অগ্নিমূল্য টিকিট থেকে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, বিতর্কে জর্জরিত বিশ্বকাপ আদৌ হবে তো? শঙ্কিত ফিফা
আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে মেক্সিকোয় স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়ার মতো একাধিক ঘটনা শিরোনামে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইরানকে ঘিরে। চলতি সপ্তাহে ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে গিয়ে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি পাননি ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি। একইসঙ্গে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইরানের প্রতিনিধিদলের যাঁদের সঙ্গে আইআরজিসি-র যোগাযোগ রয়েছে, তাঁদের বিশ্বকাপ চলাকালীন আমেরিকায় প্রবেশেও বাধা দেওয়া হতে পারে। উল্লেখ্য, ইরানের তিনটি গ্রুপ ম্যাচই হওয়ার কথা আমেরিকার মাটিতে।
আরও পড়ুন:
শর্তগুলির মধ্যে অন্যতম, ইরানের সামরিক বাহিনীর শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের যে সদস্যরা ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের সঙ্গে জড়িয়ে, তাঁদের ভিসা মঞ্জুর করতে হবে। ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহদি তাজ বলেছেন, ‘‘জাতীয় দলের ফুটবলার, টেকনিক্যাল স্টাফ, বিশেষ করে যাঁরা আইআরজিসি'র সদস্য, তাঁদের ভিসা নিশ্চিত করতে হবে। কোনওরকম সমস্যার মধ্যে যেন তাঁরা না পড়েন। একইসঙ্গে তাঁদের সঙ্গে ব্যবহারও মধুর করতে হবে।’’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে শুরুতে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু তিনিও শেষপর্যন্ত ইরানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এখনও ইরানের নাগরিকদের মার্কিন ভিসা পাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাজ আরও জানিয়েছেন যে, ইরানের জাতীয় দলের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
আরও পড়ুন:
সপ্তাহ দু’য়েক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ মন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের ফুটবলারদের স্বাগত। কিন্তু আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা দেওয়া হবে কিনা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এই বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর মেহদি তাজ বলেছেন, ‘‘আমাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হয়েই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে চাই আমরা।’’
আরও একটা ঘটনা হল, বিশ্বকাপ শুরুর এক মাসেরও বেশি সময় আগে অন্যতম আয়োজক মেক্সিকোতে স্কুল ছুটির ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী মারিও ডেলগাডো জানিয়েছেন, এবারের শিক্ষাবর্ষ নির্ধারিত সময়ের ৪০ দিন আগেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। এর নেপথ্যে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিও যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে কয়েকটি রাজ্যে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহও। তবে এমন ঘোষণার পর সেদেশে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়েও পরিস্থিতি জটিল। বিশ্বকাপের জন্য অনুমোদিত ৬২৫ মিলিয়ন ডলারের সিকিউরিটি ফান্ডিং এখনও পুরোপুরি দেওয়া হয়নি। গোয়েন্দা রিপোর্টে পরিবহণ পরিকাঠামোয় জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। ইতিমধ্যেই টুর্নামেন্ট চলাকালীন রেলপথে হামলার উসকানিমূলক একটি পোস্ট মার্কিন কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির নজরে এসেছে।
হোটেল বুকিংও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফিফা বিভিন্ন আয়োজক শহরে আগে থেকে বুক করা বিপুল সংখ্যক হোটেল রুম বাতিল করেছে। ফ্যানরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আয়োজক শহরগুলির বহু হোটেলই প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম বুকিংয়ের কথা জানিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফিফাও আগাম বুক করা হাজার হাজার হোটেল রুম বাতিল করেছে বলে জানা গিয়েছে।
বিশ্বকাপের খেলার টিকিটের অগ্নিমূল্য, টুর্নামেন্ট চলাকালীন বাস-ট্রেনের আকাশছোঁয়া ভাড়া, সমস্ত কিছু তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ছে। ফাইনালের ‘ক্যাটাগরি ১’ টিকিটের দাম ছাড়িয়েছে প্রায় ১০,৯৯০ ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যা ১০ লক্ষ ১৯ হাজার টাকা। ভারত তো বটেই, পাশাপাশি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের কাছেই এই দাম অত্যন্ত চড়া। জানা গিয়েছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, জার্মানি এবং আয়োজক মেক্সিকোর ম্যাচগুলির টিকিটেও বেড়েছে দাম।
তাছাড়াও বিশেষভাবে সক্ষমদের ক্ষেত্রে ‘কেয়ারগিভার’-এর টিকিটের অভাব নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে। যাঁরা হুইলচেয়ারে করে খেলা দেখতে আসবেন, তাঁরা নিজেদের টিকিট কেটে ফেললেও, কেয়ারগিভারদের টিকিট কিনতে পারছেন না। কেয়ারগিভার কিংবা কম্প্যানিয়ন টিকিট নিয়ে বিশেষভাবে সক্ষম সমর্থকদের কোনও রকম নিশ্চয়তা দিতে পারেনি ফিফা। এই টিকিটের দাম সাধারণ টিকিটের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
প্রথমবার ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বিশ্বকাপ। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর মোট ১৬টি শহরে আয়োজিত হবে এই মেগা টুর্নামেন্ট। আয়তন, প্রযুক্তি এবং আয়োজনের দিক থেকে এই বিশ্বকাপকে ইতিমধ্যেই ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম আসর হিসাবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্বকাপ শুরুর একমাস আগে ফুটবলের চেয়ে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রশ্নই এখন বেশি করে সামনে উঠে আসছে।