঙ্গিনী মহিলা সমিতির সদস্য হিসেবে যোগ মিতার। সেখান থেকে তিনি সরাসরি ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূমের ঘাটশিলায় সশস্ত্র স্কোয়াডে যোগদেন। পরে ডামপাড়া স্কোয়াড গঠন করা হয়। তার কমান্ডার করা হয় মিতাকে।
পৃথক পৃথক স্কোয়াডে কাজ করলেও লালগড় আন্দোলনে সময় শচীন এবং মিতা ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি স্কোয়াডে মিলিত হন। সেখানে শীর্ষ মাও নেতা কিষানজির কার্যত ডান হাত ছিলেন শচীন। তাঁর নির্দেশেই একের পর এক অ্যাসাইনমেন্ট সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, লালগড় আন্দোলনে সাঁকরাইল থানায় হামলা, শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে হামলা, তৎকালীন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে হামলা সহ বাংলা-ঝাড়খণ্ডে বহু বড় বড় নাশকতার যেমন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শচীন। পাশাপশি সাংগঠনিকভাবেই খুব দক্ষ ছিলেন। ফলে সংগঠনের রাজ্য কমিটি এবং আঞ্চলিক কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শচীন বাংলা-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা আঞ্চলিক কমিটির সদস্য হন। মিতাকেও পূর্ব সিংভূম জোনাল কমিটির সদস্য করা হয়। এরপরে পরিচয় হয় মিতা ও শচীনের। সর্বশেষে পুরুলিয়ার বান্দোয়ান থানার বুড়িঝোরের জঙ্গলে ২০১০ সালে তাদের ‘কমরেড ম্যারেজ’ হয়।

তবে ২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর যৌথবাহিনীর গুলিতে মৃত্যু হয় কিষানজির। তারপরে বারবার বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে জমি হারিয়ে ২০১৮ সালে দলমা থেকে সরাইকেল্লা-খরসোওয়া, কোলহান হয়ে পশ্চিম সিংভূমের ৭০০ পাহাড়ের দুর্গম সারাণ্ডার জঙ্গলে পূর্বাঞ্চলীয় হেডকোয়ার্টারে থাকা শুরু করেন ওই দম্পতি। সেখানে যৌথ বাহিনীর অপারেশন কাগারের তিন বছর মোকাবিলা করেন। সর্বশেষে শাহী নির্দেশের পরও ৩১ মার্চ ২০২৬ সালের পূর্বে তাঁরা আত্মসমর্পণ করেননি।
অক্ষত অবস্থায় চলতি বছর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বঙ্গ ব্রিগেড দলমত উদ্দেশে জঙ্গল পথে রওনা দেয়। প্রায় ২০০ কিমির বেশি জঙ্গল পথে প্রায় শতাধিক পাহাড় ডিঙিয়ে সারান্ডার দুর্গম এলাকার মাঙ্কি রিজার্ভ থেকে ৩ মাস পর জুলাইয়ের শেষে সিপিআই (মাওবাদী)-র এক মাত্র জীবিত সদস্য আকাশ-সহ বঙ্গ ব্রিগেডের ১১ জন দলমা পাহাড়ে সশস্ত্র ফিরে আসেন। কিন্তু পরে গ্রেপ্তার হয়ে যান ৩ জন। কিন্তু বাহিনীর নজর এড়িয়ে এক মাস পাহাড়ের গোপন স্থানেই ছিলেন শচীন-মিতা সহ অন্যান্যরা। তবে ঝাড়খণ্ড পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে শেষমেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২০ বছর লড়াই শেষে স্ত্রীকে নিয়ে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওই মাও দম্পতি। ফলে স্বস্তি বাংলা- ঝাড়খণ্ড পুলিশের।
সর্বশেষ খবর
-
সিপিএম বলত ‘ভণ্ড’, মার্ক্স-লেনিন নিয়ে শুভেন্দুর সমালোচনায় শতরূপের ‘ঢাল’ সেই বিবেকানন্দই!
-
পাঁচতারা হোটেলে থেকে উদ্ধার পাইলটের নিথর দেহ! দিল্লির বসন্ত কুঞ্জে ঘনাচ্ছে রহস্য
-
পদ্মায় আকাল! চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে যাচ্ছে মোদির রাজ্যের টন টন ইলিশ
-
দিনমজুরি করেই টেনেটুনে চলে সংসার, লটারি কেটেই কোটি টাকার মালিক প্রভাত!
-
জেলের খাবারে বিষক্রিয়া! বসিরহাটে অসুস্থ কমপক্ষে ১৭ বন্দি, চিকিৎসায় মেডিক্যাল টিম