রাজা আসে। রাজা যায়। রাজাদের লড়াই চলে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে। ক্ষমতায় থাকার সময় রাজারা অমর হওয়ার কৌশল ফাঁদে। তা কি কাজে লাগে?
মিলান কুন্দেরার ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ উপন্যাসের এই গল্পটি বহুশ্রুত। চেকোশ্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায়। ১৯৪৮। পার্টির সর্বাধিনায়ক ক্লেমেন্ত গটওয়াল্ড প্রাগ শহরে একটি বারোক শৈলীতে নির্মিত প্যালেসের বারান্দা থেকে জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য রাখবেন। তা, গটওয়াল্ড এলেন। শীর্ষ নেতৃমণ্ডলী তাঁকে ঘিরে। বাতাসে শীতের প্রবল কামড়। ঝুরো ঝুরো তুষারপাত। গটওয়াল্ডের মাথায় টুপি নেই। তা দেখে, বিশ্বস্ত অনুগামী, ক্লেমেন্ডিস নিজের ফারের টুপিটি খুলে সর্বাধিনায়কের মাথায় বসিয়ে দিলেন। জনগণ উল্লসিত- দৃশ্যটি দেখে। সেই ফোটোগ্রাফ বিধৃত হল। পাঠ্যবই, পোস্টার, প্রদর্শনীতে রমরম করতে থাকল। দেশের শিশুরা এতবার দেখল, যেন মুখস্থ হয়ে গেল তাদের।
আরও পড়ুন:
এর বছর চারেক বাদে এই ক্লেমেন্ডিসের বিরুদ্ধেই দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ উঠল। তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেন। তাঁর ফাঁসি হল। প্রোপাগান্ডা সেকশনের সক্রিয়তায় যেখানে যত ক্লেমেন্ডিসের ফোটোগ্রাফ-সহ অন্যবিধ নিশান ছিল, সব রাতারাতি মুছে দেওয়া হল।
যে কোনও যুগে, যে কোনও কালপর্বে শাসকের লড়াইও কি একইরকমের নয়? কোনও শাসকই চায় না, সে গণস্মৃতি থেকে হারিয়ে যাক। বা, সে বিস্মৃত হোক। তার নাম ও নিশান মুছে যাক।
এমনকী, সেই তুষারপাতের দিনে, প্রাগ শহরে, কমরেড গটওয়াল্ড যে-অভিভাষণ দিয়েছিলেন জনগণের উদ্দেশে, সেখান থেকেও মুছে গেল ক্লেমেন্ডিসের ছবি। কিন্তু হয়তো তাড়াহুড়োয়, বা অনবধানতায়, বা নিয়তির মুচকি হাসির জেরে, গটওয়াল্ডের মাথায় রয়ে গেল ক্লেমেন্ডিসের পরানো ফারের টুপিখানি। সে টুপিখানি দাঁত বের করে যেন বলতে থাকল: ‘দ্য স্ট্রাগল অফ ম্যান আগেইনস্ট মাইট ইজ দ্য স্ট্রাগল অফ মেমরি আগেইনস্ট অবলিভিয়ন’। ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই আসলে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে লড়াই।
যে কোনও যুগে, যে কোনও কালপর্বে শাসকের লড়াইও কি একইরকমের নয়? কোনও শাসকই চায় না, সে গণস্মৃতি থেকে হারিয়ে যাক। বা, সে বিস্মৃত হোক। তার নাম ও নিশান মুছে যাক। সেজন্যই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সময় সে এমন কিছু উদ্যোগ নেয়, যাতে আমজনতা তাকে বারবার স্মরণ করতে বাধ্য হয়। তেমনই একটি প্রকৌশল: রাস্তার বা ভবনের বা স্থায়ী ইমারতের নাম বদলে দেওয়া। বা, বদলে দেওয়া জনপদের রঙের নকশা। এতদ্দ্বারা দু’টি কাজ সাধিত হয়। প্রথমটি, পূর্বতন শাসকের অস্তিত্বকে অবহেলা করা যায়, জনস্মৃতি থেকে পূর্বতনের শাসকের অনুরণন যাতে ফিকে হয়ে যায়, সে ব্যবস্থা সুরক্ষিত হয়। দ্বিতীয়টি, নতুন নামকরণ ও নতুন পদক্ষেপ করে মানুষকে অলক্ষ্যে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, আসলে তারা কার শাসনে বেঁচে রয়েছে। এখন, ‘বস’ কে।
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সময় শাসক এমন কিছু উদ্যোগ নেয়, যাতে আমজনতা তাকে বারবার স্মরণ করতে বাধ্য হয়। তেমনই একটি প্রকৌশল: রাস্তার বা ভবনের বা স্থায়ী ইমারতের নাম বদলে দেওয়া।
এই ধরনের অদলবদলে সবচেয়ে উপেক্ষিত হয় মানুষের স্বার্থ। যেমন, সদ্য খবরে প্রকাশ, বিভিন্ন সময়ে শাসকের ইচ্ছায় কলকাতার রাস্তাঘাটের নাম বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু রাস্তার হাল ফেরেনি। খানাখন্দ বোজেনি। চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি। তাহলে? এ তো সেই ক্লেমেন্ডিসের টুপি হয়ে গেল! এত সব পরিবর্তনের পরেও এমন জিনিস অক্ষত রয়ে গেল, যা ভেংচে বলছে: রাজা, তোর কাপড় কোথায়?
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
জাতিবিদ্বেষী কটাক্ষ, ছাত্রকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা! ‘শাস্তি’ অধ্যাপককে, ক্ষমা চাইল বম্বে আইআইটি
-
অভাব অনটন, বিবাহে বাধা? ‘পুরট্টাসি সানি’ পুজোয় দূর হবে বিঘ্ন, জানাচ্ছে শাস্ত্র
-
মাতৃত্বের পর চেহারা নিয়ে লাগাতার কটাক্ষ ক্যাটরিনাকে, শার্ট খুলে সলমন প্রতিবাদ করতেই ক্ষমাপ্রার্থী কে?
-
ফ্রিজ হওয়া তিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যাবে, প্রতীক খুইয়েও হাই কোর্টে স্বস্তি মমতা তৃণমূলের
-
ক্রিকেট কেরিয়ার শেষ! এবার রাজনীতির ময়দানে নামছেন শামি?