অর্থনীতির আসল শক্তি শুধু বড় শিল্প গোষ্ঠীর হাতে নয়; লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোগের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিহিত। বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো। এর মোকাবিলায় ‘কৃত্রিম মেধা’ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী। লিখলেন দীপ্র ভট্টাচার্য।
২৭ জুন ছিল আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ দিবস। প্রতি বছর এই বিশেষ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অর্থনীতির প্রকৃত প্রাণশক্তি কেবল বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রাম থেকে শহর, উৎপাদন থেকে পরিষেবা, হস্তশিল্প থেকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা– অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সম্মিলিত শক্তিই একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিতকে দৃঢ় করে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য। দেশের প্রায় ৮ কোটি নিবন্ধিত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
আরও পড়ুন:
দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেকের উৎস এই খাত। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, গত এক দশকে বাজারের চরিত্র দ্রুত বদলেছে। প্রতিযোগিতা বেড়েছে, গ্রাহকের প্রত্যাশা বদলেছে, প্রযুক্তির গতি বেড়েছে এবং ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়সীমা ক্রমশ কমেছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভারতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন– কীভাবে সীমিত সম্পদ নিয়ে আরও দ্রুত, আরও দক্ষ এবং আরও লাভজনক হওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এখন বিশ্বের ব্যবসাজগৎ এক নতুন শক্তির দিকে তাকিয়ে আছে– ‘কৃত্রিম মেধা’। কয়েক বছর আগেও কৃত্রিম মেধাকে অনেকেই বড় কর্পোরেট সংস্থার জন্য সংরক্ষিত প্রযুক্তি বলে মনে করত। বিপুল তথ্যভাণ্ডার, উচ্চমূল্যের পরিকাঠামো এবং বিশেষজ্ঞ কর্মীর প্রয়োজনীয়তার কারণে ছোট ব্যবসার নাগালের বাইরে ছিল এই প্রযুক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আমূল বদলেছে। ‘ক্লাউড’-ভিত্তিক পরিষেবা, ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম মেধা এবং স্বল্প ব্যয়ের বিভিন্ন ডিজিটাল সরঞ্জামের ফলে প্রযুক্তিটি এখন ছোট উদ্যোগগুলির হাতের নাগালেও পৌঁছে গিয়েছে। এখানেই ভারতীয় উদ্যোগগুলির জন্য এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আমাদের দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোগের প্রধান সমস্যা মূলধনের অভাব নয়, উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতা। একজন উদ্যোক্তাকে একই সঙ্গে বিপণন, হিসাবরক্ষণ, গ্রাহক পরিষেবা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের কাজ সামলাতে হয়। ফলে ব্যবসার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। কৃত্রিম মেধা এই জটিলতাকে অনেকাংশে কমাতে পারে।
কয়েক বছর আগেও কৃত্রিম মেধাকে অনেকেই বড় কর্পোরেট সংস্থার জন্য সংরক্ষিত প্রযুক্তি বলে মনে করত। বিপুল তথ্যভাণ্ডার, উচ্চমূল্যের পরিকাঠামো এবং বিশেষজ্ঞ কর্মীর প্রয়োজনীয়তার কারণে ছোট ব্যবসার নাগালের বাইরে ছিল এই প্রযুক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আমূল বদলেছে।
ধরা যাক, একটি ছোট উৎপাদনকারী সংস্থা প্রতিদিন শতাধিক অর্ডার সামলায়। আগে যেখানে মজুতপণ্য গণনা, চাহিদার পূর্বাভাস বা সরবরাহ পরিকল্পনার জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় হত, সেখানে তথ্যভিত্তিক কৃত্রিম মেধা কয়েক মিনিটে সেই বিশ্লেষণ করতে পারে। আবার একটি ভ্রমণ সংস্থা বা খুচরো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, পণ্যের বিবরণ তৈরি করা বা বিপণনের বার্তা প্রস্তুত করার মতো কাজও অনেকাংশে স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব। ফলে উদ্যোক্তা আরও সময় পায়, ভুলের সম্ভাবনা কমে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মঞ্চের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে কৃত্রিম মেধা ভারতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলির জন্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে। এই মূল্য কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে নয়; বরং সময় সাশ্রয়, দক্ষতা বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরির মধ্য দিয়ে অর্জিত হতে পারে।
তবে কৃত্রিম মেধাকে ঘিরে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, প্রযুক্তিটি ব্যবহার করতে গেলে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন। বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপটি প্রযুক্তি কেনা নয়, বরং সমস্যাকে চিহ্নিত করা। যে-ব্যবসা গ্রাহক সংগ্রহে সমস্যায় ভুগছে, তার জন্য বিপণন-সহায়ক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। যে-সংস্থা অতিরিক্ত মজুতপণ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার জন্য চাহিদা বিশ্লেষণ বেশি জরুরি। আবার যাদের কর্মীসংখ্যা সীমিত, তাদের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় গ্রাহক পরিষেবা অধিক কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তির নির্বাচন নয়, ব্যবসায়িক প্রয়োজনের সঠিক নির্ণয়ই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
বিশ্ব অর্থনৈতিক মঞ্চের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে কৃত্রিম মেধা ভারতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলির জন্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে।
এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু উদ্যোক্তা এখনও কৃত্রিম মেধাকে মানবশ্রমের ‘বিকল্প’ হিসাবে দেখেন। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কৃত্রিম মেধা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয় তখনই, যখন তা মানুষের সক্ষমতাকে প্রসারিত করে। দক্ষ কর্মী এবং বুদ্ধিমান প্রযুক্তির সমন্বয়ই আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় সাফল্যের ভিত্তি গড়ে তুলবে। সেই কারণে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে যে সংস্থাগুলি তার কর্মীদের নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শেখাবে, তারাই দ্রুত পরিবর্তিত বাজারে টিকে থাকতে পারবে।
ভারতের প্রেক্ষাপটে আর-একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় ভারত বহুভাষিক বাজার। দীর্ঘ দিন ধরে ডিজিটাল প্রযুক্তির একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, তামিল-সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় কৃত্রিম মেধার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে ছোট শহর ও স্থানীয় উদ্যোগগুলিও এখন ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত হতে পারছে। তবে সুযোগ যত বড়, দায়িত্বও তত বেশি।
তথ্যনিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। উদ্যোক্তাদের বুঝতে হবে, কৃত্রিম মেধা একটি শক্তিশালী সহায়ক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়ভার মানুষের হাতেই থাকবে। প্রযুক্তির উপর অন্ধ নির্ভরতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনই প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও ক্ষতিকর। এ কারণেই প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট কৌশল।
প্রথমে ব্যবসার তথ্যকে ‘ডিজিটাল’ রূপে সংগঠিত করতে হবে। তারপর ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করতে হবে। কোথায় সময় বঁাচছে, কোথায় ব্যয় কমছে এবং কোথায় আয় বাড়ছে, তার পরিমাপ করতে হবে। সাফল্যের প্রমাণ মিললে ধীরে ধীরে ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এই ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতিই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলির জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ দিবসে দঁাড়িয়ে ভারতের উদ্যোক্তাদের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু পণ্যের নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিরও। শুধু মূলধনের নয়, জ্ঞানেরও। শুধু শ্রমের নয়, বুদ্ধিমত্তারও। এক সময় যন্ত্রশক্তি শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি গড়েছিল। পরে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ব্যবসার ধরন বদলে দিয়েছে। বর্তমান দশকে কৃত্রিম মেধা সেই পরিবর্তনের পরবর্তী অধ্যায় রচনা করছে।
এখন, প্রশ্ন একটাই– ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলি কি এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে, না কি পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করবে? যারা এখনই প্রস্তুতি শুরু করবে, আগামী দিনের বাজার তাদের জন্যইনতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। কারণ ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় পুঁজি হয়তো আর কেবল অর্থ হবে না; হবে জ্ঞান, তথ্য এবং কৃত্রিম মেধাকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।
(মতামত নিজস্ব)
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
থালা ফর আ রিজন! মেসি-এমবাপে-হালান্ডদের সৌজন্যে ধোনিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ফিফার
-
অভিষেকের বিমানভাড়া-সহ তৃণমূলের তহবিলে নজর, কলকাতার ৫ জায়গায় ইডির অভিযান
-
৩৮ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন! আহমেদাবাদ বিস্ফোরণে অপরাধীদের সাজা বহাল হাই কোর্টের
-
প্রেমিকের সঙ্গে মিলে স্বামীকে ছাদ থেকে ধাক্কা, স্যালাইনে টয়লেট ক্লিনার! গ্রেপ্তার নার্স স্ত্রী
-
‘কাকে কীভাবে সোজা করতে হয় জানি’, বারুইপুর কাণ্ডে বিরোধীদের ভূমিকায় ‘নাটক’ দেখছেন দিলীপ