Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৫ জুন ২০২৬
Genghis Khan

কাজাখস্তানে চালান নিষ্ঠুর ধ্বংসলীলা! খান হলেও মুসলিম ছিলেন না চেঙ্গিস

মুসলিম থেকে খ্রিস্টান, চেঙ্গিসের রোষানল থেকে বাঁচতে পারেননি কোনও ধর্মেরই মানুষ!

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ১৯:৩৮

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ১৯:৩৮

options
link
কাজাখস্তানে চালান নিষ্ঠুর ধ্বংসলীলা! খান হলেও মুসলিম ছিলেন না চেঙ্গিস zoom
চেঙ্গিস খানের সামরিক কৌশল ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও কার্যকরী।

ইতিহাস তার চলার পথে ছড়িয়ে রাখে ভালোবাসা ও ঘৃণার গল্প। যুগে যুগে মানবপ্রেমী মহাপুরুষদের আগমনধ্বনি যেমন শোনা গিয়েছে, একই ভাবে ঘৃণার ধ্বজাধারীদেরও অভাব হয়নি। আজকের ইরান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ‘অত্যাচারী হানাদার’ বলে দাগতে গিয়ে অতীতের প্রসঙ্গ টেনে আনছে। তাই আচমকাই উচ্চারিত হতে শুরু করেছে চেঙ্গিস খানের নাম। একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও বিতর্কিত চিরচেনা এক চরিত্র। যাঁর আসল নাম ছিল তেমুজিন। কয়েকশো বছর আগে যে নিষ্ঠুর হত্যালীলা তিনি চালিয়ে গিয়েছেন, তা আজও তাঁকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঘাতক সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে মনে রেখেছে। আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানেও তিনি উচ্চারিত হচ্ছেন সেই কারণেই।

আরও একটা কারণ আছে। খোয়াড়েজম সাম্রাজ্যে যে নির্মম হানা চালিয়েছিলেন চেঙ্গিস, সেই সাম্রাজ্যের কিছুটা অংশ আজকের ইরানের মধ্যেই পড়ে। এছাড়াও তুর্কমেনিস্তান ও মধ্য এশিয়ার একটা বড় অংশ ছিল এই সাম্রাজ্যের অন্তর্গত।

Advertisement

একটা ধারণা দিব্যি প্রচলিত রয়েছে যে, চেঙ্গিস খান আসলে ছিলেন মুসলিম। কিন্তু তা সত্যি নয়। মোটেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন না তিনি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে, তাহলে তাঁর পদবি খান হল কী করে? এপ্রসঙ্গে বলা যায়, খান ছিল তাঁর উপাধি।

কিন্তু কেন এখানে হানা চালিয়েছিলেন চেঙ্গিস! স্রেফ রক্ত ও ক্ষমতার নেশায়? এমনটা বললে ভুল বলা হবে। এর নেপথ্যে রয়েছে একটা গল্প। সেটা ১২১৮ সাল। খোয়াড়েজম সাম্রাজ্যের ওতরার (আজকের কাজাখস্তান) শহরে প্রবেশ করল চেঙ্গিস প্রেরিত এক বাণিজ্য প্রতিনিধির দল। কিন্তু বণিকদের মোটেই ভালোভাবে নেয়নি ওতরার। দ্রুত একের পর এক প্রতিনিধিকে হত্যা করা হয়। কেবল একজনকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। যাতে তিনি গিয়ে মঙ্গোল শাসক চেঙ্গিসকে সেখবর দিতে পারেন! তবে চেঙ্গিস এহেন পরিস্থিতিতেও কূটনীতিকে প্রাধান্য দেন। তিনি দূতের দল পাঠান খোয়াড়েজমে। সুলতান দ্বিতীয় মহম্মদের কাছে চেঙ্গিসের দাবি ছিল, তাঁর লোকেদের মৃত্যুর প্রতিদান। কিন্তু সুলতান রেগে মেজাজ হারালেন। প্রধান দূতেরও শিরশ্ছেদ করা হল। এবার আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারেননি চেঙ্গিস। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে সময় লাগল। মোটামুটি দু’বছর পরে বুখারা থেকে সমরখন্দ, মার্ভ, নিশাপুর ও হেরাতে সমস্ত মঙ্গোল সৈন্যকে একত্রিত করা সেযুগে চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। চেঙ্গিসের হানায় প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ নাকি প্রাণ হারান!

১২২৩ সালের মধ্যে সুন্নি মুসলমানদের সেই সাম্রাজ্যকে কার্যতই শ্মশানে পরিণত করেন তিনি। আর সেই ধ্বংসস্তূপের ভিতর দিয়েই মঙ্গোলরা ইরান, ইরাক এমনকী ইউরোপেও একাংশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে। আসলে চেঙ্গিস খানের সামরিক কৌশল ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও কার্যকর। ছিল দ্রুতগামী অশ্বারোহী বাহিনী, নিখুঁত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ কৌশল। তাঁর সৈন্যরা দূরদূরান্তে দ্রুত আক্রমণ চালাতে পারত, যা শত্রুদের অপ্রস্তুত করে দিত। তিনি চিন, মধ্য এশিয়া, পারস্যসহ বহু অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন।

১২২৩ সালের মধ্যে সুন্নি মুসলমানদের সেই সাম্রাজ্যকে কার্যতই শ্মশানে পরিণত করেন চেঙ্গিস খান। আর সেই ধ্বংসস্তূপের ভিতর দিয়েই মঙ্গোলরা ইরান, ইরাক এমনকী ইউরোপেও একাংশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে।

শৈশবে অবশ্য তেমুজিনের ভবিষ্যতের আঁচ মেলেনি। তাঁর বাবা মারা যান অল্প বয়সেই। পরিবারটি দারিদ্র ও অনিশ্চয়তার গহ্বরের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এই প্রতিকূল অবস্থাই তাঁকে দৃঢ়চেতা করে তোলে। মঙ্গোলদের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ১২০৬ সালে তিনি ‘চেঙ্গিস খান’ উপাধি লাভ করেন, যার অর্থ ‘সর্বজনীন শাসক’।

এই প্রসঙ্গে একটি ভুল ধারণাকে নস্যাৎ করা দরকার। সাধারণ্যে একটা ধারণা দিব্যি প্রচলিত রয়েছে যে, চেঙ্গিস খান আসলে ছিলেন মুসলিম। কিন্তু তা সত্যি নয়। মোটেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন না তিনি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে, তাহলে তাঁর পদবি খান হল কী করে? এপ্রসঙ্গে বলা যায়, খান ছিল তাঁর উপাধি। আর এই উপাধি এসেছে প্রাচীন মোঙ্গল শব্দ ‘কায়ান’ থেকে, যার অর্থ ‘শাসক’। এই উপাধিটি ইসলামের আবির্ভাবেরও পূর্ববর্তী। চেঙ্গিসের নিজের ধর্মের নাম তেংরিবাদ। ‘তেংরি’ শব্দের অর্থ আকাশদেবতা। এই ধর্মবিশ্বাসের মূলে ছিল বিভিন্ন আত্মা বা প্রেতাত্মা। তবে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দেবতা আকাশই।

মার্কিন লেখক হ্যারল্ড ল্যাম্বের লেখায় আছে, ‘চেঙ্গিস খান নিজেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এক সাক্ষাৎ অভিশাপ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেন।’ জানা যায়, বুখারা শহরের মসজিদে দাঁড়িয়ে চেঙ্গিস খান নিজেকে ‘ঈশ্বরের অভিশাপ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এরপরই শহরটি লুণ্ঠিত হয়। শুরু হয় অবাধে হত্যালীলা। বাদ পড়েননি শহরটির অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধিরাও। এক্ষেত্রে আরও একটা কথা বলা দরকার। ১২১৯ খ্রিস্টাব্দেরও ঢের আগে মঙ্গোলরা মুসলিম সাম্রাজ্যে হানা দিয়েছিল। মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম চিনে তারা ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারা-খিটাই। এখানকার শাসক বৌদ্ধ হলেও জনতা ছিল মুসলিমরাই। তবে এই সব ধ্বংসলীলার সঙ্গে খোয়াড়েজমের তফাত রয়েছে। চেঙ্গিস খানের হামলার বৈশিষ্ট্যই এই যে, তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল গোটা অঞ্চলটাই। ওই হানার তীব্রতা এমনই ছিল যে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠেছিল।

তবে একথা ভাবলে ভুল হবে যে চেঙ্গিস কেবলই মুসলিমদের টার্গেট করেছিলেন। তিনি খ্রিস্টান, বৌদ্ধ থেকে শুরু করে নানা উপজাতিকেও নিশানা করেছিলেন। আসলে মঙ্গোলদের প্রতিশোধ ও শত্রুর বশ্যতা ছাড়া আর কিছুই লক্ষ্যমাত্রায় থাকত না। আর এটা হাসিল করতে নিষ্ঠুর পদচারণায় বাকিদের গুঁড়িয়ে দিতে তারা পিছপা হত না।

খারা শহরের মসজিদে দাঁড়িয়ে চেঙ্গিস খান নিজেকে ‘ঈশ্বরের অভিশাপ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এরপরই শহরটি লুণ্ঠিত হয়। শুরু হয় অবাধে হত্যালীলা।

তবে এই প্রসঙ্গে একটা অন্য কথাও বলা যায়। মঙ্গোলরা ইরান দখল করে দীর্ঘদিন সেখানে শাসন কায়েম রাখতে পেরেছিল। বুখারা, সমরকন্দ এবং নিশাপুরের মতো প্রধান শহরগুলো ধ্বংস করে দেয় তারা। অবশিষ্ট ইরান নাকি দখল করেছিলেন চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান। কিন্তু এতদিন শাসন করলেও ইরানের জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতিকে মুছে ফেলা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পারস্য শৈলীতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ থেকে সেখানকার পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা করা- মঙ্গোলরা ইরান দখল করলেও আসলে জয় করতে পারেনি। বরং নিজেরাই সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এমনই তীব্র সংক্রামক তেহরানের সাংস্কৃতিক গঠন। ফলে ইরান রয়ে গিয়েছে স্বাধীনই। আজকের ট্রাম্প-নেতানিয়াহুদের সঙ্গে চেঙ্গিসকে এক করে দেওয়ার সময়ও সেই ইতিহাস সাহস জুগিয়েছে ইরানকে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.