সমাজমাধ্যমে হামেশাই দেখি– ফুলের পাশে নারী, চাঁদের আলোয় নারী, সাদা পোশাকে নারী। তার সফ্ট-ফোকাস মুখ, প্যাস্টেল রং, কুয়াশা, সূক্ষ্ম হাসি। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নারীত্বের এক বিশেষ নন্দনতত্ত্ব। নারী সেখানে চন্দ্রতুল্য। কিন্তু কেন সেই নারীকে ‘ফুল’ বা ‘চাঁদ’ হতে হবে? এই গুণগান আসলে ভুয়া। তা করা হয়, মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। লিখছেন, শুচিস্মিতা দাস।
চাঁদের সৌন্দর্যে কে বিভোর নয়? নিত্যকার ঘানি-টানা মানুষ, যুদ্ধ জিতে বা হেরে গিয়ে, একাকীত্বে কিংবা বন্ধুত্বে– চাঁদের দিকে তাকায়। চাঁদকে ব্যাখ্যা করে নিজের মতো করে। ওয়াল্ট হুইটম্যান ‘Look Down, Fair Moon’ কবিতায় চাঁদের কাছে প্রার্থনা করছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের উপর যেন তার কোমল আলো এসে পড়ে। যুদ্ধের পর সেখানে পড়ে আছে মৃত সৈনিকদের দেহ; সেই ভয়াবহতার বিপরীতে চাঁদের আলো শান্ত, কোমল, প্রায় পবিত্র। ‘To the Moon’ কবিতায় শার্লট স্মিথ আবার চাঁদকে বলছেন, ‘Queen of the silver bow’– রুপোলি ধনুকের রানি, কিন্তু সেই রানির সৌন্দর্য ফ্যাকাসে, শান্ত, বিষণ্ণ; তার কাজ নীরবে আলো ছড়ানো।
আরও পড়ুন:
চাঁদ ‘রানি’– কিন্তু তার কোনও রাজদণ্ড নেই। সে আলো দেয়, কিন্তু কথা বলে না। সৌন্দর্য আছে, সক্রিয়তা নেই। এই সাংস্কৃতিক কল্পনাটিই লক্ষণীয়। চাঁদ সততই প্রেমিকা, নারী, বা বিষণ্ণতার সঙ্গী। ফুলও তাই। সুন্দর, কোমল, সুবাসিত কিন্তু নির্বাক। যুগের পর যুগ নারীকে চাঁদের মতো শান্ত, ফুলের মতো কোমল, শিশিরের মতো পবিত্র করে দেখানোর মধ্যে তাই কেবল সৌন্দর্যের প্রশংসা নেই; আছে নারীত্বের একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞাও। সমাজমাধ্যম সেই পুরনো নন্দনতত্ত্বকেই ফিরিয়ে এনেছে নতুনভাবে। এখন আমাদের পরিচয়, কৃতিত্ব, সংলাপ– সবই আবর্তিত সমাজমাধ্যমকে ঘিরেই। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললে এর কিছু না কিছু নমুনা মেলে। ফুলের পাশে নারী, চাঁদের আলোয় নারী, সাদা পোশাকে নারী, সফ্ট-ফোকাস মুখ, প্যাস্টেল রং, কুয়াশা, সূক্ষ্ম হাসি; সব মিলিয়ে তৈরি হয় নারীত্বের এক বিশেষ নন্দনতত্ত্ব। নারী সেখানে ‘moon-like’, ‘delicate’ অথবা ‘pure’।
ঋতিকা চোপড়া, ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত একটি চাঞ্চল্যকর খবর তুলে এনে দেশে হইচই ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু সমাজমাধ্যমে তাঁর সম্বন্ধে একজন পুরুষ লিখেছেন– ‘শরীর বেচে বা ছিপছিপে শরীরের লোভ দেখিয়ে সাংবাদিকতা করতে চান? যোগাযোগ করুন ঋতিকা চোপড়ার সঙ্গে।’ মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
প্রশংসা শুনতেই মধুর। কিন্তু এই মধুর ভাষার মধ্যেও কখনও পুরনো শাসন লুকিয়ে থাকে। এবার প্রশ্নটি হল– কেন নারীকে বারবার ফুল হতে হবে? কেন চাঁদের মতো কোমল না হলে সে ঠিক প্রেমিকা হতে পারবে না? কেন সৌন্দর্যকে তার প্রথম পরিচয় এবং নীরবতাকে তার সৌন্দর্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হবে? সমাজমাধ্যম আমাদের আত্মপ্রকাশের অভিনব সুযোগ তৈরি করেছে। নিজের পোশাক, মতামত, পেশা, সম্পর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান– সবই নিজের মতো করে প্রকাশ করার পরিসর তৈরি হয়েছে। বহু নারী সেই পরিসর ব্যবহার করে ইতিমধ্যে প্রচলিত নারীত্বের ধারণাকে প্রশ্নও করছে– কিন্তু স্বাধীনতার এই পরিসরেরই এক অদৃশ্য নিয়ম কাজ করে চলেছে। কোন পোশাক ‘aesthetic’, কোন মুখ ‘photogenic’, ‘jawline’ টানটান হবে না কি পৃথুল– সব মিলিয়ে আধুনিক নারী খানিক উদ্বেগেই থাকে। তৈরি হয়েছে এর সামাজিক ব্যাকরণও।
তবে সেই ব্যাকরণ মেনে চলার পুরস্কার বাংলা পরীক্ষায় মেলে না, মেলে ‘like’, ‘comment’ এবং ‘follower’-এর সংখ্যায়। আত্মপ্রকাশও ক্রমশ হয়ে উঠছে পরিমাপযোগ্য। নারী নিজের ছবি তোলে বা আবার নিজের ছবির দর্শকও হয়ে ওঠে। নিজের মুখকে দেখতে শেখে সমাজমাধ্যমের চোখে। কিন্তু সমাজমাধ্যমের চোখ আবার পুরুষতন্ত্রেরই চোখ নয় তো আসলে? শরীর, পোশাক, চুল, ত্বক, হাসি– সবকিছুকেই যেন এক অদৃশ্য বিচারকের সামনে পেশ করতে হয়। পুরনো সমাজের ‘লোক কী বলবে’ বদলে গিয়েছে ‘লোক কী like করবে’-তে। নজরদারির ভাষা বদলেছে বটে, তবে নজরদারি শেষ হয়নি। বাস্তব উদারহণ আছে যথেষ্ট পরিমাণে। সম্প্রতি, সন্তান জন্মানোর পর অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফের চেহারা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য উঠেছে– আগের ছবির সঙ্গে তুলনা করে তাঁর শরীর বদলে যাওয়াকেই যেন ‘ত্রুটি’ হিসাবে দেখা হয়েছে। আবার, শেহনাজ গিল জানিয়েছেন, ওজন বেশি থাকাকালীন যেমন তাঁকে শরীর নিয়ে কটাক্ষ শুনতে হয়েছে, ওজন কমানোর পরেও সেই মন্তব্য থামেনি। অর্থাৎ মাপকাঠিটি আসলে শরীরের নয়, সমাজের তৈরি। নারী যতই সেই মাপকাঠির কাছে পৌঁছয়, মাপকাঠি ততই একটু দূরে সরে যায়।
এখানেই ‘fake glorification’ বা ভুয়া গুণগানের বিপদ। নিয়ন্ত্রণ সর্বত্র অপমানের ভাষায় আসে না। আসে স্তুতিমূলক ব্যঞ্জনাতেও। সমাজমাধ্যমের নারী ভূষিতা হয় ‘Queen’, ‘Angel’, ‘Flower’, ‘Moon’– এসব নানা উপমায়। কিন্তু তাকে মহিমান্বিত করা হচ্ছে কোন গুণের জন্য? সৌন্দর্য, কোমলতা, আকর্ষণ, পবিত্রতার জন্য। তার শ্রমের জন্য নয়, তার মেধার জন্য নয়, তার ব্যর্থতা সামলে উঠে দাঁড়ানোর জন্যও নয়, তার রাজনৈতিক মতের জন্যও নয়। অনেক সময়ই আমরা দেখেছি– সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নারীদের আক্রমণ করা হয়েছে কদর্য ভাষায়, তুলে আনা হয়েছে তাদের শারীরিক গঠন, গায়ের রং, ব্যক্তিগত জীবন। মহিলা সাংবাদিকের বেলাতেও এ জিনিস ঘটে। যেমন– ঋতিকা চোপড়া, ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত একটি চাঞ্চল্যকর খবর তুলে এনে দেশে হইচই ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু সমাজমাধ্যমে তাঁর সম্বন্ধে একজন পুরুষ লিখেছেন– ‘শরীর বেচে বা ছিপছিপে শরীরের লোভ দেখিয়ে সাংবাদিকতা করতে চান? যোগাযোগ করুন ঋতিকা চোপড়ার সঙ্গে।’ মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। আসলে, সমাজমাধ্যমের মনিহারী ভাষা হোক বা বিরূপ মন্তব্য– তা একজন নারীকে পেডেস্টালে বসিয়ে রাখার জন্যই।
কেন নারীকে বারবার ফুল হতে হবে? কেন চাঁদের মতো কোমল না হলে সে ঠিক প্রেমিকা হতে পারবে না? কেন সৌন্দর্যকে তার প্রথম পরিচয় এবং নীরবতাকে তার সৌন্দর্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হবে?
প্রশংসা এবং বস্তুকরণের সীমারেখাটি অস্পষ্ট করে দেওয়া মূল উদ্দেশ্য। ফুল সুন্দর, কারণ ফুলের কাছ থেকে কোনও বক্তব্যের প্রত্যাশা নেই। চাঁদও সুন্দর, কারণ চাঁদ আমাদের সঙ্গে তর্ক করে না। কিন্তু নারী তো ফুল নয়, চাঁদও নয়। তার সৌন্দর্য তার সমস্ত পরিচয় নয়। তার নীরবতাও কোনও স্বাভাবিক নারীগুণ নয়। এখানে আরও একটি সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব আছে। সমাজমধা্যম যেমন নারীকে একদিকে ‘strong independent woman’ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে সেই স্বাধীনতারও একটি নির্দিষ্ট দর্শনগত ব্যকরণ তৈরি হয়েছে। আত্মবিশ্বাসী নারীও নির্দিষ্টভাবে সুন্দর, নির্দিষ্টভাবে কাম্য, কিন্তু সেই স্বাধীনতারও একটি উপস্থাপনযোগ্যতা আছে। ‘আমি নিজের মতো’– এই বক্তব্যটিও কখনও কখনও এমন একটি ছবির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে অন্যের দৃষ্টির উপর। আর, সেই দৃষ্টিকে অবজ্ঞা করলেই মন্ত্যব্যের সারিতে নেমে আসে অশালীন কথা। আমরা তো ধরেই রেখেছি শারীরিক মন্তব্যই ‘নারীত্ব’-র তীব্রতর অসম্মান আবার ‘পুরুষত্ব’-র ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্য। স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে নিজের পিরিয়ডের দাগ নিয়ে কিছু কথা বলেছিল একটি মেয়ে। যৌনাঙ্গ নিয়ে আক্রমণ বা সেই বিষয়ক গালিগালাজ তো সমাজমাধ্যমে এখন ‘স্বাভাবিক’, কিন্তু তার সঙ্গেই উঠে আসে ‘ভদ্র সমাজ’-এর দোহাই। যেমন ‘সাইবার বুলিং’-এর শিকার এক মেয়ে হঠাৎ একদিন জানতে পারল– ‘ভদ্র বাড়ির মেয়ে-বউরা কখনওই এমন ছবি দেয় না ফেসবুকে’।
যে-নারী মতপ্রকাশ করে, প্রশ্ন করে, নিজের শরীর নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে, রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে কথা বলে, তাকে প্রায়ই ট্রোলিং, বডি-শেমিং, বা অনলাইন সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের মুখোমুখি হতে হয়। নারী দৃশ্যমান হলে তাকে মূল্যায়ন করা হয় ঠিকই– কিন্তু সে কীভাবে দৃশ্যমান হবে তারও একটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকে। সুন্দর হলে প্রশংসা, প্রতিবাদী হলে আক্রমণ– দুই ক্ষেত্রেই নারীর শরীর ও কণ্ঠস্বরকে বিচার করার অধিকার যেন অন্যের হাতে। তাই নারীর বস্তুকরণ বা অবজেক্টিফিকেশন শুধুমাত্র শরীরকে পণ্যে পরিণত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনও তাকে ‘ফুল’ করে তোলার মধ্যে, কখনও তাকে ‘চাঁদের আলো’ বলার মধ্যেও থাকতে পারে। প্রশ্নটি এক্ষেত্রে উপমাটি সুন্দর কি না, তা নয় বরং প্রশ্ন হল, সেই উপমার ভিতরে নারীকে কতটা মানুষ হিসাবে দেখা হচ্ছে? চাঁদ সুন্দর– কিন্তু নম্র সৌন্দর্যেই কি তাঁর একমাত্র পরিচয়?
ফুল সুন্দর– কিন্তু ফুলের উপমা দিয়ে একজন মানুষের সমস্ত অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করা যায় না। আমাদের সমাজে নারীর ক্ষেত্রে সৌন্দর্যের ধাঁচ বারবার তার সামাজিক মূল্য, গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে। সমাজমাধ্যম সেই পুরনো কাঠামোকে কেবলই নতুনতর ফিল্টার, ক্যাপশন, অ্যালগরিদম দিয়েছে। আমাদের সমাজমাধ্যমের ‘ভদ্র সমাজ’ যে ক’-দিন থাকবে, নারীর প্রশংসাও থাকবে, কিন্তু সেই ছবির বাইরে তার কণ্ঠস্বরটিও শোনা যাবে তো? নারী পুষ্পের ন্যায় মৃদু, চাদের ন্যায় বিভাময়ী হতেই পারে– কিন্তু রাগী, উচ্চকণ্ঠ, অসম্পূর্ণ, অস্থির ও প্রতিবাদীও হলে? চাঁদের জন্মদাগের মতোই গভীর আসলে নারীত্বের এই উপমাগুলি। এই একুশ শতকেও চাঁদকে নিয়ে দু’-একটা কবিতা নিশ্চয়ই লেখা হবে, কিন্তু তার জন্মদাগের কথা থাকবে কি? যোদ্ধা লক্ষ্মীবাই কিংবা বক্সার মেরি কম কি কোনও দিন চাঁদের মতো হতে পারবেন?
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
বাংলাদেশে দুর্গাপুজোয় টানা ৫ দিনের ছুটি, সংখ্যালঘু আবেগ মেরামতে অনুদানও বাড়ালেন তারেক
-
রাষ্ট্রসংঘে কাশ্মীর ইস্যু উথ্থাপন! ‘নির্লজ্জ’ এর্দোগানকে কড়া জবাব ভারতের
-
পুজোর আগে ২ শনি-রবিতে চলবে অতিরিক্ত মেট্রো, কবে কোন রুটে? কী জানাল কর্তৃপক্ষ?
-
‘তোমাকেই বিয়ে করব’, সিঁথি রাঙানোর প্রতিশ্রুতিতে বিধবার সঙ্গে সহবাস, লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ!
-
‘অষ্টমীতে মায়ের দেওয়া শাড়ি পরে অঞ্জলি’, পুজোয় মুম্বই না কলকাতায় থাকবেন? জানালেন রুক্মিণী