গত শতকের চারের দশকে ভারত-ভাগের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার সময়পর্ব থেকে মহম্মদ আলি জিন্না যে দুরারোগ্য (তৎকালে) ব্যাধি যক্ষ্মায় আক্রান্ত, তা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। সৌজন্যে বম্বের দু’জন পার্সি চিকিৎসক। এই মন্ত্রগুপ্তির জন্যই পাকিস্তান সৃষ্ট হতে পেরেছে দাবি করে ও-দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ ‘অসামরিক সম্মান’ দু’জন চিকিৎসককে দেওয়া হবে। এর নেপথ্যের কারণ কী? লিখছেন, সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়।
১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ ‘পাকিস্তান’ সৃষ্টির মাত্র ৩৯৪ দিন পরে মহম্মদ আলি জিন্নার (Muhammad Jinnah) মৃত্যু হয়। তবে গত শতকের চারের দশকে ভারত-ভাগের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার সময়পর্ব থেকে তিনি যে দুরারোগ্য (তৎকালে) ব্যাধি যক্ষ্মায় আক্রান্ত, তা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। ৭৮ বছর
আগে ‘পাকিস্তানের জনক’-এর মৃত্যু হলেও সম্প্রতি পাকিস্তান সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জিন্নার দুই ব্যক্তিগত চিকিৎসক– জল রতনজি প্যাটেল এবং রেডিওলজিস্ট জল ডি. দাবু-কু-কে তাদের দেশের সর্বোচ্চ অ-সামরিক সম্মানের অন্যতম, ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’ প্রদান করবে।
আরও পড়ুন:
মুম্বইয়ের এই দুই পার্সি চিকিৎসককে ২০২৭ সালের ২৩ মার্চ, পাকিস্তান দিবসে, মরণোত্তর সম্মান দেওয়ার কারণ– পেশাগত শপথের কারণে এঁরা অজান্তেই পাকিস্তান-সৃষ্টিতে অবদান রেখে গিয়েছেন। পাকিস্তানের মন্ত্রী আহসান ইকবাল চৌধুরী সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড লুইস মাউন্টব্যাটেন স্বীকার করেছিলেন– জিন্না কতটা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন তা যদি তিনি জানতেন, তবে হয়তো দেশভাগের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতেন; আর তা ঘটলে ইতিহাসের গতিপথ বদলে যেতে পারত, পাকিস্তানের সৃষ্টিই ঝুঁকির মুখে পড়ত। চৌধুরী সাহেব আরও উল্লেখ করেন, সংকটময় মুহূর্তে পেশাগত গোপনীয়তা বজায় রেখে ওই দু’জন চিকিৎসক নীরবে অসাধারণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নার জীবনীগ্রন্থ ‘জিন্নাহ অফ পাকিস্তান’-এ স্ট্যানলি উলপার্ট উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই এই রাষ্ট্রনায়কের শরীরে রোগটি ধরা পড়েছিল, যা কেবল তাঁর বোন ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তিই জানতেন। জিন্নার ধারণা হয়েছিল, এই অসুস্থতার কথা জানাজানি হলে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারে বিঘ্ন ঘটতে পারে। আকবর আহমেদও ‘জিন্নাহ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইসলামিক আইডেনটিটি দ্য সার্চ ফর সালাদিন’ বইটিতেও এ তথ্যের সমর্থন রয়েছে।
ও-দেশের প্রবীণ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. গোলাম নবি কাজি ‘ডেইলি টাইমস’-এ প্রকাশিত ‘মিস্টার জিন্নাহ অ্যান্ড হিজ সিক্রেট ব্যাটল আগেইনস্ট টিউবারকিউলোসিস’ শীর্ষক নিবন্ধে বর্ণনা করেন, জিন্না কীভাবে একই সঙ্গে দু’টি লড়াই চালাচ্ছিলেন– একটি পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য, এবং অন্যটি যক্ষ্মার বিরুদ্ধে। তাঁর বক্তব্য, শেষ পর্যন্ত জিন্না এই রোগের কাছে হার মানলেও, প্রাণঘাতী হয়ে ওঠা রেগাটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও দৃঢ়। পাশাপাশি ল্যারি কলিন্স এবং ডমিনিক লাপিয়ের ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ বইতে ইঙ্গিত দিয়েছেন, দেশভাগ এড়ানো সম্ভব হত– যদি জিন্নার অসুস্থতার বিষয়টি– যেটিকে তাঁরা সে-সময়ের ‘ভারতের সবচেয়ে গোপন রাখা বিষয়’ বলে বর্ণনা করেছেন– সর্বসমক্ষে প্রকাশ করা হত। তথ্য অনুযায়ী, জিন্নার এক্স-রে রিপোর্টটি একটি চিহ্নহীন খামে ভরে বম্বের (তখনকার নাম) চিকিৎসক ডাক্তার প্যাটেলের অফিসে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছিল। এই ডাক্তার প্যাটেলকে জিন্না অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন। চিকিৎসকরা তাঁকে আর মাত্র কয়েক বছর বেঁচে থাকার সময়সীমা দিয়েছিলেন, যার ফলে তিনি কার্যত ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মতোই’ জীবনযাপন করছিলেন।
পাকিস্তানের প্রবীণ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. গোলাম নবি কাজি ‘ডেইলি টাইমস’-এ প্রকাশিত ‘মিস্টার জিন্না অ্যান্ড হিজ সিক্রেট ব্যাটল আগেইনস্ট টিউবারকিউলোসিস’ শীর্ষক নিবন্ধে বর্ণনা করেন, জিন্না কীভাবে একই সঙ্গে দু’টি লড়াই চালাচ্ছিলেন– একটি পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য, এবং অন্যটি যক্ষ্মার বিরুদ্ধে।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর জিন্নার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটে; কারণ বিশ্বমঞ্চে আপন অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টায় থাকা একটি নবীন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার গুরুদায়িত্ব তাঁর স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষত, ১৯৪৮ সালের জুলাই মাসে তাঁর ফুসফুসে জটিল পর্যায়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। ডা. কাজির নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্না যখন করাচির গভর্নমেন্ট হাউসে পৌঁছন, তখন একজন কর্নেল তাঁকে আশ্বস্ত করতে জানিয়েছিলেন, একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে এবং তিনি বেঁচে যাবেন। কিন্তু জিন্না কেবল বলেছিলেন, ‘না, আমি বাঁচব না’– এবং সে রাতেই শেষ শ্বাস ত্যাগ করেন। যার ফলে সদ্যোজাত একটি নবীন রাষ্ট্র অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
কী বৈপরীত্য– ধর্মের ব্যাপারে অনাগ্রহী জিন্না কয়েক বছরের মধ্যে গণ-চোখে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি নষ্ট করে, আলাদা ইসলামিক রাষ্ট্রের দাবি তুলে, লড়ে গেলেন, এবং ইতিহাসের পাতায় দেশভাগের জন্য দায়ী হয়ে রইলেন। রাজনৈতিক কারণে তাঁর বাহ্যিক ধর্মীয় আচরণেও সেই ছাপ পড়ে। এমত পরিবর্তনের ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও। ১৯১৮ সালে মহম্মদ আলি জিন্না তাঁর বন্ধু বিশিষ্ট ধনী পার্সি ব্যারোনেট ‘স্যর’ দীনশ মানেকজি পেটিটের কন্যা রত্তনবাই পেটিটকে (রুত্তি) বিয়ে করেন। রুত্তির পরিবার, তৎসহ পার্সি সম্প্রদায়ের পাশাপাশি কিছু মুসলিম ধর্মীয় নেতার থেকেও এই বিয়েতে ব্যাপক বিরোধিতা হয়েছিল। ধর্ম ছাড়াও জিন্না-রুত্তির বিয়ের ক্ষেত্রে অন্য অন্তরায় হল: দু’জনের বয়সের প্রায় ২৪ বছরের পার্থক্য। প্রবল বিরোধিতা স্বত্ত্বেও জিন্না ও রুত্তি উভয়েই অবিচল থাকায় বিয়ে আটকানো যায়নি।
রুত্তি নামমাত্র ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং ‘মরিয়ম জিন্না’ নামটি গ্রহণ করেছিলেন। যদিও সে-নাম সেভাবে কখনও ব্যবহার করেননি। এদিকে, জিন্না-কন্যা দিনা যখন একজন অ-মুসলিম পাত্র শিল্পপতি নেভিল ওয়াদিয়াকে (জন্মগতভাবে পার্সি এবং পরে খ্রিস্টান) বিয়ে করতে চাইলেন, বেঁকে বসলেন জিন্না। রুত্তির সঙ্গে নিজের বিয়ের দু’-দশকের ব্যবধানে ধর্মনিরপেক্ষ উদার জিন্না সাম্প্রদায়িক মুসলিম নেতায় পরিণত হয়েছেন যে! আশঙ্কিত হন, পাছে মেয়ের বিয়ে নিয়ে মুসলীম লীগ চটে যায়! ফলে জিন্না স্বয়ং মেয়ের উপরে চটলেন। বিয়ে আটকাতে চেষ্টা করলেন। এবং ব্যর্থ হলেন।
১৯১৮ সালে মহম্মদ আলি জিন্না তাঁর বন্ধু বিশিষ্ট ধনী পার্সি ব্যারোনেট ‘স্যর’ দীনশ মানেকজি পেটিটের কন্যা রত্তনবাই পেটিটকে (রুত্তি) বিয়ে করেন। রুত্তির পরিবার, তৎসহ পার্সি সম্প্রদায়ের পাশাপাশি কিছু মুসলিম ধর্মীয় নেতার থেকেও এই বিয়েতে ব্যাপক বিরোধিতা হয়েছিল।
দেশভাগের আগেই, ১৯৩৮ সালে দিনা-নেভিলের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তখন থেকেই বাপ-মেয়ের অবস্থান একেবারে দুই মেরুতে। পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ দূরস্থান, ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে জিন্নার মৃত্যুর পরে বাবার শেষকৃত্যে যাওয়ার আগে পর্যন্ত পাকিস্তানের মাটিতে পা দেননি দিনা ওয়াদিয়া। তাঁর দ্বিতীয়বারের পাকিস্তান সফর ২০০৪ সালে, পুত্র নুসলি এবং নাতিদের সঙ্গে। সেবার লাহোরে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচও দেখেন তিনি। ওই সফর ঘিরে পাকিস্তানে কৌতূহল ছিল। তবে তিনি বা তাঁক পরিবারের কেউই সে-দেশে বিতর্কিত বিষয়ে মুখ খোলেননি। ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর নিউ ইয়র্কে দিনার মৃত্যু হলেও মহম্মদ আলি জিন্নার শিকড় এখনও ছড়িয়ে রয়েছে এই ভারতেরই মাটিতে। সেই পরিবার মুম্বইকে ভিত্তি করা এ-দেশের একটি বিশিষ্ট শিল্পগোষ্ঠী। দিনার পুত্র নুসলি ওয়াদিয়ার দিকে এ-দেশের নিন্দুকরা অনেক সময়ই সন্দেহের আঙুল তুলেছেন ‘জিন্নার নাতি’ বলে।
এক সময় তাঁর সঙ্গে ধীরুভাই আম্বানির বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল রাজনৈতিক মহল। আবার নুসলির সঙ্গে গেরুয়া শিবিরের ছিল সুসম্পর্ক৷ নানাজি দেশমুখ, অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদবানির সঙ্গে নুসলির ঘনিষ্ঠতার কথা অনেকেরই জানা। ‘জরুরি অবস্থা’-র সময়ে তিনি যেমন জনসংঘের পাশে থেকেছেন তেমনই বিজেপি-র জন্মলগ্নেও নুসলির আর্থিক অবদান অনস্বীকার্য। পাকিস্তানের উদ্যোগে এত দিন পরে দু’জন চিকিৎসককে মরণোত্তর ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’ প্রদান ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি বিস্মৃত অধ্যায় পুনরায় আলোচনায় উঠে এসেছে। চিকিৎসকদ্বয় পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ঠিক কথা। তবে কর্তব্য পালন করে এবং পেশাগত গোপনীয়তা রক্ষা করে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থান নিয়েছিলেন– এমন ধারণা করা বাহুল্য। মহম্মদ আলি জিন্না না থাকলে দেশভাগ হত না কখনও– এমন বলা কি সত্যি সম্ভব? আসলে পুরনো আলোচনা তুলে এনে পাকিস্তান অহেতুক বিতর্ক ও গুঞ্জন সৃষ্টি করতে চাইছে। এর উদ্দেশ্য?
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
কলকাতা লিগের পর এবার নতুন লক্ষ্য, খেতাব ধরে রাখতে আইএফএ শিল্ডের প্রস্তুতি শুরু মোহনবাগানের
-
‘খাম’ নিয়ে টানাটানি অব্যাহত, প্রতীক হাতে রাখতে হাই কোর্টের মামলা নওশাদদের
-
গলায় ১০০-৫০০ নোটের মালা, তেলেঙ্গানায় গণেশের সাজে খরচ ২ কোটি! চোরের ভয়ে ঘুম ছুটেছে উদ্যোক্তাদের
-
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস! গ্রেপ্তার সৌরভ, ১৪ দিনের জেল হেফাজতে ‘মহাভারত’, ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ অভিনেতা
-
গাঁদা-লিলি-টগর ছেড়ে বাগানে আনুন চোখ ধাঁধানো কালো ফুলের গাছ, রইল ৫ প্রজাতির সন্ধান