২ আশ্বিন  ১৪২৬  শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 

Menu Logo পুজো ২০১৯ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য:  রবি ঠাকুরের নাম ছিল সর্বত্র। রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি অসাধারণ বিজ্ঞাপন। গোটা ভারতের, বাংলা ও বাঙালির। সাহিত্যের, দর্শনের, গানের এবং আজকের দিনে যা মহামূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে-আন্তর্জাতিকতার। কবি নামকরণ ও বিজ্ঞাপনে কেমন হাত লাগিয়েছেন দেখার আগে তিনি স্বয়ং ভারতের কেমন বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছিলেন তার কেবল তিনটি উদাহরণ দেব! ১৯৩০-এ মার্কিন লেখক ও দার্শনিক উইল ডুরান্ট কবিকে তাঁর বই ‘দ্য কেস ফর ইন্ডিয়া’ উপহার করলেন। আর তাতে কী লিখলেন? ‘ইউ অ্যালোন আর সাফিশিয়েন্ট রিজন হোয়াই ইন্ডিয়া শুড বি ফ্রি।’ আপনি একাই যথেষ্ট কারণ ভারতের স্বাধীন হওয়ার পক্ষে। ১৯২০ সালে বিখ্যাত ইংরেজ অভিনেত্রী ডেম সিবিল থর্নডাইক কবির সঙ্গে দেখা করতে যান তাঁর লন্ডনের হোটেলে। প্রায় শিষ্যার মতো তাঁর কথা মুগ্ধ হয়ে শোনেন এবং পরে লেখেন- ‘যতদিন বাঁচব এই একটি ঘণ্টা ভুলতে পারব না, কারণ একজন খ্রিস্টান হিসেবে যে-জিনিসগুলোই খুঁজছিলাম এবং বোঝার চেষ্টায় ছিলাম, সেগুলোই ঝলকে উঠল চোখের সামনে ভিন্ন জাতির এই মনীষীর কথায়।’

তৃতীয় উদাহরণটি রবীন্দ্রভক্ত মহৎ জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেশটের উক্তিতে। যেখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা প্রসঙ্গে বলছেন- ‘বড় বিস্ময় লাগে, বড় অবাক লাগে আমাদের, কেমন করে আমাদের বুকের তন্ত্রীগুলো মোচড় দেন, আমাদের সময়ের পাষাণভারী অস্তিত্ব ভুলিয়ে দেন।… আমরা কবির বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে রৌদ্রকরোজ্জ্বল শান্তির এক বিশ্বে ভ্রমণ করে আসি।’কবির মুখের কথাও প্রায়ই বিজ্ঞাপন হয়ে উঠত। যেমন বিবেকানন্দের ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ বইটি পড়ে ক্ষিতিমোহন সেনকে বলেছিলেন, “দেখো, দেখো কী গদ্য লিখেছে বিবেবকানন্দ।” এরপর বিশ্বভারতীর যখন পাঠাসূচি তৈরি হল তিনি বইটিকে পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলেন। কবিকে দিয়ে ছেলেমেয়েদের নামকরণের একটা হিড়িক তো লেগেই থাকত বরাবর। সেও তো এক ধরনের বিজ্ঞাপনই। তেমন দুটো গল্পে যাই… ঐতিহাসিক সুশোভন সরকার মশাইয়ের কাছে শোনা। সুশোভনের কন্যা হয়েছে শুনে কবি বললেন, “তোমার মেয়ের নাম দোব।”

তরুণ ঐতিহাসিক বললেন, “সে তো খুব ভাল কথা।” কবি নাম দিলেন ‘ক্ষিপ্রা’। যা নদীর স্রোতের সুন্দর বর্ণনা হয়। কিন্তু কন্যার বাপ-মায়ের যেন কেমন-কেমন লাগল নামটা। অথচ, রবীন্দ্রনাথের দেওয়া নামকে তো হেলাফেলা করা যায় না। তাই ক্ষিপ্রা নামটাকেই ঈষৎ বদলে নিয়ে ওঁরা করে নিলেন শিপ্রা।এর বেশ কিছুদিন পর সুশোভনবাবুরা কন্যা সমেত গিয়েছেন কবির কাছে। কবি শিশুকে দেখে তাঁর দেওয়া নাম ডাকতে শিশু বোঝেনি ওকেই ডাকা হচ্ছে। তখন সুশোভন বললেন, “ওর নামটা আমরা একটু বদলে শিপ্রা করেছি তো, তাই…” রবীন্দ্রনাথ তখন অপূর্ব রসবোধে বলেছিলেন, “বেশ তো! ক্ষিপ্রা তো নদীর বর্ণনা, আর শিপ্রা তো নদীর নামই।”

[আরও পড়ুন  : কিংবদন্তি মান্না দের শতর্বষের জন্মদিনে নস্ট্যালজিক ইন্দ্রাণী-রূপঙ্কর, জানালেন কী শিখেছিলেন]

দ্বিতীয় গল্পটি এককালের রবীন্দ্রভক্ত মহলে চলিত ছিল। তবে আমি শুনেছি- যদ্দুর মনে পড়ে- ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার আতাউর রহমান সাহেবের ঘরে। বক্তা নামকরা সংবাদপত্রের কর্তাব্যক্তি কানাইলাল সরকার। গল্পটা বিখ্যাত পণ্ডিত, শিক্ষাব্রতী ও মন্ত্রী হুমায়ুন কবীরকে নিয়ে। মুসলিম ধর্মাবলম্বী কবীর ও তাঁর বিদুষী স্ত্রী যিনি বিবাহপূর্বে হিন্দু ছিলেন তাঁদের পুত্রের নামকরণের জন্য কবির কাছে গেলেন। দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে তখন কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর দু’জনেরই যেন কুলরক্ষা করার জন্য একটা কাগজে ইংরেজি হরফে লিখলেন KAMAL. তাতে হিন্দুরা ‘কমল’ পড়তে পারে, এবং মুসলমানরা ‘কামাল’। এবং সে-নামই রাখা হল ছেলের। বাল্য-কৈশোরে এত এত মহিলা দাবি করতেন যে তাঁদের নাম রবীন্দ্রনাথ দিয়েছেন যে, খুব স্টাইলিশ অথবা ঝঙ্কৃত নাম শুনলেই প্রশ্ন জাগত, এই নামও কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া? এরকম একটা মজার স্মৃতির কথা বলেই ষোলো আনা বিজ্ঞাপনে যাব। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ইংরেজিতে দিগগজ হচ্ছি, কিন্তু বাংলা শিখছি না দেখে আমাকে একটা বাংলা মিশনারি স্কুলে ভর্তি করা হয় ক্লাস ফোর-এ। যে-পর্যন্ত স্কুলটি কো-এডুকেশনাল। আর সে ক্লাসে এক দীর্ঘাঙ্গী, অপরূপ সুন্দরী মেয়ে পড়ত, যার নাম ‘লাইট’। আজকের দিনে এরকম নাম তো আকছার হয়। কিন্তু বাষট্টি-তেষট্টি বছর আগে? এই নাম নিয়ে ছেলেদের মধ্যে বেশ কৌতূহল ছিল, কিন্তু ওরকম ফিল্মস্টার মার্কা মেয়েকে কেউ জিজ্ঞেস করতে ইতস্তত করত। শেষে, সুজিত বলে একটা ফাজিল ছেলে ব্যাপারটার ফয়সালা করে দিল। বলল, “জিজ্ঞেস-টিজ্ঞেস করে কাজ নেই। বললেই তো বলবে রবি ঠাকুর নাম দিয়েছেন!” একজন প্রতিবাদ করল, “ওর জন্মের সময় রবি ঠাকুর কোথায়?” সুজিতও দমবার না, “বলবে, জন্মানোর অনেক আগে শান্তিনিকেতনের ছাত্রী আমার মাকে গুরুদেব বলেছিলেন, ‘মেয়ে হলে নাম দিস লাইট।” জানি না কথাগুলো মেয়েটার
কানে গিয়েছিল কি না, কিন্তু এর পর থেকে ছেলেদের সঙ্গে প্রায় কথাই বলত না।

ছেলেবেলায় কাকার সঙ্গে বউবাজারে ভীম নাগের দোকানে সন্দেশ কিনতে গেলে দেওয়ালে টাঙানো একটা সার্টিফিকেট চোখে পড়ত। সই করে রবীন্দ্রনাথ ভীমনাগের সন্দেশের গুণগান করেছেন। অল ইন্ডিয়া রেডিওর কর্তারা বেতার সংস্থার নাম দেওয়ার জন্য কবির দ্বারস্থ হলে তিনি আশ্চর্য অর্থবহ ও সুরেলা নামকরণটি করেন- ‘আকাশবাণী’।আর যে কালি দিয়ে তাঁর ডরিক, মঁ ব্লাঁ ফাউন্টেন পেনে যাবতীয় লেখালিখি সেই কালিরও স্থায়ী একটা নাম দিলেন– ‘সুলেখা’। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিশ্বভারতী’ নামকরণ থেকে নিজের বিভিন্ন আস্তানা পূরবী, শ্যামলী, উত্তরায়ণের নামও তাঁরই দেওয়া। প্রিয় নাতনির ‘নন্দিনী’ নামও তাঁরই অর্পণ। গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’। সুভাষচন্দ্রকে ‘দেশনায়ক’ এবং জওহরলালকে ‘ঋতুরাজ’ তো তিনিই ডেকেছেন। যে ডাক থেকেও গিয়েছে।

শুধু একবার বিজ্ঞাপন করা থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। ‘ভারত’ ব্লেড সংস্থা একটা বিজ্ঞাপন বার্তার জন্য ওঁর কাছে গেলে ওঁর শ্বেতশুভ্র, দীর্ঘ দাড়িতে সস্নেহে হাত বুলোতে বুলোতে কবি বলেছিলেন, “এই দাড়ি নিয়ে আমি যদি বিজ্ঞাপন করি তাহলে কেউ কি তোমাদের ব্লেডের ধারে আস্থা রাখবে? না আমাকে করবে বিশ্বাস?”বছর তিরিশ আগে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ অ্যাডভার্টাইসমেন্টর (আইজেএ) বার্ষিক সংখ্যায় একশো বছরের সেরা প্রচ্ছদের নমুনা ওঁরা তুলে ধরেছিলেন, তাতে ভারতের একটি মাত্র বইয়ের প্রচ্ছদ স্থান পেয়েছিল। নামকরা প্রচ্ছদকার ও শিল্পী বিপুল গুহ সেই জার্নাল নিয়ে এসে আমাকে বললেন, “দেখেছেন?” কী দেখলাম? ভারতের প্রতিনিধির প্রচ্ছদটি হলে রবীন্দ্রনাথের গেরুয়া রঙের কাগজে ম্যাজেন্টা রঙের ওঁরই হস্তলিপিতে লেখা ‘শেষের কবিতা’। সারা পৃথিবী জানে রবি ঠাকুর তাঁর সমস্ত প্রচ্ছদ করেছেন গেরুয়া রঙে লাল হরফে বইয়ের নাম লিখে এবং নিচে লালেই নিজের সই।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং