Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৬ জুন ২০২৬
India-US trade deal

ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি, সন্ধিক্ষণের মুখে দেশের অর্থনীতি

এটা অনেকখানি নয়ের দশকের গোড়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যখন বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথ ভারত নেবে কি না সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হল যে, কংগ্রেসের হাত ধরে নয়ের দশকের গোড়ায় ভারত অর্থনীতিকে মুক্ত করার রাস্তায় হাঁটল, এখন সেই মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি-সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় কংগ্রেস শামিল।

Advertisement
সুতীর্থ চক্রবর্তী
সুতীর্থ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ১৬:৪৩

link
সুতীর্থ চক্রবর্তী
সুতীর্থ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ১৬:৪৩

options
link
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি, সন্ধিক্ষণের মুখে দেশের অর্থনীতি zoom
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির যে-কাঠামো সামনে এসেছে তাতে ধান, গমের বাজার খোলা হয়নি।

নাম নরেন্দার, কাম সারেন্ডার। ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের দেওয়া এই স্লোগান আগামীতে মুখে মুখে ফিরবে কি না তা সময়ই বলবে। তবে এই চুক্তির যে-কাঠামো দু’দেশের যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে সামনে এসেছে তাতে স্পষ্ট– ভারতের অর্থনীতি ফের একটা সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।

এটা অনেকখানি নয়ের দশকের গোড়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যখন বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথ ভারত নেবে কি না সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হল যে, কংগ্রেসের হাত ধরে নয়ের দশকের গোড়ায় ভারত অর্থনীতিকে মুক্ত করার রাস্তায় হাঁটল, এখন সেই মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি-সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় কংগ্রেস শামিল। কংগ্রেসের এই অবস্থান বদল কতটা আদর্শগত ও কতটা রাজনৈতিক– সেই প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে।

Advertisement

এক্ষেত্রে সিপিএমের অবস্থান অবশ্য অনড় ও অব্যয়। ৩৫ বছর আগেও তারা যে-ভাষায় কথা বলেছিল, এখনও তারা ঠিক সেই ভাবেই কথা বলছে। এর মধ্যে যে দুনিয়া বদলে গিয়েছে,
তা তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই। ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোটি সামনে আসার পর তারা যেসব প্রেস বিবৃতি দিতে শুরু করেছে, সেগুলি দেখে মনে হচ্ছে ৩৫ বছর আগে ছাপানো বিবৃতিগুলোকেই ধুলো ঝেড়ে সংবাদ মাধ্যমের দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। যাতে বলা রয়েছে– সেই বস্তাপচা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণের কাহিনি। যুগোপযোগী ‘বিকল্প’ কোনও ধারণা সামনে আনার মুরদ সিপিএমের নেই। আগেভাগেই তারা একটি ধর্মঘট ডেকে বসেছে। পলিটব্যুরোর কিছু বিবৃতি এবং দু’-একটি প্রায় প্রভাবহীন ধর্মঘট ও বনধে্‌র ডাকের মধ্যে দিয়ে সিপিএমের প্রতিবাদ বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যাবে বলেই মনে হয়।

India-US trade deal a turning point for the country
নরেন্দ্র মোদি (বাঁ দিকে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল চিত্র।

প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে বামপন্থী কৃষক সংগঠনগুলির ওই ধর্মঘটের ডাকটি ছাড়া কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলনের মতো কোনও বড় প্রতিবাদ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। আন্দোলনের চাপে কৃষি আইন প্রত‌্যাহার করার মতো ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ‌্য চুক্তি করার আগে নরেন্দ্র মোদির সরকার অনেক সতর্ক। তাই গতবারের মতো পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের ধনী জাঠ ও শিখ কৃষকদের স্বার্থে সরাসরি আঘাত করার চেষ্টা হয়নি। কৃষি আইন চ‌্যালেঞ্জ ছুড়েছিল সরকারের ‘ন‌্যূনতম সহায়ক মূল‌্য’ ব‌্যবস্থাকে। ওই আইনে বলা হয়েছিল কর্পোরেট সংস্থাগুলি মাঠে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ফসল কিনে নিতে পারবে। এতে বর্তমান মান্ডি ব‌্যবস্থা দুর্বল হয়ে যেত।

পাঞ্জাব, হরিয়ানা বা উত্তর ভারতের ধনী কৃষকরা ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’-র যে সুবিধা এখন ভোগ করেন, তা বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখেছিলেন তাঁরা। আইনে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে সীমাহীন মজুতদারির ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। আদানি, আম্বানির মালিকাধীন কর্পোরেট সংস্থাগুলি অল্প দামে মাঠ থেকে সব শস‌্য তুলে নিয়ে গুদামজাত করে নেবে বলে তাঁদের সে-সময় আশঙ্কা ছিল। এবং চুক্তি চাষের মাধ‌্যমে কৃষকরা কর্পোরেটের চাকরবাকরে পরিণত হবেন বলেও অান্দোলকারীরা মনে করেছিলেন। চুক্তিতে কোনও খেলাপ ঘটলে আইনে নিষ্পত্তির জন‌্য কৃষকদের কোর্টে যাওয়ারও সুযোগ ছিল না। জাঠ ও শিখ কৃষকরা তাঁদের কৃষক পরিচিতির অস্তিত্ব নিয়েই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা তাই প্রায় এক বছর ধরে জান-মাল বাজি রেখে দিল্লি ঘেরাও করে সরকারকে বাধ‌্য করেছিলেন কৃষি আইন প্রত‌্যাহার করতে।

চুক্তি কার্যকর হলে দেশের কৃষি পণ্যের বাজার ধীরে ধীরে মার্কিন কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে চলে যাওয়ার অবশ‌্যই সুযোগ থাকছে।

মার্কিন বাণিজ‌্য চুক্তির যে-কাঠামো সামনে এসেছে তাতে ধান, গমের বাজার খোলা হয়নি। সস্তায় চিনি আমদানির প্রসঙ্গও নেই। ভুট্টা, মিলেট, সয়াবিনের বাজারও খুলে দেওয়া হচ্ছে না বলে কেন্দ্রীয় বাণিজ‌্যমন্ত্রী পীষূষ গয়ালের দাবি। ডেয়ারি, পোলট্রি, মাংস ইত‌্যাদি মার্কিন পণ‌্য ঢোকার ক্ষেত্রেও ছাড়পত্র নেই। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, আমেরিকা থেকে সস্তায় সয়াবিন তেল এবং পশপখাদ‌্য হিসাবে ব‌্যবহৃত ‘ডিডিজিএস’ আমদানির রাস্তা খুলে যাচ্ছে। ভুট্টা থেকে ইথানল তৈরির পর যে-উপজাতটি থাকে তাকে ‘ডিডিজিএস’ বলে। এটি পশুখাদ‌্য রূপে বাজারে বিক্রি হয়। আমেরিকা থেকে এগুলি অনেক সস্তায় ভারতে ঢুকবে।

এতে পরোক্ষে ভুট্টা চাষিরা বিপন্ন বোধ করছেন বলে বলা হচ্ছে। লাল জোয়ার (রেড সোরঘাম) আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটিও পোল্ট্রি ফিড হিসাবে ব‌্যবহার করা হয়। চুক্তিতে আপেল, আখরোট, আমন্ড ইত‌্যাদি বাদামের অামদানিতে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। সস্তায় ওয়াশিংটন আপেল এবার ভারতের বাজারে ছেয়ে যেতে পারে। কাশ্মীরের ৭ লক্ষ আপেল চাষির হয়ে উদ্বেগ দেখিয়েছেন সিপিএম বিধায়ক ইউসুফ তারিগামি। হিমাচল প্রদেশেও আপেলচাষিরা রয়েছেন। তুলো আমদানি সহজ করা হচ্ছে। গুজরাত, মহারাষ্ট্রের তুলো চাষিরা এতে অাঘাতপ্রাপ্ত হতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। সস্তার মার্কিন সয়াবিন তেল ভারতের বাজারে ঢুকতে শুরু করলে সয়াবিন চাষিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের এই লবিটা কোনওভাবেই ধান, গম বা ডেয়ারি পণ‌্য উৎপাদকদের মতো শক্তিশালী নয়।

এই চুক্তি সাড়ে তিন দশক আগের মতোই দেশকে এক সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এখনও পর্যন্ত ভারত-মার্কিন বাণিজ‌্য চুক্তির যে-খসড়া প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে কৃষি আন্দোলন করা জাঠ ও শিখ কৃষকদের উত্তেজিত হয়ে পড়ার মতো কিছু নেই। কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশের আপেল বা আখরোট চাষিরা কিংবা মধ‌্যপ্রেদেশের ভুট্টা ও জোয়ার চাষিরা অথবা মহারাষ্ট্র ও গুজরাতের তুলো চাষিরা এসে দিল্লি অবরুদ্ধ করে দেবেন–
এমন কল্পনা করাই বাহুল‌্য। নয়ের দশকের গোড়ায় ভারতে গ‌্যাট, ডাঙ্কেল চুক্তির বিরুদ্ধে যেমন বড় কোনও আন্দোলন দানা বাঁধানো যায়নি, এবার তেমনটাই হবে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা। কিন্তু তবুও এই চুক্তি সাড়ে তিন দশক আগের মতোই দেশকে এক সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

চুক্তি কার্যকর হলে দেশের কৃষি পণ্যের বাজার ধীরে ধীরে মার্কিন কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে চলে যাওয়ার অবশ‌্যই সুযোগ থাকছে। চুক্তির ফলে সাধারণ উপভোক্তারা আপাতত বহু পণ‌্য সস্তায় পেতে শুরু করবেন। বলা হচ্ছে– আমেরিকার সয়াবিন তেল আসতে শুরু করলে মুদিখানার দোকানে সাদা তেলের দাম লিটারে ১০-১৫ টাকা কমে যেতে পারে। মার্কিন ‘ডিডিজিএস’ ও লাল জোয়ার আসতে শুরু করলে সস্তা হবে পোলট্রির ডিম ও মুরগির মাংস। ভোজ‌্য তেলের দাম কমলে সস্তা হবে কেক, প‌্যাস্ট্রি, বিস্কুট, চিপ্‌স থেকে বহু প‌্যাকেটজাত খাবার। সস্তায় ওয়াশিংটন আপেল ভারতের বাজারে যখন ঢুকবে, তখন তার প্রভাব পড়বে পুরো ফলের বাজারে। কিন্তু সস্তার মার্কিন পণ্যের উপর এই নির্ভরতার নেতিবাচক প্রভাবও দীর্ঘকালে থাকতে পারে। একদিকে যেমন কৃষিতে কর্মসংস্থানের বিষয়টি রয়েছে, তেমন অন‌্য দিকে উচ্চফলনশীল জেনিটিকালি মডিফায়েড বীজ ব‌্যবহারের পরিবেশগত দিকটিও রয়েছে। এর চেয়েও বড় আশঙ্কার দিক হল, কৃষিতে বাজার খোলা কোনও এক সময়ে আমাদের খাদ্যে সার্বভৌমত্বকেও বিপন্ন করতে পারে।

সস্তার মার্কিন পণ্যের উপর নির্ভরতার নেতিবাচক প্রভাবও দীর্ঘকালে থাকতে পারে।

সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শুধু নেতিবাচক সম্ভাবনাগুলিকে বড় করে দেখা কতখানি বুদ্ধিমানের কাজ হবে তা আমাদের গত সাড়ে তিন দশকের অভিজ্ঞতার নিরিখে বিচার করতে হবে। বিশ্বায়ন ও আর্থিক উদারীকরণ সমাজে বৈষম‌্য বাড়ালেও, সামগ্রিকভাবে যে দেশের দারিদ্র ও দুর্দশা অনেক কমিয়েছে সন্দেহ নেই। সিংহভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। ফলে অাবার নতুন করে মুক্ত বাণিজ্যের বিশ্বে ঝাঁপ দেওয়ার প্রক্রিয়া অামাদের জন‌্য কী নিয়ে অাসবে, তা এককথায় বলে দেওয়া খুব কঠিন।

এখনও পর্যন্ত ভারত-মার্কিন বাণিজ‌্য চুক্তির যে-খসড়া প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে কৃষি আন্দোলন করা জাঠ ও শিখ কৃষকদের উত্তেজিত হয়ে পড়ার মতো কিছু নেই। তবু এই চুক্তি সাড়ে তিন দশক আগের মতোই দেশকে এক সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সস্তার মার্কিন পণ্যের উপর নির্ভরতার নেতিবাচক প্রভাবও দীর্ঘকালে থাকতে পারে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.