দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়তে আর বেশি দেরি নেই। কৃষ্ণনগরের (Krishnanagar) ঘূর্ণির কুমোরপাড়াতেও ব্যস্ততা তুঙ্গে। প্রতিমার গায়ে শেষ মুহূর্তের রং পড়ছে, তৈরি হচ্ছে সাজসজ্জা, অলঙ্কার। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে দুর্গাপ্রতিমার ঐতিহ্যবাহী চালচিত্র। সেই ব্যস্ততারই এক প্রান্তে, টালির চালে জীর্ণ একচিলতে ঘরে বসে নিপুণ হাতে চালচিত্রে শিল্প গড়েন আশির কোটায় পৌঁছনো রেবা পাল।
চুলে পাক ধরেছে। শরীরে বয়সের ভার। কিন্তু তুলির আঁচড়ে তার ছাপ নেই! একের পর এক সূক্ষ্ম রেখায় ফুটে উঠছে বাংলার চিরাচরিত চালচিত্রের নকশা। প্রায় পাঁচ দশক আগে স্বামী ষষ্ঠী পালের হাত ধরেই চালচিত্র আঁকার কাজ শেখা। শুরুতে স্বামীর সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন রেবা। কিন্তু প্রায় ২২ বছর আগে স্বামীর মৃত্যু তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে স্বামীর শেখানো শিল্পকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। একসময় কলকাতার কুমোরটুলি থেকে বিধাননগর—বিভিন্ন জায়গায় নিজে গিয়ে মৃৎশিল্পীদের হাতে পৌঁছে দিতেন নিজের আঁকা চালচিত্র। তাঁর তুলিতে তৈরি চালচিত্র জায়গা করে নিয়েছে কলকাতার একাধিক পরিচিত পুজোমণ্ডপে।

একসময় যে শিল্পীর কাজের জন্য কলকাতা পর্যন্ত যাতায়াত ছিল নিয়মিত, বয়সের ভারে এখন সেই পথ অনেকটাই বন্ধ। দূরে গিয়ে বরাত নেওয়া বা কাজ পৌঁছে দেওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হয় না। স্থানীয় কিছু পরিচিত জায়গা এবং জয়নগর থেকে সামান্য কিছু বরাত আসে। সেই অল্প কাজ নিয়েই এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন শিল্পচর্চা। অথচ পরিশ্রমের সঙ্গে পারিশ্রমিকের হিসাব মেলে না। একটি চালচিত্র তৈরি করে হাতে আসে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কাগজ, আঠা, রং এবং দীর্ঘ সময়ের শ্রমের তুলনায় সেই অর্থ সামান্যই। তার উপর ডিজিটাল প্রযুক্তির দাপটে বাজারে কম খরচে তৈরি হচ্ছে চালচিত্রের নকশা। ফলে হাতে আঁকা ঐতিহ্যবাহী চালচিত্রের চাহিদাও ক্রমশ কমছে।
রেবা পালের জীবনযুদ্ধ অবশ্য শুধু শিল্পের বাজারে টিকে থাকার লড়াই নয়। ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ঘূর্ণির সেই জীর্ণ বাড়িতে এখন অনেকটাই একা তাঁর সংসার। সরকারি সাহায্য বা শিল্পী হিসেবে বিশেষ কোনও স্বীকৃতি না মিললেও বার্ধক্যভাতাই তাঁর অন্যতম ভরসা। যে শিল্প একসময় সংসার চালিয়েছে, আজ সেই শিল্প থেকেই নিয়মিত আয় নিশ্চিত নয়। উত্তরসূরিরাও এই পেশায় আসতে আগ্রহী নন। ফলে রেবা পালের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা হাতে আঁকা চালচিত্রের সেই পরম্পরাও।

তবু থামেননি রেবা। স্বামীর স্মৃতি আর শিল্পের প্রতি ভালোবাসাই যেন তাঁকে এখনও টেনে নিয়ে যায় কাগজ, রং আর তুলির কাছে। দুর্গাপুজো এলেই ফের তাঁর ঘরে শুরু হয় কাজ। বয়সের কারণে কাজের পরিমাণ কমেছে, কমেছে বরাতও; কিন্তু তুলির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। তাঁর হাতে তৈরি প্রতিটি চালচিত্র যেন শুধু দুর্গাপ্রতিমার পিছনের অলঙ্করণ নয়, বাংলার এক হারিয়ে যেতে বসা শিল্প-ঐতিহ্যের দলিল। র্গাপুজোর আলো ঝলমলে উৎসবের আড়ালে তাই রেবা পালের গল্প এক নিঃশব্দ শিল্পীর জীবনসংগ্রামের গল্প, একই সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসা বাংলার এক ঐতিহ্যকে শেষ শক্তিতে আঁকড়ে ধরে থাকার গল্প।
সর্বশেষ খবর
-
বাংলায় বিনিয়োগে আগ্রহী আম্বানি, আসতে পারে প্রতিনিধি দল, বড় ঘোষণা শুভেন্দুর
-
সিএপিএফ মোতায়েন নিয়ে প্রশ্ন ডেরেকের, আলোচনা হবে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে
-
উত্তরপ্রদেশের ধাঁচে বাংলাতেও হোক প্রতিরক্ষা শিল্প করিডর, আর্জি শমীকের
-
সংঘের সঙ্গে সমন্বয় বৈঠক রাজ্য বিজেপির, লক্ষ্মীবারে দিল্লিতে এক টেবিলে শমীক-শুভেন্দু
-
একবারেই কর্মীদের ৭ বছরের বকেয়া ডিএ মেটাবে সরকার, বড় সিদ্ধান্ত রাজ্যের