Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Poverty

‘দারিদ্র্য’ ও ‘অনাহার’, একই মুদ্রার দুই পিঠ, অপুষ্টির ছায়ায় লেপ্টে দেশ!

তার নাম ‘অপুষ্টি’। প্রায় ৮ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যে দিন গুজরান করে এ-দেশে, ১০ কোটি মানুষ রোজ ভরা পেটে শুতে যাওয়ার সুখ থেকে বঞ্চিত, সেখানে ভাত-রুটির পাতে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল্‌সে পুষ্ট খাবার সাজিয়ে পুষ্টি নিশ্চিত করা সোজা নয়। পরিণতি: ৫ অনূর্ধ্ব শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশের বয়স মোতাবেক বৃদ্ধি নেই। ১-৭ সেপ্টেম্বর পালিত হল ‘জাতীয় পুষ্টি দিবস’।

চিরঞ্জীব রায়
চিরঞ্জীব রায়

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১৬:০৪

link
চিরঞ্জীব রায়
চিরঞ্জীব রায়

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১৬:০৪

options
link
‘দারিদ্র্য’ ও ‘অনাহার’, একই মুদ্রার দুই পিঠ, অপুষ্টির ছায়ায় লেপ্টে দেশ! zoom
প্রতীকী।
Advertisement

‘দারিদ্র্য’ এবং ‘অনাহার’। একই মুদ্রার দুই পিঠ। অনাহার অপুষ্টির দূত। এই প্রেক্ষিতে একটি দেশীয় বাগধারা প্রাসঙ্গিক, ‘একে মা ভাত রঁাধে না।/ তার আবার তপ্ত আর পান্তা’। যে-দেশে অনাহার নির্মূল করা যায়নি, সেখানে অপুষ্টি নিয়ে মাথা ঘামানো চিন্তাশক্তির অপচয় মাত্র। বহুকাল ধরে শাসিত ও শোষিত ভারতের গল্পটা এমনই ছিল। ১৯৪৭ সালে লাল কেল্লায়
যখন তেরঙা উড়ছে, তখনও পর্যাপ্ত ফসলের অভাব, নাছোড়বান্দা খরা এবং ব্যাপক অনাহার ও অপুষ্টির সমস্যা আকাশ ছেয়ে আছে।

ম্লান এই কাহিনি মোড় নিল ছয়ের দশকে, ‘সবুজ বিপ্লব’ বা ‘গ্রিন রেভোলিউশন’-এর দৌলতে। খাদ্যশস্য, মূলত গম ও চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারত স্বনির্ভরতা অর্জন করায়– অনাহারে লাগাম পড়ানো গেল। কিন্তু দু’-বেলার ভাত-রুটির বন্দোবস্ত হলেও এক নতুন সমস্যা উঁকি দিল। শর্করায় ভরা খাবারে পেট তো ভরল, ক্যালোরির চাহিদা মিটল, কিন্তু, বিশেষ করে শিশুদের, অপুষ্টির সমাধান অধরা রয়ে গেল। খাদ্যের সুরক্ষা থেকে পুষ্টির সুরক্ষায় মনোযোগ সরাতে লেগে গেল আরও কয়েক বছর, ’৭৫ সালে ‘ইন্টিগ্রেটেড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস’ পর্যন্ত। আরও ২০ বছর পরে মিড-ডে মিল প্রকল্পের মাধ্যমে স্রেফ খাবার নয়, পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেল।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

বলা বাহুল্য, যে-দেশে প্রায় ৮ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যে দিন গুজরান করে, ১০ কোটি মানুষ রোজ ভরা-পেটে শুতে যাওয়ার ন্যূনতম সুখ থেকে বঞ্চিত, ভাতের পাতে খানিক শাকপাতা বা খাল-ছেঁচা চুনোপুঁটি জুটলে স্বর্গ পায়, সেখানে ভাত-রুটির পাতে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল্‌সে পুষ্ট খাবার সাজিয়ে পুষ্টি নিশ্চিত করা সোজা নয়। এবং এই অপুষ্টির ছোবলেই ৫ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশের বয়স মোতাবেক বৃদ্ধি নেই। ৩২ শতাংশের ওজন কম। রক্তাল্পতায় ভোগে ১০০-র মধ্যে ৬৭টি শিশুই।

বিপরীত চিত্রটি হল, পুষ্টির সঙ্গে ছেলেখেলা করে অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে স্থূলতায় ভোগে ২৪ শতাংশ মহিলা ও ২২ শতাংশ পুরুষ। ৫৭ শতাংশ নারী এবং ২৫ শতাংশ পুরুষ অ্যানিমিয়ার শিকার।

অপুষ্টির আর-একটি কারণ ‘কন্যাদায়’ থেকে ‘মুক্তি’-র তাগিদে কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ।

আধুনিক নাগরিক জীবন গোদের উপর বিষফোড়ার মতো অপুষ্টির সমস্যা দ্বিগুণ
করে ছেড়েছে। সমস্যা ছিল কোনও মতে পেট ভরানো খাবারে মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্টসের অভাব নিয়ে; কিন্তু পেট ভরানো যাদের কাছে বিলাসিতা, তারা অস্বাস্থ্যকর এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারকে দিনযাপনের অঙ্গ করে নিয়ে পুষ্টিহীনতার পতাকা উড়িয়ে দিল। দুদ্দাড় করে বাড়তে লাগল স্থূলতা, ডায়াবেটিস ইত্যাদি প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পক্ষে মোক্ষম অসুখ! ফলে, অপুষ্টির সমস্যাটা রয়েই গেল– অন্য চেহারা নিয়ে। এতটা খতিয়ে দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভারতে অপুষ্টির সমস্যা যতটা পরিকাঠামোগত এবং অর্থনৈতিক, ততটাই এক সামাজিক এবং জীবনশৈলী সংক্রান্ত আপদ।

কম আয়ের পরিবার পাতে ডাল, ফল, দুধ, মাছ-মাংসের আকারে পুষ্টি পায় না বললেই চলে। আম ভারতীয়ের খাবারের ৭০ শতাংশই ভরে থাকে ভাত-রুটির মতো কার্বোহাইড্রেটে। তার পরিণতি– প্রোটিন এবং আয়রন, ভিটামিন বি ১২, ভিটামিন এ-র নিদারুণ ঘাটতি। শুনতে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে অসচেতনতা, এমনকী তুমুল অবজ্ঞাও অপুষ্টির ইন্ধন রূপে কাজ করে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, নিষ্কাশন ব্যবস্থার ও পরিচ্ছন্নতার অপ্রতুলতা বয়ে আনে। পাকস্থলী ও অন্ত্র ক্রমাগত সংক্রমণে ভুগতে থাকে। ফলে সুষম খাবার পেটে গেলেও শরীর পুষ্টি শুষে নিতে পারে না।

অপুষ্টির আর-একটি কারণ ‘কন্যাদায়’ থেকে ‘মুক্তি’-র তাগিদে কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ। এর ফলে শিশুটিও জন্মাচ্ছে কম ওজন এবং অপুষ্টি নিয়ে। এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম পুষ্টিহীনতার ধারাবাহিকতা বয়ে নিয়ে চলেছে। এ-দেশে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবনাচিন্তার তেমন রেওয়াজ নেই। তাই, যার সাধ্য নেই সে ভাতের পাশে ডাল জোগাতে পারছে না, কিন্তু যার সাধ্য আছে এবং খাদ্যবিধি নিয়ে সম্যক জ্ঞান থাকাও উচিত ছিল, তার দিন কাটছে ঘড়ি না মেনে চিপ্‌স, কোল্ড ড্রিংক, বার্গার, বিরিয়ানির মতো খাবারে জীবনের মানে খোঁজা এবং শরীরটাকে মেদ আর শর্করার গুদামঘর বানিয়ে, বা বলা ভাল, রাজ্যের রোগের ডিপো করে তোলায়।

প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের উন্নয়নশীল এক দেশে রাতারাতি অপুষ্টির মতো সাগরপ্রমাণ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে’-র মতো সরাসরি অপুষ্টিতে মৃত্যু না হলেও শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় অপুষ্টিরই কারণে। এবং ৫ বছরের কম বয়সের শিশুর মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই পরোক্ষে দায়ী থাকে অপুষ্টি। অপুষ্টির অবদান কেবল এতেই সীমাবদ্ধ নয়। তার বিষ ছড়ায় দেশের অর্থনীতি থেকে সমাজের সর্বত্র। অপুষ্টিজনিত দুর্বলতা ও অসুস্থতার ফলে কর্মক্ষমতা কমে যায়, এবং তার জেরে দেশের বার্ষিক মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যায় ২-৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যেটা বড় কম নয়। অপুষ্টি ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, স্থূলতা সমেত হাজারো রোগের বীজ বুনে চিকিৎসাজনিত ব্যক্তিগত এবং সরকারি খরচের বহর বাড়ায়। তার ছাপ পড়ে অর্থনীতিতে। শিশুর অপুষ্টি তার মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটতে দেয় না। তার প্রভাব পড়ে এক ব্যক্তির শিক্ষার সক্ষমতা এবং তার আয়ের এবং ব্যাপকার্থে দেশের মানবসম্পদের উপর।

প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের উন্নয়নশীল এক দেশে রাতারাতি অপুষ্টির মতো সাগরপ্রমাণ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আগে খাবারের সংস্থান করে অতঃপর অপুষ্টির দিকে নজর ফেরাতে সময়ও কিছু খরচ হয়েছে। তবে, দেরি করে হলেও ২০১৮ সালে গুরুত্বের সঙ্গে ‘পোষণ অভিযান’ বা ‘ন্যাশনাল নিউট্রিশন মিশন’ শুরু হয়। ‘আইসিডিএস’ অঙ্গনওয়াড়ি ব্যবস্থার মাধ্যমে পুষ্টির দিকে নজর ফিরেছে। মিড-ডে মিল-সহ নানা জনবণ্টন ব্যবস্থায় সাধ্যমতো পুষ্টির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এর বাইরেও ডাল, জোয়ার, বাজরা, রাগি, ভুট্টা সমেত বিভিন্ন পুষ্টিকর শস্য এবং তৈলবীজ চাষে সরকারি স্তরে উৎসাহ ও সাহায্য দেওয়া উচিত। বিশেষ নজর দেওয়া উচিত গর্ভবতী মহিলা, সদ্যোজাত ও শিশুর পুষ্টির ক্ষেত্রে। শুদ্ধ পানীয় জল, সুষ্ঠু নিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতা এ-দেশে গুরুত্ব বড় কম পায়। সুরাহা হওয়া উচিত সেক্ষেত্রেও। আর, সবথেকে জরুরি হল, স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, শাকপাতা থেকে বার্গার খাওয়া সমস্ত পরিবারের। তার জন্য পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রচার চাই, আর চাই স্কুল থেকে শুরু করে সমস্ত পাঠ্যক্রমের সিলেবাসে পুষ্টি-সমন্ধীয় বিষয়টিকে যথোচিত গুরুত্ব দেওয়া। ‘জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ’ পালনেরও উদ্দেশ্যও সেটাই, দেশবাসী অপুষ্টিতে ভুগলে দেশও তাতে সংক্রমিত হবে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই সচেতনতা গড়ে তোলা।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.