ভারতের বহু নারী প্রমাণ করেছেন, পরিবেশরক্ষা শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্পের বিষয় নয়। তা, মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক সামাজিক দায়িত্ব। প্রকৃতিকে বঁাচানোর এই সংগ্রামে নারীরা এখন শুধু অংশগ্রহণকারী নন, তাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দিকে দিকে। লিখছেন ঋষিগোপাল মণ্ডল।
ছত্তিশগড়ের খৈরাগড়-ছুইখদান-গন্ডাই জেলার সারা গোন্ডি গ্রামে ৮৫ বছরের দেবলা বাইয়ের কান্না ‘ভাইরাল’ হয়েছিল। ওই অশীতিপরের কান্না স্পর্শ করে গিয়েছিল আমাদের অনেককেই। দেবলা বাইয়ের কান্না দেখে আমাদেরও কান্না পাচ্ছিল। প্রায় ২০ বছর ধরে আপন সন্তানের মতো যত্ন করে একটি অশ্বত্থ গাছ বড় করেছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জমি সমতল করার জন্য গাছটি বেআইনিভাবে কেটে ফেলা হয়। গাছটির পাশে বসে তার কাটা গুঁড়িতে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায় দেওলা বাইকে।
জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, নদীভাঙন, জীববৈচিত্রর ক্ষয়– প্রকৃতির সামনে একের-পর-এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই সংকটের সময়েই ভারতের নানা প্রান্তে অসংখ্য নারী নিঃশব্দে গড়ে তুলছেন পরিবেশ রক্ষার অনন্য আন্দোলন। তঁারা শুধু গাছ লাগাচ্ছেন না, বরং নিজেদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে প্রকৃতিকে জুড়ে দিয়ে তৈরি করছেন টেকসই উন্নয়নের নতুন পথ। ভারতের পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিহাসে নারীদের ‘ভূমিকা’ নতুন নয়। রাজস্থানের বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের অমৃতা দেবী খেজরি গাছ বঁাচাতে নিজের প্রাণ পর্যন্ত ‘উৎসর্গ’ করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য এখনও নানা রূপে বেঁচে আছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী-স্বনির্ভর গোষ্ঠী, গ্রামীণ সংগঠন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মহিলারা বন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র রক্ষার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, নদীভাঙন, জীববৈচিত্রর ক্ষয়– প্রকৃতির সামনে একের-পর-এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই সংকটের সময়েই ভারতের নানা প্রান্তে অসংখ্য নারী নিঃশব্দে গড়ে তুলছেন পরিবেশ রক্ষার অনন্য আন্দোলন।
এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও মাটির লবণাক্ত প্রবণতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করা সুন্দরবনের বহু মহিলা বুঝেছেন যে, প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানেই নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন গ্রামে নারী-স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি নদীবঁাধের ধারে হাজার হাজার গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করেছেন। নিম, নারকেল, সুন্দরী, গরান, কেওড়া-সহ নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়ে তঁারা শুধু মাটি ক্ষয় রোধ করেননি; বরং পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্যও নিরাপদ আবাস তৈরি করেছেন। সুন্দরবনের নিবেদিতা, সারদা, মা তারা বা ফাতিমার মতো বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলা
বহু বাধা অতিক্রম করে এই উদ্যোগকে সফল করেছেন।
সাম্প্রতিক বছরে, সুন্দরবনে নারীদের নেতৃত্বে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের কাজ এখনও গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের সহযোগিতায় মহিলারা ম্যানগ্রোভের চারা তৈরি, রোপণ এবং পরিচর্যার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত কমায়, উপকূলকে রক্ষা করে, এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সাহায্য করে। একই সঙ্গে এই প্রকল্পগুলি মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগও করে দিচ্ছে। জাতি সংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির বিভিন্ন প্রকল্পেও দেখা যাচ্ছে, উপকূলীয় অঞ্চলে নারীরা পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কোথাও তঁারা ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনছেন, কোথাও জল সংরক্ষণ ও ‘বিকল্প’ কৃষির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব জীবিকা গড়ে তুলছেন। আসলে, ভারতের এই নারীরা প্রমাণ করে দিচ্ছেন, পরিবেশ রক্ষা শুধুমাত্র ‘সরকারি প্রকল্প’ বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক সামাজিক দায়িত্ব। প্রকৃতিকে বঁাচানোর এই সংগ্রামে নারীরা এখন শুধু অংশগ্রহণকারী নন, তঁারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দিকে দিকে।
পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও মাটির লবণাক্ত প্রবণতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করা সুন্দরবনের বহু মহিলা বুঝেছেন যে, প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানেই নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
ভারতে পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিহাস লিখতে গেলে আদিবাসী নারীদের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। প্রকৃতির সঙ্গে তঁাদের সম্পর্ক কেবল জীবিকার নয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বেরও। বন, পাহাড়, নদী এবং জীববৈচিত্রকে তঁারা প্রজন্মের-পর-প্রজন্ম ধরে নিজেদের পরিবারের সদস্যের মতো আগলে রেখেছেন। যখন বন উজাড় ও পরিবেশ দূষণ বড় সংকট হয়ে উঠেছে, তখন বহু আদিবাসী নারী প্রকৃতি রক্ষার লড়াইয়ে সামনের সারিতে দঁাড়িয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের বঁাকুড়ায় নারী-নেতৃত্বাধীন ‘বন সুরক্ষা কমিটি’গুলির কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় মহিলারা যৌথ বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বনরক্ষা, বৃক্ষরোপণ এবং বনসম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজেরাই গ্রহণ করেছেন। এর ফলে যেমন বনাঞ্চল পুনরুজ্জীবিত হয়েছে; তেমনই নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বেড়েছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন আদিবাসী অঞ্চলেও নারীরা বন পাহারা, চারা রোপণ এবং ‘অবৈধ’ গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ওড়িশার কিছু গ্রামে আদিবাসী মহিলারা পালা করে প্রতিদিন বন পাহারা দেন।
ভারতে পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিহাস লিখতে গেলে আদিবাসী নারীদের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। প্রকৃতির সঙ্গে তঁাদের সম্পর্ক কেবল জীবিকার নয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বেরও।
মহারাষ্ট্রের কারজাত অঞ্চলে আদিবাসী নারীদের সংগঠন কয়েক বছর ধরে দেশীয় প্রজাতির হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও সংরক্ষণের কাজ করছে। তঁারা শুধু বন রক্ষা করছেন না, নতুন প্রজন্মকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনও করছেন। পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বঁাকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বহু আদিবাসী এলাকায় আজও করম পরব প্রকৃতি ও বৃক্ষ সংরক্ষণের এক জীবন্ত প্রতীক। ভাদ্র মাসে পালিত এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হল করম গাছ। সঁাওতাল, ওরঁাও, মুন্ডা, হো-সহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মেয়েরা করমগাছের ডাল সংগ্রহ করে পূজা করেন এবং ভাল ফসল, সুস্বাস্থ্য ও সমাজের মঙ্গলকামনা করেন।
এই পরব প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, কৃষির প্রতি নির্ভরতা এবং পরিবেশের সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের প্রতীক। করম পরবের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল: বৃক্ষকে দেবতার মর্যাদা দেওয়া। করম গাছকে কাটা বা ক্ষতি করা ‘অশুভ’ বলে মনে করা হয়। ফলে এই উৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রজন্মের-পর-প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এক প্রাকৃতিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
‘চিপকো আন্দোলন’ আমাদের দেখিয়েছিল, পরিবেশরক্ষার জ্ঞান সবসময় শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান বা সরকারি নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পাহাড়ি গ্রামের নারীদের দৈনন্দিন জীবন ও অভিজ্ঞতার মধ্যেও প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রয়েছে। তঁারা বুঝেছিলেন, একটি জীবন্ত বন শুধু কাঠের উৎস নয়; বন মাটি ও জলকে রক্ষা করে, ঝরনা ও নদীর জলধারা বজায় রাখে এবং পশু ও মানুষের খাদ্য ও জীবিকার ভিত্তি তৈরি করে। এখন জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, জলসংকট এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের সময়ে এই নারীকেন্দ্রিক পরিবেশ-দর্শন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলা সাহিত্যে নারী ও প্রকৃতিকে একীভূত করে অনেক বিখ্যাত কবিতা রচিত হয়েছে, যেখানে নারী ও প্রকৃতি একে-অপরের পরিপূরক। বাংলা সাহিত্যে ‘নারী’ ও ‘প্রকৃতি’ কখনও আলাদা দু’টি সত্তা নয়, বরং একে-অপরের রূপক। পরিপূরক। কবিরা বারবার নারীর চঞ্চলতা, রূপ এবং আবেগকে প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তন, নদী কিংবা অরণ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কবিদের কল্পনার আর মনের মাধুরীর বাইরে প্রকৃতি-রক্ষক নারীর ভুমিকা খুব কমই লেখা হয়েছে। ইত্যবসরে অনেকানেক নয়া-নয়া ‘ভাইরাল কনটেন্ট’ এসেছে। দেওলা বাইয়ের কান্না আমরা যেন ভুলে না যাই।
(মতামত নিজস্ব)
সর্বশেষ খবর
-
বঙ্গ রাজনীতিতে কোণঠাসা! দুর্গাপুরে তৃণমূলের প্রতীকী শ্রাদ্ধ করল বিজেপি
-
ট্রাইব্যুনালে এখনও ঝুলে ৩৭ লক্ষের বেশি আবেদন! কত নাম অন্তর্ভুক্তি? সুপ্রিম কোর্টে স্পষ্ট হিসাব দিল না কমিশন
-
‘বোর্ড গঠনে গেলে খারাপ হবে’, জলপাইগুড়িতে মমতাপন্থী কাউন্সিলের বাড়িতে ভাঙচুর, চলল গুলি
-
এআই এবার হ্যাকার, কারও নির্দেশ ছাড়াই তিনটি ওয়েবসাইট হ্যাক করল জেমিনি!
-
রোগী-পরিজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার! মালদহ মেডিক্যালে ডাক্তার-নার্সদের ‘ধমক’ মন্ত্রীর