শরতের আকাশে মেঘের ভেলা। বাতাসে কাশফুলের দোলা। দূরে কোথাও ঢাকের ঢ্যাং কুড়া কুড়…। একটু একটু করে জাগছে কৈলাস থেকে সপরিবারে মা দুর্গার আগমনী সুর। অথচ বীরভূমের বেলগড়িয়ার এই মায়ের ঘরে পুজো মানে এখন আর দেবীর আগমন নয় (Durga Puja 2026)। বরং বুকের ভিতর জমে থাকা একরাশ পুরনো কান্নার আবার জেগে ওঠা।
ষষ্ঠী থেকে দশমী। মা দুর্গা সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি ফিরবেন আবার। বেলগড়িয়ার সেই বাড়ির দরজা হয়তো আগের মতোই খোলা থাকবে। শুধু যে-ছেলেটির জন্য দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন মা, সে আর কোনওদিন সেই দরজা পেরিয়ে এসে বলবে না, ‘মা, নাড়ু বানিয়েছ?’ নতুন শাড়ি হাতে তুলে দেবে না!
আরও পড়ুন:
মহম্মদবাজারের ভূতুড়া পঞ্চায়েতের বেলগড়িয়া গ্রামের আদিবাসী পরিবারের ছেলে রাজেশ ওরাং ছিলেন ভারতীয় সেনার জওয়ান। ২০২০ সালের ১৬ জুন গালওয়ান উপত্যকায় ভারত-চিন সংঘর্ষে শহিদ হন তিনি। ১৯ জুন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কফিনবন্দি হয়ে গ্রামে ফিরেছিল তাঁর নিথর দেহ। শোক আছড়ে পড়েছিল গোটা গাঁয়ে। সেই ছিল রাজেশের শেষ ফেরা।
কিন্তু মায়ের স্মৃতিতে রাজেশ এখনও সেই ২০১৯-এর পুজোর ছুটিতেই আটকে আছেন। মায়ের হাতের নাড়ু খেয়ে, কয়েকদিনের ছুটি কাটিয়ে আবার লাদাখের পথে পাড়ি দিয়েছিলেন। তখন কে জানত, কয়েক হাজার কিলোমিটারের সেই দূরত্বই একদিন মা-ছেলের মধ্যে চিরকালের দূরত্ব হয়ে যাবে! মমতা ওরাং বলেন, ‘সারাবছর ছেলের সঙ্গে দেখাই হত না। পুজোর ছুটিতে একবার বাড়ি আসত, কখনও কখনও গরমের ছুটিতে আর একবার আসত। তাই পুজোর আগে ওর যা যা পছন্দ সব তৈরি করে রাখতাম। ওর জন্য নানা স্বাদের নাড়ু, নানা খাবার বানিয়ে রাখতাম। কিছু নিজে খেত, কিছু সঙ্গে করে নিয়ে যেত।’
ছেলের চিরতরে চলে যাওয়ার পর থেকে পুজোয় আর আনন্দ থাকে না মায়ের। মনমরা হয়ে দিন কাটে। নতুন শাড়ি গায়ে দিতেও ইচ্ছে হয় না তাঁর। মমতা বলেন, ‘এখন আর নাড়ু বানাতে ইচ্ছা করে না। পুজোর ছুটিতে গ্রামের আরও যে সব ছেলেরা বাহিনীতে কাজ করে তারা বাড়ি ফিরে আসে, ওদের মা-বাবারা কত খুশি হয়, কিন্তু আমার ছেলে আর কোনও দিনও ফিরবে না। ও নিজের মা-কে ছেড়ে দেশ-মায়ের কাছে জীবন উৎসর্গ করেছে— এই মৃত্যু গর্বের,
কিন্তু আমার কোল তো খালিই রয়ে গেল।’ এই কথার পর যেন আর কোনও শব্দের প্রয়োজন হয় না।
একদিকে দেবী দুর্গা— যাঁকে ঘিরে সন্তান, সংসার আর ঘরে ফেরার গল্প। অন্যদিকে এক গর্ভধারিণী মা— যাঁর সন্তান দেশের জন্য নিজের জীবন দিয়েছে, আর কোনওদিন ঘরে ফিরবেন না। রাজেশের বোন শকুন্তলা ওরাং বলেন, ‘দাদা চলে যাওয়ার পর কয়েক বছর মা পুজোর সময় বাড়ি থেকে বের হতেই চাইত না, এখনও চান না। কিন্তু আমি চেষ্টা করি মাকে যতটা খুশি রাখা যায়। তবে মায়ের উপর দিয়ে সন্তান হারানোর যে শোক গিয়েছে, তাকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব।’ শকুন্তলা আরও বলেন, ‘দাদাই আমাদের পরিবারের পরিচয় দিয়েছিল এলাকায়। এক ডাকে সবাই জেনেছিল আমাদের কথা। এখনও দাদার পরিচয়েই আমরা জীবিত। দেশের হয়ে দাদার বলিদান, এলাকার সবার স্মৃতিতে।’
রাজেশের মৃত্যু যেন গোটা ওরাং পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে। শুধু পুজো নয়, কোনও উৎসবেই আর আনন্দ থাকে না মা, বোনের। বিমর্ষ হয়ে থাকেন সকলেই। তবে রাজেশের টুকরো টুকরো স্মৃতি আজও টাটকা। সেই সব স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন মমতা, শকুন্তলারা।
তবু পুজো আসবে। ঢাক বাজবে। সিঁদুর খেলায় মেতে উঠবে শহর-গ্রাম। মায়ের বিসর্জনের দিন সবাই বলবে ‘আবার এসো মা।’ শুধু মমতা ওরাং হয়তো মনে মনে বলবেন, ‘আমার রাজেশ তো আর আসবে না।’ দেশমাতৃকার জন্য নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করে দেওয়া সেই মা জানেন, তাঁর ছেলে হারিয়ে যায়নি। সীমান্তের মাটিতে, দেশের পতাকায়, কোটি মানুষের শ্রদ্ধায় সে বেঁচে আছে। তবু মা তো মা-ই। দেশমাতৃকার কাছে সন্তানকে সমর্পণ করেও গর্ভধারিণী মায়ের বুকের শূন্যতা ভরে না। ষষ্ঠী থেকে দশমী, পুজোর আনন্দে মাতে বাংলার গ্রাম। কিন্তু মহম্মদবাজারের ভূতুড়া পঞ্চায়েতের বেলগড়িয়া গ্রামে এক মায়ের চোখ শুকিয়ে গিয়েছে ছেলে হারানোর যন্ত্রণায়। পুজোর আনন্দ তাঁর কাছে ফিকে। শুধু বারবার মনে পড়ে ছেলে এসে দুয়ারে দাঁড়িয়ে বলবে, ‘মা, নাড়ু বানিয়েছ?’
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
জব্দ করেন পাকিস্তানকে, ‘র’ প্রতিষ্ঠাতার ‘৭১-এর মিশন এবার সিনেমায় দেখাবেন করণ জোহর
-
সিআইডি-র জিজ্ঞাসাবাদের মাঝেই অসুস্থ বিধায়ক পরেশরাম, ভর্তি এসএসকেএমে
-
অফসাইড গোলে চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান! ‘রাগে’ শিল্ড বয়কট করল মহামেডান
-
রাতের হাওড়া স্টেশনে সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি! আটক করে ব্যাগ খুলতেই তাজ্জব রেল পুলিশ, দেখলেন…
-
সাড়ে তিন কাঠা জমি-ভিটেমাটি গিলে খেয়েছে গঙ্গা! স্বামীর একটিমাত্র ঘর আঁকড়ে মুর্শিদাবাদের কল্পনা