ছয়ের দশকে জওহরলাল নেহরু ‘ন্যূনতম মজুরি আইন’ চালু করতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর অন্যতম উপদেষ্টা পি. সি. মহলানবিশ সতর্ক করে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট না হলে এমন নীতি প্রণয়ন উচিত নয়। ‘কল্যাণমূলক নীতি’-র প্রয়োজন নিশ্চয়ই রয়েছে। তার আগে দরকার সক্ষমতা অর্জন করা। লিখছেন, সুজনকুমার দাস।
ভারতের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলির একটি সম্ভবত দারিদ্র্য হ্রাস। কিন্তু এই সাফল্যকে কীভাবে মাপব? আর, দারিদ্র্য কমে গেলে পরবর্তী ‘লক্ষ্য’ কী হবে? এই প্রশ্নগুলিই এখন সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ। এখন শুধু দারিদ্র্যের পরিসংখ্যান নিয়ে নয়; বরং কল্যাণমূলক ব্যবস্থা, ফ্রিবি, সরকারি ব্যয়, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আগামী দিনের প্রবৃদ্ধি– সবকিছুকে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে দেখার চেষ্টা করছেন নীতিনির্ধারকগণ।
আরও পড়ুন:
দারিদ্র্যের হিসাব দিয়েই শুরু করা যাক। ২০১১-’১২ সালের ভোগব্যয় সমীক্ষা অনুযায়ী, রঙ্গরাজন কমিটির দারিদ্র্যসীমা ব্যবহার করলে ভারতে দারিদ্র্য হার ছিল প্রায় ২৯.৫ শতাংশ। বর্তমানে একই দারিদ্র্যসীমাকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে হিসাব করলে সেই হার নেমে এসেছে প্রায় ৩.৯ শতাংশে। অর্থাৎ, একই মানদণ্ড ব্যবহার করলে গত এক দশকে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই নতুন প্রশ্নের শুরু। মানুষের হাতে ভোগের ক্ষমতা বেড়েছে, কল্যাণমূলক প্রকল্পের পরিধি বেড়েছে, সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী হয়েছে– তবু সেই পরিবর্তন সবসময় মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা ব্যক্তিগত ভোগের পরিসংখ্যানে প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিফলিত হচ্ছে না কেন?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে ভারতের উন্নয়নের একটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যে দিকে তাকাতে হয়। ভারত মাথাপিছু আয় যথেষ্ট বৃদ্ধি পাওয়ার আগেই ব্যাপক ‘কল্যাণমূলক নীতি’-র পথে চলে গিয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমি দেশগুলি অনেক বেশি মাথাপিছু আয়ের স্তরে পৌঁছনোর পর তাদের ‘কল্যাণমূলক’ রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ছয়ের দশকে জওহরলাল নেহরু ‘ন্যূনতম মজুরি আইন’ চালু করতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর অন্যতম উপদেষ্টা পি. সি. মহলানবিশ তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জাপান ‘ন্যূনতম মজুরি ব্যবস্থা’ চালু করার আগে প্রায় ১০০ বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে গিয়েছে। আর ভারত তখন মাত্র পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পথে হাঁটতে শুরু করেছে। অর্থাৎ, আমরা অনেকটা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিয়েছিলাম। মহালানবিশ সতর্ক করেছিলেন যে, ‘ন্যূনতম মজুরি’ চালু করলে ব্যবসার খরচ বাড়তে পারে। তাই ভারতের সমস্যাটা হল– আমরা অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার আগেই ‘কল্যাণমূলক ব্যবস্থা’ তৈরি করতে শুরু করেছিলাম। এখনও সেই টানাপোড়েন রয়েছে।
ভারতের সামনে এখন প্রশ্ন– প্রবৃদ্ধি কোথায়? ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া ভারতের পক্ষে যথেষ্ট নয়। এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান দরকার, মাথাপিছু আয় বাড়াতে হবে, জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত করতে হবে।
এই টানাপোড়েন বোঝার জন্য ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ পরিবারগুলির জন্য বছরে ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা দারিদ্র্য কমাতে সাহায্য করেছে। অন্ধ্রপ্রদেশের করা গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যে প্রকৃত গ্রামীণ মজুরি প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছিল। এর ফলে দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি অপ্রত্যাশিত ফলও দেখা গিয়েছিল। বহু ক্ষুদ্র উদ্যোগ বাড়তি শ্রমের খরচের কারণে আর অর্থনৈতিকভাবে টেকেনি। কিছু কৃষিজমির ফসল সময়মতো কাটাও সম্ভব হয়নি, কারণ শ্রমিক নিয়োগের খরচ বেড়ে গিয়েছিল।
এখানেই অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। কোনও কল্যাণমূলক নীতির মূল্য শুধু সরকার কত টাকা খরচ করল, তা দিয়ে মাপা যায় না। সেই নীতির ফলে অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন হল, কোন উৎপাদন কমল, কোন ব্যবসা বন্ধ হল এবং ভবিষ্যতের কতটা প্রবৃদ্ধির সুযোগ হারালাম– সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। অর্থনীতির ভাষায় এটাই ‘অপরচুনিটি কস্ট’ বা হারিয়ে যাওয়া সুযোগের মূল্য। এই একই প্রশ্ন ‘ফ্রিবি’ বা বিনামূল্যের রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নির্বাচনের আগে বিনামূল্যে বাসযাত্রা, বিদ্যুৎ, নগদ অর্থ বা নানা ধরনের সুবিধা দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রশ্ন হল– এর উদ্দেশ্য কী এবং দীর্ঘমেয়াদে এর ফল কী?
পাঞ্জাবের অভিজ্ঞতা এখানে একটি বড় সতর্কবার্তা। এক সময়ে শক্তিশালী শিল্পভিত্তি থাকা এই রাজ্যে কৃষির জন্য ব্যাপক ভরতুকি এবং বিভিন্ন খাতে ক্রস-সাবসিডির ফলে শিল্পের উপর খরচের চাপ বেড়েছে। শিল্পের একটি অংশ অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছে, যেখানে বিনিয়োগের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে অনুকূল। অন্যদিকে, কৃষিক্ষেত্রে দীর্ঘ দিনের ভরতুকিযুক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমেছে এবং পরিবেশগত সমস্যাও বেড়েছে। অর্থাৎ, একটি সুবিধা এখন মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু তার মূল্য আগামী দিনে অন্যভাবে দিতে হতে পারে। হিসাবের খাতায় সরকার কত টাকা ভরতুকি দিল, সেটাই পুরো গল্প নয়। তার প্রভাব শিল্প, বিনিয়োগ, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ রাজস্বর উপর কী পড়ল, তাও দেখতে হবে। তবে এখানেও একটি ভারসাম্য জরুরি। সব ফ্রিবি-কে একই চোখে দেখা যায় না। যেখানে প্রশাসনিক ক্ষমতা দুর্বল, সেখানে সরাসরি নগদ সহায়তা অনেক সময় কার্যকর হতে পারে। সরকারি পরিষেবা মানুষের কাছে পৌঁছনোর পথে যদি অপচয় বা মধ্যস্বত্বভোগী থাকে, তাহলে সরাসরি নগদ অর্থ তুলনামূলকভাবে নিশ্চিতভাবে মানুষের হাতে পৌঁছতে পারে। এই কারণেই ‘ডায়রেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ বা সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর ব্যবস্থা ভারতের কল্যাণনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। সরকারি অর্থ সরাসরি মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়ার ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও অপচয় কমানো সম্ভব হয়েছে। ভারতের এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আগ্রহ তৈরি করেছে। অর্থাৎ কল্যাণের বিরোধিতা নয়; বরং কল্যাণকে আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করা জরুরি।
কোনও কল্যাণমূলক নীতির মূল্য শুধু সরকার কত টাকা খরচ করল, তা দিয়ে মাপা যায় না। সেই নীতির ফলে অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন হল, কোন উৎপাদন কমল, কোন ব্যবসা বন্ধ হল এবং ভবিষ্যতের কতটা প্রবৃদ্ধির সুযোগ হারালাম– সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
কিন্তু ভারতের সামনে এখন আরও বড় প্রশ্ন– প্রবৃদ্ধি কোথায়? ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া ভারতের পক্ষে যথেষ্ট নয়। এটি একটি তরুণ দেশ। এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান দরকার, মাথাপিছু আয় বাড়াতে হবে এবং জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত করতে হবে। তাই আগামী কয়েক দশকের জন্য ৭.৫ থেকে ৮ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রাখা জরুরি। এই প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু সরকারি ব্যয় যথেষ্ট নয়। দরকার বেসরকারি বিনিয়োগ। আর এখানেই রয়েছে অর্থনীতির আসল ‘এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম’– গত এক দশকে বেসরকারি বিনিয়োগের পতনকে আমরা পুরোপুরি উল্টে দিতে পারিনি কেন? দেশে রাস্তা, রেল, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল পরিকাঠামো-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। ব্যবসার অনেক খরচও কমেছে। তবু বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। এর একটি বড় কারণ হতে পারে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ‘কনট্র্যাক্ট এনফোর্সমেন্ট’ বা ‘চুক্তি কার্যকর’ করার দুর্বলতা। একজন বিনিয়োগকারী যদি জানেন না, তাঁর চুক্তি ভবিষ্যতে কার্যকর হবে কি না, কোনও বিরোধের নিষ্পত্তি হতে কত বছর লাগবে, কিংবা একটি সিদ্ধান্ত কয়েক বছর পর পরিবর্তিত হয়ে যাবে কি না, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি সতর্ক হবেন। ফলে বিচারব্যবস্থা শুধু আইনের বিষয় নয়, অর্থনীতিরও বিষয়।
দ্রুত বিচার মানে শুধু ন্যায়বিচার নয়; এর অর্থ বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কমানো এবং অর্থনীতির গতি বাড়ানো। একইভাবে মূল্যস্ফীতি মাপার পদ্ধতিও সময়ের সঙ্গে বদলানো প্রয়োজন। মানুষের ভোগের ধরন বদলেছে। শহরাঞ্চলে মোট ভোগব্যয়ের মধ্যে খাদ্যের অংশ আগের তুলনায় কমেছে। অথচ মূল্যস্ফীতি নির্ধারণে খাদ্যের ওজন এখনও অত্যন্ত বেশি। ফলে বদলে যাওয়া অর্থনীতির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি মাপার মাপকাঠিও বদলানো জরুরি। কারণ, মূল্যস্ফীতির হিসাবের উপর সুদের হার এবং মূলধনের খরচ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্ভর করে। সব মিলিয়ে ভারতের অর্থনীতি এখন একটি নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছি। সরাসরি সুবিধা হস্তান্তরের মাধ্যমে কল্যাণমূলক ব্যয় আরও দক্ষ হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার পরিধিও বেড়েছে। কিন্তু এবার সেই সাফল্যের পরবর্তী ধাপে যেতে হবে।
শুধু মানুষকে সাহায্য করার অর্থনীতি নয়, মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর অর্থনীতি দরকার। শুধু ভরতুকি নয়, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর নীতি দরকার। শুধু সরকারি ব্যয় নয়, বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার। শুধু পরিকাঠামো নয়, দ্রুত বিচার ও নিশ্চিত চুক্তি কার্যকর করার ব্যবস্থা দরকার। শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণের জটও কাটাতে হবে। ভারতের হাতে মূল উপাদানগুলি রয়েছে– তরুণ জনসংখ্যা, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, উন্নত পরিকাঠামো এবং দক্ষতা অর্জনের ক্রমবর্ধমান সুযোগ। এখন দরকার সেই উপাদানগুলিকে একসঙ্গে কাজে লাগানো।
কারণ ভারতের সামনে আসল প্রশ্ন হল– কত দ্রুত এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করতে পারব, যেখানে মানুষের কল্যাণের জন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা ক্রমশ কমবে? ‘কল্যাণ’ অবশ্যই দরকার। কিন্তু কল্যাণের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সক্ষমতা তৈরি করা। আর, সেই সক্ষমতার ভিত্তি: উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, তৎসহ একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবেশ। দেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক পরীক্ষাটি সম্ভবত সেখানেই।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
ফেল কড়ি, নাও লাইসেন্স, নিউ মার্কেটে ওড়ে হাওয়ালার টাকা! ‘শিখা’র আগুনে আলোয় ‘অন্ধকার জগৎ’
-
তারেক বরণের মহড়া বাতিল রাষ্ট্রপতি ভবনের, প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর
-
অর্জুন জয়ের ৩ দিন পরেই সাফল্য, ১৫ বছর পর বিশ্ব ব্যাডমিন্টনে পদক ভারতের জলি-গোপীচাঁদের
-
কাঁথির শান্তিকুঞ্জে শিশির সাক্ষাতে জুন, কী কথা হল দু’জনের?
-
দলের সঙ্গে বিদেশ সফরে যাননি, কেরিয়ার নিয়েও বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন শচীন-পুত্র অর্জুন