দেশের ‘ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস’ ব্যবস্থা তথা ‘ইউপিআই’-এর উপর মাশুল চাপানো এবং রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১০০ শতাংশ শুল্কের খঁাড়ার কোপ– কাকতলীয়ভাবে একসঙ্গে ঘটল। দু’টি ঘটনাই সাধারণ ভারতবাসীর কাছে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা। গত এক-দেড় বছর ধরে ভারতীয় অর্থনীতিতে (Indian Economy) এমন কিছুই ঘটছে না যাতে একটু আশার আলো দেখা যেতে পারে।
শিল্প-কলকারখানায় লগ্নি আসছে না। বেকারত্ব ঘরে ঘরে। বেসরকারি ক্ষেত্রে বেতন বাড়ার সুযোগ তো নেই, উল্টে যখন-তখন ছঁাটাই শুরু হয়ে যাচ্ছে। সরকারি ক্ষেত্রে নিয়োগ নেই। মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের বড় অংশের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি সংস্থাগুলি লাগাতার লগ্নি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সূচকগুলো নেতিয়ে পড়ে আছে। বিশ্বে চলতে থাকা দুটো যুদ্ধের প্রেক্ষিতে দীর্ঘ দিন ধরে পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস, ভোজ্য তেল-সহ সমস্ত জিনিসের চড়া দাম। এই সার্বিক মনখারাপ করা পরিস্থিতির মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত ‘ইউপিআই’-তে ০.৪ শতাংশ মার্চেন্ট ‘ডিসকাউন্ট রেট’ বা ‘এমডিআর’ বসিয়ে দিল এবং ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া বিলে স্বাক্ষর করে দিলেন। ভারতীয় অর্থনীতিতে দুটোরই অভিঘাত চরম বিপর্যয়কর হতে পারে।
ট্রাম্পের শুল্কের ধাক্কায় ভারতের অর্থনীতিতে কী কী প্রভাব পড়বে– তার একটা ধারণা আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই রয়েছে। আমেরিকায় ভারতীয় পণ্যের রফতানি কমতে শুরু করলেই সাধারণত দেশে বস্ত্র, ওষুধ, অলংকার, রাসায়নিক, গাড়ির যন্ত্রাংশ ইত্যাদি শিল্পে একটার পর একটা ঝঁাপ বন্ধ হতে থাকে। উৎসবের মরশুমে এটা নিঃসন্দেহে বড় চাপ। এই উৎসবের মধ্যেই আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে নরেন্দ্র মোদি ‘ইউপিআই’-তে ‘এমডিআর’ চালু করে দিচ্ছেন। ‘ইউপিআই’ এখন ভারতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ‘ইউপিআই’ ছেড়ে যদি দেশকে ফের নগদ লেনদেনের দিকে যাত্রা করতে হয়, তাহলে তার প্রভাব বিক্রিবাটায় মারাত্মকভাবে পড়বে। চাহিদার অভাবে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি এবার শুয়েও পড়তে পারে।
ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডে চড়া হারে ‘এমডিঅার’ থাকায় পাড়ার দোকানগুলি অার কার্ডে টাকা নিতে চায় না।
কী এই ‘এমডিআর’? এটি হল একটি পরিষেবা মাশুল, যা কোনও ডিজিটাল লেনদেনের জন্য ব্যবসায়ীকে ব্যাঙ্ক ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারকে দিতে হয়। ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডে এই এমডিআর চালু আছে। ক্রেডিট কার্ডে প্রতিটি লেনদেনের জন্য বেশ চড়া হারে, দেড় থেকে দু’-শতাংশ পর্যন্ত ব্যবসায়ীকে এমডিআর দিতে হয়। ডেবিট কার্ডের ক্ষেত্রে এটা ০.৯ শতাংশ। কিন্তু ‘ইউপিআই’ এত দিন ছিল ‘এমডিআর’ শূন্য। ১৫ অক্টোবর থেকে ২ হাজার টাকার বেশি প্রতিটি বাণিজ্যিক লেনদেনে ব্যবসায়ীকে দিতে হবে ০.৪ শতাংশ ‘এমডিআর’। তবে এর সর্বোচ্চ সীমা বা ক্যাপ হল ৩০০ টাকা। ৭৫ হাজার টাকা বা তার বেশি মূল্যের প্রতিটা লেনদেনে স্থির হারে এই ৩০০ টাকা ব্যবসায়ীকে দিতে হবে।
‘এমডিআর’-এর উপর বসবে ১৮ শতাংশ জিএসটিও। যদিও দু’জনের মধ্যে ব্যক্তিগত লেনদেনে ‘এমডিআর’ বসছে না। এটা এখনকার মতোই ফ্রি থাকছে। ২ হাজার টাকার নিচের বাণিজ্যিক লেনদেনও ফ্রি থাকছে। যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মাসিক বিক্রি ১ লক্ষ টাকার কম, তঁাদের ছাড় দেওয়া হবে এমডিআর থেকে। ইউটিলিটি বিল– যেমন, বিদ্যুৎ, জল, গ্যাস,টেলিকম, ট্রেনের টিকিট, বিমার প্রিমিয়াম, পেট্রোল-ডিজেলের দাম ইত্যাদি ক্ষেত্রে ‘ইউপিঅাই’ লেনদেনের অঙ্ক যাই হোক না কেন, ‘এমডিআর’ হবে ৫ টাকা। এত সব ছাড়ের পরেও ‘ইউপিআই’-এর উপর ‘এমডিআর’ চাপানোর সিদ্ধান্ত দেশবাসীকে বিচলিত করে তুলেছে। পেট্রল পাম্প মালিকরা বলছেন, তঁারা অার ‘ইউপিঅাই’-তে বিক্রি করবেন না। অাসলে শেষ পর্যন্ত ‘এমডিঅার’ বা মাশুল ‘ইউপিঅাই’ প্রক্রিয়ায় একটি বাধা। প্রাথমিকভাবে ছোট দোকানদাররা অার ‘ইউপিঅাই’-তে টাকা নিতে চাইবেন না। পরবর্তী কালে ‘এমডিঅার’-এর বোঝা ক্রেতাদের উপর চাপবে। এবং ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে ‘এমডিঅার’-এর হারও বাড়তে থাকবে।
ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডে চড়া হারে ‘এমডিঅার’ থাকায় পাড়ার দোকানগুলি অার কার্ডে টাকা নিতে চায় না। দোকানে দোকানে পিওএস মেশিনের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। শপিং মলে বড় বড় দোকানে এবং অনলাইন শপিংয়ে এখন একমাত্র কার্ড চলে। কার্ডকে জনপ্রিয় রাখতে তারা স্পর্শবিহীন ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’ পদ্ধতি নিচ্ছে। অধিকাংশ ছোট দোকানে ‘ইউপিঅাই’-এর মাধ্যমে রুপে ক্রেডিট কার্ডেও অার টাকা দেওয়া যায় না। চড়া ‘এমডিঅার’ লাগে বলে ‘ইউপিঅাই’-তেও রুপে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পেমেন্টের সুযোগটি অধিকাংশ দোকান হালে ব্লক করে দিচ্ছে। বিশেষত পাড়ার ওষুধের দোকানগুলিতে তো ক্রেডিট কার্ডে ‘নৈব নৈব চ’। ওষুধের দোকানগুলির মধে্য ডিসকাউন্ট দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। ফলে ডিসকাউন্টের উপর তাদের অার এমডিঅার দেওয়ার ক্ষমতা থাকছে না।
‘ইউপিঅাই’ চালু হওয়ার পর গত এক দশকে দেশে প্লাস্টিক মানি তথা কার্ডের ব্যবহার ক্রমশ কমেছে। মানি ব্যাগে থাকা সবার ডেবিট কার্ডেই ছাতা পড়ে গিয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও কোনও অংশ থেকে ‘এমডিঅার’ বসানোর সপক্ষে যুক্তি হিসাবে বলা হচ্ছে, এবার অার অামেরিকা বলতে পারবে না যে, ভারতের ‘ইউপিঅাই’ নীতি মুক্ত বাণিজে্যর পরিপন্থী।
‘ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’ তথা ‘এনপিসিঅাই’ ভারতের নিজস্ব রুপে কার্ড ‘ইউপিঅাই’-এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার পর এখন সাবেক ক্রেডিট কার্ডও খুব একটা পকেট থেকে বের করার প্রয়োজন পড়ে না। অনলাইন শপিং ও মোবাইলে ‘কিউঅার কোড স্ক্যান’ করে রুপে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুবিধা বাজারে লেনদেনের ক্ষেত্রে একটা বড় গেম চেঞ্জার। কাগজের নোট থেকে ‘প্লাস্টিক মানি’-র যুগ পেরিয়ে অামরা ‘ভার্চুয়াল মানি’-র যুগে এসে পড়েছি। সব ব্যাঙ্ক এখন গ্রাহকদের ‘লাইফটাইম ফ্রি’ রুপে ক্রেডিট কার্ড দিচ্ছে। ভারতের ‘ইউপিঅাই’ নির্মাতা সংস্থা একমাত্র রুপে কার্ডকেই গুগ্ল পে, পেটিএম, ফোন পে ইত্যাদি ‘ইউপিঅাই’ অ্যাপের সঙ্গে জোড়ার অনুমতি দিয়েছে।
এই ‘ভার্চুয়াল মানি’-র যুগে সবচেয়ে বিপন্ন মার্কিনি মাস্টার ও ভিসা কার্ড। যেহেতু মাস্টার ও ভিসা কার্ডকে ভারত সরকার ‘ইউপিঅাই’ অ্যাপে জোড়ার অনুমতি দেয়নি তাই ভার্চুয়াল মানির ব্যবহার বাড়ায় ভারত থেকে এদের অায় খুব কমে গিয়েছে। ভিসা ও মাস্টার কার্ডের হয়ে ব্যাট করতে নেমেছে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ। ‘এনপিসিঅাই’ ভারতের ‘ইউপিঅাই’ ও ‘রুপে কার্ড’-কে যে সুবিধা দেয়, তাকে ট্রাম্পের বাণিজ্য দফতর কিছুদিন ধরে ভারতের ‘সংরক্ষণবাদী’ নীতি বলে অাসছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই ভিসা ও মাস্টারকার্ড ‘ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টিটিভ’-এর কাছে ভারতের ‘এমডিঅার’-শূন্য ‘ইউপিঅাই’ নীতি নিয়ে বারবার অভিযোগ জানিয়েছিল।
ফলে সে-কারণেই এখন অভিযোগ উঠেছে, ট্রাম্পের চাপেই মোদি ‘ইউপিঅাই’-তে ‘এমডিঅার’ বসাতে বাধ্য হলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও কোনও অংশ থেকে ‘এমডিঅার’ বসানোর সপক্ষে যুক্তি হিসাবে বলা হচ্ছে, এবার অার অামেরিকা বলতে পারবে না যে, ভারতের ‘ইউপিঅাই’ নীতি মুক্ত বাণিজে্যর পরিপন্থী। দেশীয় সরকারি ইকোসিস্টেমকে অালাদা সুবিধা দিয়ে ভারত অান্তর্জাতিক বাণিজে্যর নিয়ম লঙ্ঘন করছে এই অভিযোগও তোলা যাবে না। ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির খসড়া তৈরির ক্ষেত্রেও এটি অন্যতম শর্ত হিসাবে কাজ করছে বলে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে।
গুগ্ল পে-এর মালিক গুগল এবং ফোন পে’র মালিক মার্কিন সংস্থা ওয়ালমার্ট। পেটিএম ভারতীয় সংস্থা হলেও এতে মার্কিন লগ্নি রয়েছে।
‘এমডিঅার’-এর ভাগ পাবে ব্যাঙ্ক, ‘এনসিপিঅাই’ ও ‘ইউপিঅাই’ অ্যাপগুলি। সরকারের দাবি ব্যাঙ্ক ও ‘এনসিপিঅাই’ এই টাকা দিয়ে ‘ইউপিঅাই’ পরিকাঠামোকে অারও উন্নত করতে পারবে। এ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। ‘ইউপিঅাই’ বিনামূলে্য চালানোর জন্য ব্যাঙ্কগুলির হাতে যথেষ্ট অর্থ রয়েছে বলে দাবি। তাছাড়া সরকারি ভরতুকিও অাছে। ‘এনসিপিঅাই’ ইতিমধে্য একটি লাভজনক সংস্থা। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগ এমডিঅার-এ সবচেয়ে উপকৃত হবে গুগ্ল পে, ফোন পে-এর মতো মার্কিন সংস্থাগুলি।
গুগ্ল পে-এর মালিক গুগল এবং ফোন পে’র মালিক মার্কিন সংস্থা ওয়ালমার্ট। পেটিএম ভারতীয় সংস্থা হলেও এতে মার্কিন লগ্নি রয়েছে। রাহুল এমডিঅার-কে বলছেন ভারতবাসীর উপর ‘ইউপিঅাই ট্যাক্স’ এবং এই ট্যাক্সের সিংহভাগ টাকা চলে যাবে অামেরিকা। অভিযোগটা একেবারে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
ভিসা ও মাস্টারকার্ডের চাপে ও মুক্ত বাণিজ্য নীতিকে সম্মান জানিয়ে ভারত যখন তাদের নিজস্ব ‘ইউপিঅাই’ ব্যবস্থাকে ফ্রি রাখার নীতি থেকে সরে অাসছে, তখন অামেরিকা কিন্তু অান্তর্জাতিক বাণিজে্যর নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে রাশিয়ার থেকে জ্বালানি কেনার অপরাধে ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে সেই প্রশ্নটাই ঘুরে ফিরে অাসে যে, অামরা কেন বারবার অামাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সঙ্গে অাপস করব? ভিসা ও মাস্টারকার্ডকে যখন অামাদের নিজস্ব ‘ইউপিঅাই’ ও ‘রুপে কার্ড’ টেক্কা দিচ্ছে, তখন তাদের গতি কেন এইভাবে রুদ্ধ করার চেষ্টা হবে? ‘ভার্চুয়াল মানি’-র দিকে দ্রুতবেগে ছুটে চলা অর্থনীতির মুখ কেন নগদ লেনদেনের দিকে ফেরানোর সামান্যতম
চেষ্টা হবে?
সর্বশেষ খবর
-
বিহারের পর ওড়িশায় যুগলের পথ আটকে হেনস্তা, মারধর-অশ্লীল আচরণ, প্রকাশ্যে ভিডিও
-
মুকুন্দপুরে ধুন্ধুমার, বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষে ডিমবৃষ্টি, পৌঁছল পুলিশ
-
‘এক বার জো ম্যায়নে কমিটমেন্ট’, সলমনের সংলাপে জাতীয় পুরস্কারের আসর মাতাল ‘অঙ্ক কি কঠিন’-এর খুদেরা
-
আমেরিকা-ডেনমার্ক-গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে ‘অনন্ত’ চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পের, উঠছে বহু প্রশ্ন
-
বাসে-ট্রেনে রোজ অফিস যাতায়াতে কোমর-ঘাড়ের কাহিল দশা? বদলে ফেলুন এই ৭ অভ্যাস